‘একজন মহাপুরুষের উত্থান’

।।গৌতম লাহিড়ী ।।

জাতীয় শোক দিবসের দিন নয়াদিলি্লর বাংলাদেশ হাইকমিশনে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও বিশ্বদর্শন বিষয়ে আলোচনা করে অংশগ্রহণ করার জন্য হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী আমন্ত্রণ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর মতো বিশাল ব্যক্তিত্ব ও রাষ্ট্রনেতা সম্পর্কে আমার মতো নগণ্য ব্যক্তির মূল্যায়ন করা শোভা পায় না। তাই বেছে নিয়েছিলাম ভিন্ন বিষয়_ বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। ইদানীং পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক মূল্যায়ন প্রাধান্য পাচ্ছে। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, এই পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমের পূর্ব প্রজন্ম বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, বিশেষ করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে যে মূল্যায়ন করেছিলেন, সেটা আজ নতুন করে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। নবপ্রজন্মের সাংবাদিকদের কাছে সেই ইতিহাস আজ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। সে ইতিহাসের পাতা খুঁজে বের করতেই মূলত এ প্রতিবেদন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর প্রশাসন সম্পর্কে কিছু নেতিবাচক সমালোচনা হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে প্রায় শূন্য থেকে গড়ে তোলার যে প্রয়াস নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু, তা উলি্লখিত রয়েছে বিদেশি গণমাধ্যমে। আমি ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের মূল্যায়নকে এ প্রতিবেদনের বিষয় করছি না। বলছি আমেরিকা, ব্রিটেনসহ ইউরোপীয় সংবাদ মাধ্যমের কথা। ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে আমেরিকার টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ‘গত মার্চে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর তাণ্ডবলীলার পর বিশ্বব্যাংকের এক বিশেষ পরিদর্শক দল বাংলাদেশ সরেজমিন তদন্ত করার পর রিপোর্টে বলেছিল, প্রত্যুষে বাংলাদেশের কয়েকটি শহর পরিদর্শনের পর মনে হয়েছে, এ যেন পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের পরবর্তী অবস্থা।’ তারা আরও লিখেছিল, ছয় লাখেরও বেশি গৃহ বিধ্বস্ত, দেড় কোটি কৃষকের কোনো চাষের উপকরণ ছিল না; পরিবহন-যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত, সড়ক সেতু, নদীপথ রুদ্ধ। পাকিস্তানি সেনা আত্মসমর্পণ করা পর্যন্ত লাখ লাখ নারী ধর্ষিত। পশ্চিম পাকিস্তানের সব ব্যবসায়ী-শিল্পপতি তাদের পুঁজি পূর্ব পাকিস্তানের ভাণ্ডার শূন্য করে পাচার করে দিয়েছিল। পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা চট্টগ্রামের ব্যাংকে গুনে গুনে ১১৭ টাকা রেখে গিয়েছিল। পাকিস্তানি সেনা টাকশালে সব টাকা-পয়সা ধ্বংস করে দিয়েছিল, যাতে স্বাধীন বাংলাদেশ নগদ অর্থের অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরে। রাস্তা থেকে এবং ডিলারদের কাছ থেকে মোটরগাড়ি ছিনতাই করে করাচি-লাহোর পাচার করা হয়েছিল। আজকের বাংলাদেশের কোনো শহর দেখলে এ অতীত স্মৃতি কি মনে পড়বে? সেই বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে গঠনের কাজ শুরু করেছিলেন বঙ্গবন্ধু।

