ভৈরবের সাংবাদিকতা : একটি ব্যক্তিগত প্রতিক্রিয়া

মোটা দাগে বলা যায় সাম্প্রতিক সময়ে ভৈরবের সাংবাদিকতা গতি হারিয়েছে। সংবাদ লিখা, সহকর্মীদের মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ ও সামাজিক দায়িত্ববোধ পালন সব সূচকেই আমরা পিছিয়ে পড়েছি। বিশেষ করে সংবাদ লিখা এই পয়েন্টটি বাদে পরের দুটি পয়েন্টে আমাদের অর্জন শূন্যের কোটায়। এখন আর কোনো সাংবাদিক তাঁর অপর এক সহকর্মীর প্রতি বিশেষ টান অনুভব করেন না।

তবে এই ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে কারো কারো ইস্যুভিত্তিক যোগাযোগ অটুট থাকতে পারে। অথচ খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, যখন শুধু দলগত যোগাযোগই নয়, পরিবারের সদস্যদের নাম পরিচয় জানা ছিল অনেকের। প্রতিদিন কোনো না কোনো জাতীয় দৈনিকে এক বা একাধিক সংবাদ প্রকাশ পেত। দিনের ঘটনার বাইরে অনুসন্ধানী ও রাজনৈতিক সংবাদও কম উঠে আসত না। বলা যায় প্রায় প্রতিটি সংবাদপত্রে ছোট্র এই মফস্বল শহরের দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। কয়েকজন সাংবাদিক নিজ গন্ডি ছাপিয়ে সারা দেশে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। পদ-পদবী ও বেতনকাঠামোরও উন্নতি হয়েছে অনেকের। এসব কারণে আশপাশের জেলা শহরের অভিজাত সাংবাদিকরাও ভৈরবের গতিশীল সাংবাদিকতার প্রশংসা করতেন।

শুধু সাংবাদিকতায় নয়, সামাজিক উন্নয়নে সাংবাদিকদের ভূমিকারও প্রশংসা পাওয়া যেত। যেমন-দীর্ঘদিন সুপ্ত থাকার পর দশ বছর আগে স্টিকার তৈরি ও প্রচারের মাধ্যমে ভৈরব জেলার দাবিটি সাংবাদিকদের মাধ্যমেই ফের উঠে আসে। আবাসিক বিদ্যুৎ সরবরাহ উন্নয়ন ও ডিজিটাল টেলিফোন এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠায় সংবাদ প্রকাশের বাইরেও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন সাংবাদিকরা। মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলনে সাংবাদিকরা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। যখন অনেক জেলা শহরের ওয়াল্ড প্রেস ফিড্রম ডে (বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস) পালন হত না, কিংবা অজানা ছিল, তখন ছোট্র্র এই শহরে ৩ মে ঘটা করে দিবসটি পালন হয়েছে কয়েক বছর। এখন দেশের অধিকাংশ স্থানে পালন হয়, হয়না শুধু ভৈরবে। বছরে অন্তত একটি ঈদে সাংবাদিক পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঈদ পুনর্মিলনী পারিবারিক সম্পর্কের দূরত্ব গুচাতে সাহায্য করত। এখন আমরা এসবের বাইরে আছি। বিশেষ করে এই কয়েক বছরে প্রিন্ট মিডিয়ার ( মুদ্রিত কাগজ) সাংবাদিকতা ধস নেমেছে। তবে আশার কথা হলো ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় (টিভি সাংবাদিকতা) সংখ্যাগত অগ্রগতি হয়েছে। অনলাইন সাংবাদিকতার বিকাশ ঘটছে। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও স্থানীয় কয়েকটি সাপ্তাহিক ও একটি দৈনিক প্রকাশ অব্যাহত আছে। এরমধ্যে দু-একটি ভালো করার চেষ্টা করছে। কারো কারো নৈতিকতার মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও বেশ কয়েকজন তরুণ সাংবাদিক অল্প সময়ে নিজেদের অস্থিত্বের জানান দিতে পেরেছেন। মাঝে মাঝে তারা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভীত কাপিয়ে দিচ্ছেন। আমরা পুরনো সাংবাদিকদের মধ্যেও কারো কারো সততার পারসেন্টিস নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বটে। তবে আনন্দের কথা হলো, এই শহরে ভালোর সংখ্যায় বেশি।

