জেড এ এম খায়রুজ্জামান

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ‘টর্চার সেল’গুলো উন্মুক্ত করে দিন

এয়ারপোর্ট রোডের পাশে ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ বাশার রোডের প্রবেশমুখে রয়েছে মার্বেল পাথরে গড়া দৃষ্টিনন্দন বিশাল স্বাধীনতা স্মৃতিস্তম্ভটি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী মুক্তিযুদ্ধের স্মারক হিসেবে এই স্থাপনাটি স্বাধীনতা-উত্তরকালে নির্মাণ করে।

Heroes Live Forever (বীরেরা চিরকাল বেঁচে থাকেন) এই স্লোগানসংবলিত স্মৃতিস্তম্ভটি শত শত বাশার (বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্বাধীনতার শহীদ সদস্যদের) স্মরণে নির্মিত হয়। পাকিস্তান আমলে শহীদ বাশার রোডটি স্টাফ রোড হিসেবে পরিচিত ছিল। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে স্বদেশ মুক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃপক্ষ নতুনভাবে এই সড়কটি স্বাধীনতার শহীদ ক্যাপ্টেন আর এ এম খায়রুল বাশারের নামে নামকরণ করে।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও নীলফামারী সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের (প্রাক্তন নীলফামারী হাই ইংলিশ স্কুল) প্রথম বাঙালি মুসলিমপ্রধান শিক্ষক আছির উদ্দিন আহমেদ ও রিজিয়া আহমেদের দ্বিতীয় সন্তান শহীদ ক্যাপ্টেন বাশার একজন অকুতোভয় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা, যিনি স্বাধীনতাযুদ্ধকালে চট্টগ্রাম সেনানিবাসস্থ স্টেশন সাপ্লাই ডিপোর কমান্ডিং অফিসার হিসেবে কর্মরত অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।

ঢাকা সেনানিবাসের প্রতি ইঞ্চি ভূমি ঐতিহাসিক নিদর্শন। প্রকৃতপক্ষে ইতিহাস এখানে জীবন পেয়েছে। এখানে একটি টর্চার সেলে ক্যাপ্টেন বাশার হানাদার পাকিস্তান বাহিনীর হাতে বর্বর নির্মমতার শিকার হয়ে ১৯৭১ সালের ২৯ মে শাহাদাতবরণ করেন। তাঁর সমাধি আজও অনাবিষ্কৃত। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে তখনকার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বেলুচ রেজিমেন্ট ক্যাপ্টেন বাশারের অধিনায়কত্বাধীন স্টেশন সাপ্লাই ডিপোটি আক্রমণ করে।

উদ্দেশ্য ছিল একটাই—বাঙালি সেনা অফিসারের অধিনায়কত্বাধীন সাপ্লাই ডিপোটি দখল করা। ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে কোনো বাঙালি সেনা অধিনায়কের অধীনে কোনো ইউনিটে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এটাই সর্বপ্রথম হামলা। কিন্তু ক্যাপ্টেন বাশারের নেতৃত্বাধীন বাঙালি সেনারা পাকিস্তানিদের এই কাপুরুষোচিত আক্রমণ অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে প্রতিহত করেন এবং স্টেশন সাপ্লাই ডিপো থেকে দখলদার বাহিনীকে দক্ষতার সঙ্গে তাড়িয়ে দেন।

১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ক্যাপ্টেন বাশার বাংলাদেশের মানচিত্র আঁকা স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে চট্টগ্রাম সেনানিবাস এলাকা প্রদক্ষিণ করেন। ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে কর্মরত বাঙালি সামরিক অফিসারদের কাছে ক্যাপ্টেন বাশারের অসম সাহসিকতার ঘটনা অজানা নয়। তখন থেকেই ক্যাপ্টেন বাশার পাকিস্তানি সামরিক জান্ত্তার আক্রোশের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন।

