ড. আবদুল লতিফ মাসুম

যুবরাজের আধিপত্যের মহড়া!

দৃশ্যত সৌদি আরবে একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার নিরঙ্কুশকরণ প্রয়াস এবং আঞ্চলিক আধিপত্যের প্রতিযোগিতা চলছে। এ মাসের প্রথম সপ্তাহে সৌদি আরবে ঘটনার ঘনঘটা লক্ষ করা যায়। প্রথমত, সৌদি রাজকীয় ডিক্রিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত বেশ কয়েকজন যুবরাজকে পদচ্যুত এবং গ্রেফতার করা হয়। দ্বিতীয়ত, রিয়াদ বিমান বন্দরকে লক্ষ করে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। তৃতীয়ত, রিয়াদে বসে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরির পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়া হয়। ১৯৩২ সাল থেকে আজকের সময় পর্যন্ত ক্রমশ বিকশিত সৌদি রাজতন্ত্রে এরকম অস্থিরতা আর কখনো পরিলক্ষিত হয়নি। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, অধিকতর ক্ষমতা লোভী এবং অতিদ্রুত সবকিছু পাল্টে দেয়ার মনোভাবাপন্ন বর্তমান যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অদূরদর্শী এবং আধিপত্যকামী মানসিকতা থেকে এ সংকটের উদ্ভব।

নজিরবিহীন এক অভিযানে ১৭ জন প্রিন্স, চারজন মন্ত্রী এবং অন্তত ১২ জন সাবেক মন্ত্রীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পাশাপাশি তিনজন মন্ত্রীকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে সৌদি রাজপরিবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যও রয়েছেন। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে নতুন একটি দুর্নীতি দমন কমিটি গঠনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ৪ নভেম্বর রাতে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এ ঘটনা ঘটল। পরে ধাপে ধাপে আরো কিছু পদচ্যুতি এবং গ্রেফতারের ঘটনা ঘটে। প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, পরবর্তী গ্রেফতারের তালিকায় প্রয়াত যুবরাজ ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী সুলতান বিন আবদুল আজিজের পরিবারের সদস্যরা রয়েছে। নৌ-বাহিনীর প্রধানকে বরখাস্ত করা হয়েছে। ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে। মোটামুটি সৌদি রাজতন্ত্রে এখন এক ধরনের ভীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তবে এরকম একটি কর্তৃত্ববাদী প্রশাসন থেকে খবরাখবর পাওয়া একরকম অসম্ভব।

রাজতন্ত্র এবং গণতন্ত্রের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য এই যে, রাজতন্ত্রে সবকিছুর মালিক-মোখতার, রাজা- বাদশাহ, আমির-ওমরাহরা। আর গণতন্ত্রে জনগণের অধিকার সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত। রাজতন্ত্রে জবাবদিহিতার কোনো ব্যবস্থা নেই। প্রাসাদে কি ঘটছে তা জানাও দুঃসাধ্য। সেজন্য রাজতন্ত্র স্বৈরতন্ত্রকে আয়রন কার্টেন বা ‘লৌহ প্রাচীরে’র সাথে তুলনা করা হয়। সৌদি রাজতন্ত্রের লৌহ প্রাচীর অতিক্রম করে যেসব খবরবার্তা বাইরে প্রকাশিত হচ্ছে তা রীতিমতো ভয়াবহ এবং রহস্যজনক। যুবরাজ-বিন সালমান দেশটিকে মধ্যপন্থি ইসলামের দিকে নিয়ে যেতে চান। নারীরা গাড়ি চালানোর অনুমতি পেয়েছেন। তারা এখন খেলা দেখতে স্টেডিয়ামে যেতে পারবেন। অভিভাবকের অনুমতি ছাড়াই বিদেশে যেতে পারবেন। দেখেশুনে মনে হচ্ছে তার মাথায় কামাল আতাতুর্কের ভূত চেপেছে। নব্য তুরস্কের পিতা বলে কথিত মোস্তফা কামাল পাশা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে উসমানীয় সালতানাতের পতনের জন্য রক্ষণশীল ইসলামকে দায়ী করেন। তিনি পোশাকে-আশাকে, ব্যক্তিগত আচরণে এবং শাসনব্যবস্থায় পাশ্চাত্যকে অনুসরণ করেন। যদিও আজকের তুরস্কর অবস্থা ভিন্নতর। যুবরাজ সালমান পাশ্চাত্যের বিশ্বস্ততা অর্জনের জন্য ‘ভিশন ২০৩০’ ঘোষণা করেছেন। তিনি অতি দ্রুততার সাথে সৌদি সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে চান।