বেশ কয়েকজন টিভি সাংবাদিক সভা, সমিতি, র‌্যালির বাইরেও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রচার করে নামের সুবিচার করে চলেছেন এবং টিভি পর্দায় ভৈরবের নামটি উচ্চারণে ভূমিকা রেখে আসছেন। আশার কথা হলো ভৈরবে প্রতিষ্ঠিত প্রায় সকল জাতীয় দৈনিকের প্রতিনিধি রয়েছে। আবার দুঃচিন্তার কারণ হলো, সব কাগজের প্রতিনিধি থাকলেও এই মুহুর্তে কয়েকজন ছাড়া অন্যরা সরব নয়। খেয়াল করেছি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনতো দূরে থাক, বড় কোনো ঘটনার সংবাদও ভালো মিডিয়ায় আসছে না। এসব ভালো লক্ষণ নয়। বলা যায় স্থানীয় সাংবাদিক ও সাংবাদিকতা বিকাশে বড় অন্তরায়।

আরও একটি বিশেষ দিক আমার কাছে একটু অন্যরকম মনে হচ্ছে। সেটি হলো হাতেগুণা কয়েকজন ছাড়া সাংবাদিক বন্ধুরা এখন প্রশাসনিক দপ্তর, রাজনৈতিক মহল ও সামাজিক অঙ্গনে ছুটাছুটি কমিয়ে দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্তা ব্যক্তিরা কয়েকজনকে ছাড়া অন্যদের আমলে নিচ্ছেন না। আর এই অবস্থায় সবার মধ্যে এক ধরণের অদৃশ্যমান অস্থিরতা কাজ করছে বলে মনে হয়। সাংবাদিক সংগঠনগুলো সাংবাদিকদের মনের অবস্থা বুঝতে পারছেন বা চেষ্টা করছেন বলে মনে হচ্ছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় রাজনীতিকরণ সাংবাদিকদের মধ্যে ভীতি তৈরি করছে। তবে দেড় বছরের ব্যবধানে ভৈরব প্রেসক্লাবে পিআইবির দুটি সাংবাদিক প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন ছিল আশা জাগানিয়া বার্তা। আর এই আয়োজন উপজেলা শহরে বাস্তবায়নের প্রথম উদ্যেক্তা হিসেবে একটু আনন্দ অনুভব করি বটে।

আমার মনে হয় প্রিয় শহর ভৈরবের ভারসাম্য ঠিক রাখতে হলে অনেকগুলো দিকের মধ্যে গতিশীল সাংবাদিকতা চলমান রাখা খুবই জরুরি। তা না হলে আমরা ভারসাম্যহীন সমাজ ব্যবস্থার বাসিন্দা হয়ে যাব।
এসব কথা ফেসবুক বন্ধুদের কাছে তুলে ধরার দুটি কারণ। প্রথমটি হলো, আমার কাছে মনে হয় প্রত্যেক ফেসবুক বন্ধু এখন নাগরিক সাংবাদিক। তাঁরা সমাজের নানা অসংগতি তুলে ধরে আমাদের ব্যর্থতার ক্ষত কিছুটা হলেও দূর করছেন। ইতিবাচক অনেক তথ্য ফেসবুক বন্ধুদের কল্যানে পাচ্ছি।

আর এই কয়েক বছরে ভৈরবে বলার মতো সাংবাদিকদের বড় আয়োজন না থাকাটাও ফেসবুকে তুলে ধরার আরেকটি কারণ।

প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুরা, নানা কারণে আমার সাংবাদিকতারও গতি কমেছে। সামাজিক ব্যক্তিবর্গ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কাছে প্রয়োজনীয়তা কমে যাচ্ছে। কালভাদ্রে থানায় যেতে গিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে। কন্সটেবলরা প্রধান ফটকে আমায় আটকে দিচ্ছে। অবশ্য এতে আমার কোনো কষ্ট নেই। বরং সামান্য পুলকিত হবার সুযোগ আছে। তবে কথা হলো, আমাদের এই অবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। নিজেদের ভুলগুলো দূর করে মাঠে নেমে পড়তে হবে। মাঠ থেকে সংবাদ তুলে এনে তা নিজ নিজ গণমাধ্যমে পাঠাতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে এক বা দুইজন সাংবাদিক ভালো করলে চলবে না। ভৈরবের প্রয়োজনে দলগত ধারাবাহিক সাংবাদিকতা খুবই জরুরি। আসুন আমরা হৃত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে গতি বাড়িয়ে মাঠে নেমে পড়ি। এতে হয়ত কিছু বাঁধা আসবে, তবে তা দূরযোগ্য। (চলবে)

বি:দ্র:- দলগত সাংবাদিক বলতে সিন্ডিকেট কিংবা কপি-পেস্ট সাংবাদিকতা বুঝানো হয়নি।

সুমন মোল্লা, চন্ডিবের মোল্লা বাড়ি, ভৈরব।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।