পাকিস্তানি দখলদার জান্তা ক্যাপ্টেন বাশারকে কারান্তরীণ বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে প্রস্তাবিত রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় রাষ্ট্রের পক্ষে রাজসাক্ষী হওয়ার জন্য প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু বীর শহীদ ক্যাপ্টেন বাশার প্রস্তাবকারীদের মুখের ওপর এ প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। সঙ্গে সঙ্গে বাংলার এই স্বর্ণসন্তানের ওপর নেমে আসে শতাব্দীর বর্বরোচিত বীভৎস নিপীড়ন। এমনকি সে সময় ক্যাপ্টেন বাশারের সন্তানসম্ভবা স্ত্রী যিনি প্রথমে ঢাকা সেনানিবাসে ও পরে ঢাকার ধানমণ্ডিতে ক্যাপ্টেন বাশারের খালাআম্মা বিশিষ্ট নারীমুক্তি আন্দোলনের নেত্রী ও বেগম রোকেয়া ভক্ত বেগম আয়শা জাফরের বাশায় অন্তরীণ ছিলেন, তাঁর ওপরও নেমে আসে ভয়াবহ অত্যাচার। ক্যাপ্টেন বাশারের স্ত্রী নূরুন্নাহার বাশার সে সময় সন্তানসম্ভবা থাকার পরও তাঁকে কোনো হাসপাতালে ভর্তি হতে দেওয়া হয়নি। তাঁর ওপর সামরিক জান্তা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এমনকি প্রসব বেদনা ওঠার পরও তাঁকে কোনো হাসপাতালে ভর্তি হতে দেওয়া হয়নি। এভাবেই ক্যাপ্টেন বাশারের স্ত্রী একটি পুত্রসন্তান জন্ম দেন।

অপরদিকে দীর্ঘ দুই মাস ঢাকা সেনানিবাসের একটি টর্চার সেলে ক্যাপ্টেন বাশারের ওপর চলতে থাকে অমানবিক ও বর্বরতম নির্যাতন। এই নির্যাতন এতই বীভৎস ছিল যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানিতে ইহুদিদের ওপর চালানো নিষ্ঠুরতম অত্যাচারকেও হার মানায়। শ্রুতি আছে যে শহীদ ক্যাপ্টেন বাশারের মুখমণ্ডল দখলদার সেনা কর্মকর্তারা সিগারেটের ছাইদানি হিসেবে ব্যবহার করত। যখনই যে ধূমপান করতে করতে আসত সে শহীদ বাশারের মুখমণ্ডলে জ্বলন্ত সিগারেট ঠেসে ধরে তা নির্বাপিত করত। এতদ্ব্যতীত আরো নানা বীভৎস কায়দায় তাঁর ওপর ক্রমাগত নির্যাতন চালানো হয়। ঢাকা সেনানিবাসের বিমানবাহিনীর সদর দপ্তরের একটি অস্ত্রভাণ্ডারে ১৫ ফুট বাই ১০ ফুট ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কক্ষ টর্চার সেলে রূপান্তরিত করা হয়। প্রতিটি কক্ষে পাঁচ-ছয়জন করে যুদ্ধবন্দিকে রাখা হতো। সেখানে ছিল না কোনো বিদ্যুৎ বা আলো-বাতাস প্রবেশের কোনো ভেন্টিলেশন। এ রকম একটি টর্চার সেলে ক্যাপ্টেন বাশারকে রাখা হয় এবং নির্যাতন করে বীভৎসভাবে তিল তিল করে খুন করা হয়। পার্শ্ববর্তী টর্চার সেলগুলোতে বাঙালি যুদ্ধবন্দিরা প্রতিদিনই ক্যাপ্টেন বাশারের আর্তনাদ শুনতে পেতেন।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর জঘন্যতম নিপীড়নের বীভৎসতা এ দেশের জনগণ কখনোই ভুলবে না। এসব টর্চার সেলে পাকিস্তানি হানাদাররা যে অত্যাচার চালিয়েছিল তা কখনোই ভোলার নয়। এই টর্চার সেলগুলো আজও দাঁড়িয়ে আছে, যা পাকিস্তান বাহিনীর নির্মম বর্বরতার প্রতীক, যা আমাদের কখনোই ভুলে গেলে চলবে না।

শহীদ বাশারের পরিবারের আকুতি, সরকার তথা সেনা কর্তৃপক্ষ যেন এসব টর্চার সেল যথাযথভাবে সংরক্ষণ করে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এগুলো দেখতে পারে। জনসাধারণের পরিদর্শনের জন্য এসব বন্দিশালা ও টর্চার সেল উন্মুক্ত করে দেওয়া হোক, যাতে জনগণ অন্তত অনুভব করতে পারে দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য এখানে কত মর্মান্তিকভাবে মানবতা পদদলিত হয়েছিল। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এসব বন্দিশালা ও টর্চার সেল দেখে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের কষ্ট ও ত্যাগ কিছুটা হলেও অনুধাবন করতে পারবে।

লেখক : সাংবাদিক ও শহীদ ক্যাপ্টেন বাশারের ছোট ভাই।

নোট: কালের কন্ঠ থেকে নেয়া।

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।