দিল মনোয়ারা মনু

কালজয়ী মানুষ

কবি সুফিয়া কামাল আমাদের সবার শ্রদ্ধেয়। তার হাত ধরে নারী ও শিশু আন্দোলনে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। দেশপ্রেম, ভালোবাসা, সততা, দৃঢ়তা, প্রজ্ঞা ও সহিষুষ্ণতার অনন্য সমন্বয় এই মহীয়সী নারীর কাছ থেকে যা শিখেছি, তা জীবনে পরম পাওয়া।

নারীমুক্তি ও নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করে তিনি যে প্রজ্ঞা ও সাহসের পরিচয় দিয়েছেন, নারীর মুক্তিকে মানবমুক্তি হিসেবে বিবেচনা করে সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়ে; জাতির বিবেক হিসেবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন, তার সেই নির্ভীক নিরন্তর কর্মপ্রয়াস, চিত্তের গভীর দীপ্তি সংঘাতে সংকটে আমাদের পথ দেখিয়েছে।

এ দেশের অধিকারবঞ্চিত ও নির্যাতিত নারীদের সংগঠন হিসেবে মহিলা পরিষদকে পরিপূর্ণভাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তার যে উদ্বেগ ও ব্যাকুলতা লক্ষ্য করেছি, তা ভোলার নয়। মহিলা পরিষদের নিজস্ব একটি বাড়ি হোক- এ ছিল তার একান্ত চাওয়া এবং সেই বাড়িকে কেন্দ্র করে হাজারো কার্যক্রম বিকশিত ও ফলপ্রসূ হোক- এ স্বপ্ন তিনি সব সময় দেখতেন। তাই তো ভবন উদ্বোধনের দিন তার চোখে-মুখে উপচে পড়া সেই আনন্দ সবাইকে ছুঁয়ে গেছে। তিনি বলেছিলেন, আজ পায়ের নিচে মাটি হয়েছে। দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে সব অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারবে আমার মেয়েরা। এমনি ব্যাকুলতা ছিল তার কচি-কাঁচা ভবন নিয়েও। এ ভবনের উদ্বোধনের দিন দাদা ভাইয়ের অনুরোধ উপেক্ষা করে অসুস্থ শরীরে তিনি দেয়াল ধরে ধরে দোতলা, তিনতলা ঘুরে ঘুরে দেখেছিলেন।

সুফিয়া কামাল নারীর অধিকার আদায়ে বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে, সর্বোপরি রাজনৈতিক আন্দোলন ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় জাতির বিবেক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত সম্মান। বাংলাদেশের নারীদের তিনি অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছেন। মেরুদণ্ড শক্ত করে দাঁড় করিয়েছেন। বাংলাদেশ ইউনিফর্ম কোডের জন্য যে আন্দোলন দেখা যাচ্ছে, তার পশ্চাতে রয়েছে তার সক্রিয় ভূমিকা। তিনি নারী-পুরুষ সবার সমানাধিকার নিয়ে লড়াই করে গেছেন। যতদিন বেঁচে ছিলেন গভীর মমত্ববোধ নিয়ে এর সব কাজ পর্যালোচনা করতেন। বেগম ক্লাবের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখেছি তার স্বতঃস্ম্ফূূর্ত অংশগ্রহণ। স্বাধীনতার পর রোকেয়ার স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য তার যে চেষ্টা ও ব্যাকুলতা, তা ভোলার নয়। সমাজের সব অন্যায়-অসঙ্গতির বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদ এবং সুন্দর ও শুভ কাজে একাত্ম হওয়া, তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে আজীবন অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।

কবি সুফিয়া কামাল অধিকারবঞ্চিত নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, শিশুদের জন্য সুন্দর ভবিষ্যৎ, কল্যাণকামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, আইনের সংস্কার, নতুন আইন তৈরি, ফতোয়াবিরোধী বিবৃতি, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতৃত্বসহ আন্তর্জাতিক নারী ও শান্তি সম্মেলনে বহু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। দেশ-বিদেশে সাহিত্য সম্মেলনেও তিনি ছিলেন পুরোধা ব্যক্তিত্ব। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, রাজনীতি- সব শাখায়ই ছিল তার স্বচ্ছন্দ বিচরণ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বেগম রোকেয়া, কাজী নজরুল ইসলাম তাকে মূল্যায়ন করেছেন নানাভাবে। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে অনেক সংগ্রামী বুদ্ধিজীবী মাথানত করেছেন; কিন্তু ক্ষুদ্র কোমল দেহের এই মানুষটি সব সময় অবিচল উন্নত শির; যেন এর মাথা নোয়ানোর নয়। চরিত্রের এই দৃঢ়তার কারণেই তিনি মুক্তবুদ্ধি ও জাতির বিবেকের প্রতীক হিসেবে সমাদৃত ছিলেন।

সমাজের জমাট বাঁধা অন্ধকার তাড়াতে অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে যে দীপশিখা তিনি প্রজ্ব্বলিত রাখার সংগ্রাম করে গেছেন, সেই সংগ্রাম আমরা অব্যাহত রাখব। আজ তার ১৭তম প্রয়াণ দিবস। কোনো স্তুতিবাক্য উচ্চারণ নয়, শুধু সুফিয়া কামালের আদর্শিক সমাজ বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন সম্ভব। তিনি বেঁচে থাকুন আমাদের সব কর্মযজ্ঞে।

সাংবাদিক ও নারী অধিকার কর্মী।

নোট: সমকাল থেকে নেয়া।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।