সৌদি আরবের রাজতন্ত্রের ধারাবাহিকতা অগ্রাহ্য করে বর্তমান বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ তার নিজ পুত্র মোহাম্মদ বিন সালমানকে তার পরবর্তী উত্তরাধিকারী ঘোষণা করেন। অনুসৃত নিয়ম অনুযায়ী বাদশাহর ভাইদের মধ্যে একজন রাজবংশের জ্যেষ্ঠদের নিয়ে গঠিত ‘অভিভাবক পরিষদের’ গরিষ্ঠ সিদ্ধান্তে পরবর্তী বাদশাহ মনোনীত হবেন। কিন্তু সবকিছুকে অগ্রাহ্য করে বৃদ্ধ বাদশাহ পূর্ব ঘোষিত ‘যুবরাজ’ মিতের বিন আবদুল্লাহকে পদত্যাগে বাধ্য করে বর্তমান যুবরাজকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী তথা সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করলেন। ইতিমধ্যে কথিত হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় প্রিন্স মনসুর বিন মুকরিম নিহত হয়েছেন। তিনি সাবেক যুবরাজ মুকরিম বিন আবদুল আজিজের ছেলে। বাদশা সালমান ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের পক্ষ থেকে ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করার প্রয়াস লক্ষ করা যায়। ২০১৪ সালে শক্তিধর যুবরাজ বন্দর বিন সালমানকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এ বছরের জুন মাসে একরকম শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সাবেক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন নায়েফ-এর পদত্যাগপত্র আদায় করা হয়। তার ভাগ্যে কী ঘটেছে তা আজও অজ্ঞাত। দৃশ্যত সংস্কার ও দুর্নীতির নামে এসব গ্রেফতার করা হলেও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন এটি হচ্ছে যুবরাজের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করার পরিকল্পনার অংশ।

বর্তমান সৌদি আরবের রাজনৈতিক অবস্থা অস্থিরতায় পর্যবসিত হয়েছে। অর্থনীতিতে এতটাই ধস নেমেছে যে তাদের ঋণ গ্রহণ করতে হয়েছে। তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। এর মাঝে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বস্ত মিত্রতায় ফাটল ধরে। ওবামা প্রশাসন আমলে দুটি কারণে সৌদি রাজতন্ত্রের সাথে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। প্রথমত, শিয়া ইরানের প্রতি সুন্নি সৌদি আরব চিরকালই বৈরী। ইরানের প্রতি ওবামার নমনীয় মনোভাব এবং পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে সৌদি আরব অসন্তোষ প্রকাশ করে। দ্বিতীয়ত, ৯/১১ ঘটনার জন্য ক্ষতিপূরণ প্রদানে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীরা মামলা করতে পারবেন— কংগ্রেসের এরকম সিদ্ধান্তে সৌদি রাজতন্ত্র অসন্তুষ্ট হয়। সিরিয়া, ইয়েমেন এবং লেবানন পরিস্থিতি সৌদি আরবের জন্য সে সময় বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি করে। ঘরে-বাইরে এরকম অবস্থার দ্বারা একঘরে হয়ে পড়লে রাজতন্ত্র শঙ্কিত হয়। এসময়ে  বর্তমান ক্ষমতাসীন যুবরাজ তার চাতুর্য এবং কৌশল নিয়ে রাজতন্ত্রকে রক্ষায় এগিয়ে আসেন।  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে এই যুবরাজ ওয়াশিংটনে ছুটে যান এবং নিরঙ্কুশ আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি দেন। মার্কিন কর্পোরেট পুঁজির প্রতিভূ ডোনাল্ড ট্রাম্প সে সুযোগ গ্রহণ করেন। মুসলমানদের বিরুদ্ধে কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি পোষণকারী এই প্রেসিডেন্ট প্রথম যে দেশটি সফর করেন তা হচ্ছে সৌদি আরব। এতে সৌদি রাজতন্ত্র এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই লাভবান হন। ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবকে কেন্দ্র করে তাদের ক্রমহ্রাসমান প্রভাবকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ পান। তার সমর বাণিজ্য তথা অস্ত্র বিক্রির ব্যবসা জমে ওঠে। সৌদি আরব ইরানকে চ্যালেঞ্জ করার শক্তি অর্জন করে। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী ইরান সৌদি আরবকে যুদ্ধাবস্থার মতো আচরণ করার জন্য দায়ী করেছে।

