সুব্রত ব্যানার্জী

‘কালচারাল জেনোসাইড’

বর্তমান বিশ্বে মানবাধিকার সুরক্ষা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অগ্রগতিতে কানাডা ধারাবাহিকভাবে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু আজকের এই মানবাধিকার সুরক্ষিত কানাডার অন্তরালে রয়েছে চরম মানবধিকার লঙ্ঘনসহ গণহত্যার ভয়াল চিত্র। অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় ‘কালচারাল জেনোসাইড’ নামক এক ধরনের অপরাধ রয়েছে, যার প্রবক্তা রাফায়েল লেমকিন বলেন, কোনো গোষ্ঠী বা জাতির সাংস্কৃতিক রীতি-নীতি, আচার, লোকজ, উৎস, ভাষা ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে তাদের প্রতি যে আগ্রাসন চালানো হয়, তাকেই ‘কালচারাল জেনোসাইড’ বলে। আদিবাসীদের ওপর চালানো এই ‘কালচারাল জেনোসাইড’ কানাডার ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এর শুরুটা হয়েছিল আঠার শতকে কানাডায় আদিবাসী শিশুদের জন্য আবাসিক স্কুল নির্মাণের মাধ্যমে। কানাডিয়ান সরকার ও খ্রিস্টান গির্জা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত রেসিডেন্সিয়াল স্কুলগুলোতে ধরে আনা হতো আদিবাসী সন্তানদের। ২০১১ সালের জুন মাসে কানাডার ট্রুথ ও রিকন্সিলিয়েশন পর্ষদ জানায়, আবাসিক স্কুলগুলো বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত আনুমানিক ৬ হাজার শিশু নিহত হয়। পাশাপাশি, উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সর্বশেষ আবাসিক স্কুল বন্ধের আগ পর্যন্ত প্রায় ১৫ হাজার ফার্স্ট নেশান, ইনুইট ও মে’টিস শিশুদের তাদের পরিবার থেকে জোরপূর্বক ধরে আনা হয় শুধু তাদের আদিবাসী পরিচয় ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে। বর্তমানে ইন্ডিয়ান আবাসিক স্কুল থেকে ‘বেঁচে যাওয়া’ আনুমানিক ৮০ হাজার প্রাক্তন শিক্ষার্থী আছে, যারা ১৯৯০-এর দশক থেকে এসেছে। ১৯৯৬ সাল থেকে কানাডায় এ ধরনের স্কুল নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।

এই ভয়াল ইতিহাসের খবর পেয়েছিলাম যখন আমার গত শীতকালীন সেমিস্টারে ‘আর্ন্তজাতিক মানবধিকার’ নামক একটি কোর্সের অধীনে এই নির্মমতা নিয়ে কিছু একাডেমিক প্রবন্ধ অধ্যয়ন করার সুযোগ হয়েছিল। পরে কোর্সের প্রফেসর আমাদের এই আগ্রাসন স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করার জন্য নিয়ে গেলেন কানাডার রাজধানী অটোয়াতে অবস্থিত আদিবাসীদের স্বাস্থ্যকেন্দ্র ওয়াবানা সেন্টারে। একটি জাতির সত্তা ও সংস্কৃতি কেড়ে নেওয়ার জন্য আগ্রাসন কত ভয়াবহ ও নির্মম হতে পারে, সেটা বুঝলাম সেদিন ফ্লিড পরিদর্শনে ওয়াবানা আদিবাসী স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রে যাওয়ার পর। সেখানে আদিবাসী শিশুদের ওপর সরকারের অমানুষিক নির্যাতনের নিদর্শনগুলো প্রত্যক্ষ করলাম। পরে ওয়াবানা সেন্টারে কর্মরত আদিবাসী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম, উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে কানাডায় বসবাসরত ইন্ডিয়ান আদিবাসী শিশুদের জন্মের পর মাত্র চার বছর থেকেই সরকার জোরপূর্বক আবাসিক স্কুলে নিয়ে যেত এবং ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত তাদের সেখানে বাধ্যতামূলক রাখত। এই স্কুলে তাদের নিজস্ব ভাষার বদলে কানাডিয়ান ভাষা শেখাত, জোরপূর্বক খ্রিস্টধর্ম পালনে বাধ্য করত। আবাসিক স্কুলে তাদের ওপর চলত অমানুষিক শারীরিক ও যৌন নির্যাতন। এ ছাড়া তাদের দিয়ে শিশুশ্রমসহ জোরপূর্বক শ্রমে বাধ্য করা হতো। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও দেখা করতে দেওয়া হতো না। নির্যাতনের মাত্রা এতই বেশি ছিল যে, ৪২ শতাংশ শিশু মুক্তির আগেই মারা যেত। যারা ১৫ বছর পর ফিরে যেত পরিবারের কাছে, তাদের ভয়াবহ মানসিক ট্রমা নিয়ে বেঁচে থাকতে হতো। একই সঙ্গে তারা ভুলে যেত নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতিসহ পরিবারকেও। এককথায়, আদিবাসীদের সংস্কৃতি ধ্বংস করে তাদের কানাডিয়ান বানানোই এই রেসিডেন্সিয়াল স্কুলের মূল উদ্দেশ্য ছিল। লেখক উলফর্ড এবং বেনেভেতুর-এর লেখা জেনোসাইড গবেষণা জার্নালে প্রকাশিত তাদের আর্টিকেল ‘কানাডা এবং ঔপনিবেশিক গণহত্যা’ নামক প্রবন্ধে এই গণহত্যাকে তারা ‘ঔপনিবেশিক গণহত্যা’ নামে অভহিত করেছেন।