বিশ্বের নেতা, বিশ্লেষক, গণমাধ্যম ছাড়া বঙ্গবন্ধু বিশেষ শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে উঠেছিলেন বিদেশি বহু ব্যক্তিত্বের কাছে, যারা প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। এ রকম একজন আমেরিকার মিশনারি জিয়ানিন লকারবাই। তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রামে ছিলেন। তিনি ‘অন ডিউটি ইন বাংলাদেশ’ নামক পুস্তকে তার অভিজ্ঞতা লিখতে গিয়ে লিখেছিলেন_ ‘এমন একজন মহাপুরুষের উত্থান ঘটছে, যিনি নিপীড়িত বাঙালিদের ত্রাতা। নাম তার শেখ মুজিবুর রহমান। ভালোবেসে ডাকা হয় মুজিব বলে।’ লন্ডন অবজারভারের সাংবাদিক সিরিল ডান লিখেছিলেন, ‘এক হাজার বছরের বাংলাদেশের ইতিহাসে শেখ মুজিবুর রহমানের মতো মানুষ মেলা ভার হবে, যিনি রক্ত, জাত, ভাষা, জন্ম, সংস্কৃতিতে আপাদমস্তক একজন বাঙালি। তার কণ্ঠ থেকে বজ্রনির্ঘোষ হয়। তার ব্যক্তি-মহিমায় মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো আকৃষ্ট হয়। যেন ম্যাজিক। তার মধ্য থেকে যে সাহসিকতা ও আকর্ষণ করার ক্ষমতা নিঃসারিত হতো, তা তাকে মহামানবের পর্যায়ে উন্নীত করেছিল।’
মার্কিনি টাইম ম্যাগাজিন লিখেছিল_ ‘ভারতীয় উপমহাদেশের বিগত অর্ধশতাব্দীতে যে কয়জন বিতর্কিত তথা জনমনোমোহিনী শক্তিসহ বিরাজ করতেন, তারা হলেন মহাত্মা গান্ধী, মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ ও জওয়াহেরলাল নেহরু। এ তালিকায় আরও একটি নাম যুক্ত হতে চলেছে_ তিনি হলেন শেখ মুজিবুর রহমান। এমনকি তার সমালোচকরাও মানতেন, শেখ মুজিবুরের মতো জনপ্রিয় নেতা খুঁজে মেলা সম্ভব নয়।’ ১৯৭১ সালের এপ্রিলে নিউজউইক ম্যাগাজিন এক প্রতিবেদনে বঙ্গবন্ধুকে পরিচয় দিতে বলেছিল, ‘তিনি হলেন রাজনীতির কবি।’ সাধারণ বাঙালির তুলনায় দীর্ঘদেহী (৫ ফুট ১১ ইঞ্চি), হালকা পকস্ফকেশ, কৃষ্ণকালো চোখের নিচে ঘন শ্মশ্রু। মুজিবের উপিস্থিতিতে লাখ লাখ মানুষ উন্মাদের মতো জড়ো হতো, আবেগঘন ভাষণে তাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতেন। তার অভিনব কুশলী দক্ষতায় সব জাত, ধর্ম, শ্রেণির মানুষকে এক পঙ্ক্তিতে নিয়ে আসতে পারতেন।’
১৯৭১ সালের বিজয় দিবসে নতুন বাংলাদেশের মানুষ জয়ে আনন্দে উল্লসিত ছিলেন ঠিকই, কিন্তু ব্যথিত হয়েছিলেন মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে। কেউ জানতে পারছিলেন না বঙ্গবন্ধু জীবিত, না মৃত! জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তানের নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের চাপে প্রথম ঘোষণা করলেন_ বঙ্গবন্ধু জীবিত; তিনি পাকিস্তানের কারাগারে আটক। আন্তর্জাতিক মিডিয়া তখন প্রায় সোচ্চার বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে। নিউইয়র্ক টাইমস প্রথম ঘোষণা করে ২০ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধুর মুক্তির সংবাদ। মুক্তি দিলেও পাকিস্তানের শাসকরা তাকে অজ্ঞাত স্থানে গৃহবন্দি করে রাখে। তাকে ২৩ ডিসেম্বর রাওয়ালপিন্ডিতে নিয়ে আসা হয় ভুট্টোর সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসতে।
আমেরিকা, জাপান, ব্রিটেনের মিডিয়া থেকে জানা যায়, ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসি দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরের পরে ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সমঝোতায় আসতে চেয়েছিলেন, যদি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানকে পৃথক হলেও বাঁচিয়ে রাখা যায়। ভুট্টোর প্রস্তাব ছিল_ দুই পাকিস্তান মিলিয়ে যদি কনফেডারেশন করা যায়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু রাজি হননি। তিনি বলেছিলেন, দেশে ফিরে মানুষের মতামত ছাড়া তিনি কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। ভুট্টো ভয়েস অব আমেরিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ঘোষণা দিয়েছিলেন_ দুই পাকিস্তানের অস্তিত্ব থাকবে; এটা নাকি তার মুজিবের সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু সাংবাদিক রবার্ট পাইন সাফ ফাঁস করেন_ এটি সত্যি নয়। মুজিব ভুট্টোর প্রস্তাবে সম্মতি দেননি। ভুট্টো তারপরও অপেক্ষা করে ছিলেন। তিনি মুজিবকে ইরান বা তুর্কি যাওয়ার প্রস্তাব দেন। তাতেও মুজিব রাজি হননি। তখন বিশ্বের জনমত তুঙ্গে। চাপে পড়ে ভুট্টো ৮ জানুয়ারি তাকে লন্ডন যাওয়ার অনুমতি দেন।

পরদিন বিবিসি প্রথম ব্রেকিং নিউজ দেয়_ ‘পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এখন লন্ডনে।’ তার পর লন্ডনের ক্ল্যারিজ হোটেলে ভিড়ে ঠাসা সংবাদ সম্মেলনে মুজিব ঘোষণা করলেন_ ‘জেন্টলম্যান অব দ্য প্রেস, আই অ্যাম অ্যালাইভ। অত্যন্ত খুশির সঙ্গে ঘোষণা করছি, আমার দেশের জনগণ এক ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধ শেষে জয়লাভ করেছে। আমার আজ আনন্দের সীমা নেই।’ লক্ষণীয়, তিনি প্রথম সাংবাদিক বৈঠকে যাবতীয় কৃতিত্ব দিয়েছিলেন বাংলাদেশের অগণিত সাধারণ মানুষকে। নিজে ব্যক্তিগতভাবে কোনো কৃতিত্ব নেননি। অথচ বাংলাদেশ কেন গোটা বিশ্ব জানে, এই সংগ্রাম পরিচালনা করেছেন আর কেউ নন; শেখ মুজিবুর রহমান।
আমার বলার উদ্দেশ্য, এসব তথ্য সাধারণ মানুষ ও পাঠকের কাছে পেঁৗছে দিয়েছে আন্তর্জাতিক বিশেষ করে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম। তাই বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই ইতিহাস বারবার তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে। বক্তব্য শেষ করছি ভারতীয় কবি অন্নদাশঙ্কর রায়ের একটি পঙ্ক্তি উল্লেখ করে_ ‘যতকাল রবে পদ্মা যমুনা/গৌরী মেঘনা বহমান/ ততকাল রবে কীর্তি তোমার/ শেখ মুজিবর রহমান।’

নোট: সমকাল থেকে নেয়া।

One thought on “‘একজন মহাপুরুষের উত্থান’

  • জুলাই 12, 2018 at 11:21 অপরাহ্ন
    Permalink

    All East Pakistani minded seeing the truth, but still believing the lies because stupid is knowing the truth.

    Reply

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।