উল্লেখ্য যে, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা রিয়াদের উপকণ্ঠে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছে। যদিও ক্ষেপণাস্ত্রটি সৌদিরা ঠেকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। বেশ কয়েক বছর ধরে ইয়েমেনে যে গৃহযুদ্ধ চলছে তাতে ইরান এবং সৌদি আরব বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। এই গৃহযুদ্ধে সৌদি আরবের সরাসরি অংশগ্রহণের জন্য দায়ী বর্তমান ক্ষমতাসীন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি এই যুবরাজের চাপের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। নিজ দেশ ছেড়ে রিয়াদে বসে এ ঘোষণা দিতে তাকে বাধ্য করা হয় বলে মনে করা হচ্ছে। স্মরণ করা যেতে পারে যে, কাতারের উপর যে অবরোধ আরোপ করা হয় তার নীলনকশাকারী হচ্ছেন এই যুবরাজ। ৩২ বছর বয়সী যুবরাজ বিন সালমানের কার্যক্রমে  গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল একরকম অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে বার্তা সংস্থার খবরে বলা হয়েছে। ইতোমধ্যে লেবাননের পক্ষে সরাসরি অবস্থান নিয়েছে ফ্রান্স। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ এ পরিস্থিতিতে আকস্মিকভাবে রিয়াদ সফর করেন। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এখন মধ্যপ্রাচ্যে রয়েছে। এ ঘটনার মাধ্যমে ইউরোপ তথা পাশ্চাত্যে সৌদি আরবের ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যুবরাজের এসব কার্যাবলি লৌহ প্রাচীরের সীমানা অতিক্রম করে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মহলে প্রবল প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। ব্যাপক গ্রেফতারের ফলে রাজবংশে ভয়-ভীতির খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা। নিজস্ব বিমান নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতিকালে কয়েকজন যুবরাজকে আটক করা হয়েছে। অস্থিরতা থেকে অরাজকতা এবং অবশেষে ভ্রাতৃঘাতী রক্তারক্তির ধারণা অমূলক নয়। সৌদি আরব গোটা মুসলিম বিশ্বের কাছে একটি সম্মানীয় অবস্থানে রয়েছে। সমস্ত বিরোধ এবং সৌদি কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ইরানের আঞ্চলিক আধিপত্যকে খর্ব করা। মধ্যপ্রাচ্যের সকল ক্ষেত্রে সৌদি-ইরান বিরোধ স্পষ্ট। উদাহরণস্বরূপ ইয়েমেনে যে গৃহযুদ্ধ চলছে তাতে সৌদি আরব সাবেক প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহের পক্ষে সরাসরি যুদ্ধ করছে। এর প্রতিপক্ষ হচ্ছে হুতি গোত্র। তারা শিয়া মতাবলম্বী। ইরান হুতিদের অস্ত্রশস্ত্রসহ সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। ফলে যুদ্ধটা এখন সৌদ বনাম ইরানে পর্যবসিত হয়েছে। অপরদিকে আরব বসন্তের সময়কাল থেকে সিরিয়ায় যে গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়েছে তাতে ইরান আসাদ আল বাশারের পক্ষ অবলম্বন করছে। যেহেতু বাশার এক ক্ষুদ্র শিয়া গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছে সৌদিরা তাকে উত্খাতের চেষ্টা করছে। মধ্যপ্রাচ্যে যে কাতারকে নিয়ে বড় ধরনের সংকট দেখা দিয়েছে তার নেতৃত্ব দিচ্ছে সৌদি আরব। অপরদিকে কাতারকে অবরোধের মুখে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে ইরান। লেবাননে প্রভাবশালী হিজবুল্লাহ যেহেতু ইরান-সমর্থিত, সৌদিরা প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরির পক্ষ অবলম্বনকারী। সাদ হারিরি যথেষ্ট শক্তভাবে হিজবুল্লাহকে মোকাবেলা করতে না পারায় রিয়াদে ডেকে এনে সৌদি রাজতন্ত্র তাকে পদত্যাগে বাধ্য করে। ইরাকের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। ইরান শিয়া জনগোষ্ঠীকে আর সৌদি আরব সুন্নী জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। এভাবে সমস্ত মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে একটি সাংঘর্ষিক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এই সাংঘর্ষিক অবস্থায় বৃহত্ শক্তিগুলো যে যার সুবিধামতো সমীকরণ নির্ণয় করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সৌদি রাজতন্ত্রের পক্ষে এবং রাশিয়া গতানুগতিকভাবে ইরানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এভাবে মধ্যপ্রাচ্যের সর্বত্র ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধের কারণ ঘটছে। ঐসব দেশ ও অঞ্চলে যুদ্ধের এতটাই বিস্তৃতি ঘটেছে যে, সাধারণ মানুষ উত্কণ্ঠা ক্রমেই বাড়ছে। বলা বাহুল্য, যুদ্ধ নয় শান্তিই তাদের আরাধ্য।

 লেখক :প্রফেসর, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

নোট: ইত্তেফাক থেকে নেয়া।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।