এ প্রসঙ্গে বিশদ জানতে পারলাম আমাদের কোর্সে সংগৃহীত ‘রাস মূসা’ নামের এক আদিবাসী শিশুর লেখা চিঠি থেকে। ইন্ডিয়ান আবাসিক স্কুলে থাকাকালীন রাস মূসার চিঠিতে তাদের ওপর চালানো অবর্ণনীয় নির্যাতনসহ এসব স্কুলে ভর্তি হওয়া ছাত্র-ছাত্রীদের জীবনমানের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। তিনি ১৯৪২ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ছয় বছর তার শৈশবে ওন্টারিও প্রদেশের এই স্কুলে কাটান। অধিকাংশ সময়েই তারা প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত থাকত এবং দুর্বল বোধ করত। তাদের সবজি বাগানে প্রচণ্ড শীত ও তুষারপাতের মধ্যেও কাজ করতে হতো। আবাসিক স্কুলে কর্মরত কর্মচারীরা তাদের নিয়ে সারাক্ষণ উপহাস করত এবং তাদের বিভিন্ন সময় শারীরিক ও যৌন নির্যাতন করত।

আমাদের দেশেও অনেকে আদিবাসীদের মনে করি না তারা বাংলাদেশের নাগরিক। বাংলাদেশে আদিবাসীদের প্রতি নির্যাতন ও বৈষম্যমূলক আচরণের খবর নিয়মিত সংবাদমাধ্যমে দেখা যায়। আদিবাসীদের ওপর দমন-নিপীড়নের তথ্য বিশ্নেষণ করলে দেখা যায়, ঢাকায় মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন কাপেং ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালে অন্তত ১৭ জন আদিবাসী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ভূমি বিরোধের কারণে নিহত হয় পাঁচজন। এ ছাড়া ২০১৫ সালে সমতল ও পাহাড় মিলিয়ে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ১০ জন মানুষ বিভিন্ন সহিংসতায় নিহত হয়।

২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশে আদিবাসী জনসংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ ৮৭ হাজার, যা মোট জনসংখ্যার শতকরা ১ দশমিক ৮০ ভাগ। কিন্তু আদিবাসী নেতাদের মতে, পাহাড়ি বাদ দিয়ে কেবল সমতলেই ২০ লাখের বেশি আদিবাসী বসবাস করে।

পরিতাপের বিষয়, বাংলাদেশ সরকার ২২টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে স্বীকার করে না। ২৭টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে স্বীকার করা হলেও বাস্তবে দেশের ৪৮ জেলায় ৪৯টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস। আর তাদের মোট সংখ্যা ৫০ লাখ, যদিও সরকারি হিসাবে ২৫ লাখ। নির্যাতনের ভয়ে অনেক আদিবাসী দেশ ছেড়ে চলে গেছে। সরকার কর্তৃক আদিবাসীদের সংস্কৃতিও বিলুপ্ত হচ্ছে। কারণ কখনও ইকো পার্ক, কখনও বিদ্যুৎ উৎপাদনের নামে তাদের আবাসস্থল থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। বন, প্রকৃতি, জুম চাষ থেকে তাদের বঞ্চিত করা হয়েছে। ফলে তারা তাদের নিজস্বতা হারাচ্ছে। জাতিগত বৈষম্য ভুলে আমাদের সরকারসহ সবার উচিত হবে আদিবাসীদের ুভাষা, শিক্ষা, ভূমি, সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করা।

সহকারী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

নোট: সমকাল থেকে নেয়া।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।