বিজ্ঞানে বাংলা ভাষা

।। অরুণ কুমার বসাক ।।

 দেশের বরেণ্য সর্বজন শ্রদ্ধেয় সাবেক প্রধান বিচারপতি মরহুম মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান তার ‘মাতৃভাষার সপক্ষে রবীন্দ্রনাথ’ বইতে তুলে ধরেছেন মাতৃভাষার গুরুত্ব সম্পর্কে কবিগুরুর উক্তি। ১৯৩৬ সালের ‘শিক্ষার স্বাঙ্গীকরণ’ প্রবন্ধে কবিগুরু বলেন, ‘শিক্ষায় মাতৃভাষাই মাতৃদুগ্ধ।’ এর পর অন্য ভাষা আত্তীকরণ আত্মহিতকর। মাতৃভাষাতে ‘ভাব প্রকাশ স্বতঃস্ফূর্ত।’ এই স্বতঃস্ফূর্ততা আমাদের বাংলা ভাষাতে নতুন শব্দের জন্ম দিয়েছে। বিচারপতি মরহুম রহমান তার বইটির পূর্বাভাসে লিখেছেন, “তার চার বছরের কিছু কম বয়সের কন্যা বলেছিল, ‘আব্বা, দেখ হাঁসটা কেমন লাপাত্ লাপাত্ করে হাঁটছে।’ লাপাত্ নতুন শব্দ, এক মূর্তভাবের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ।” কিন্তু কথাটা বুঝতে অসুবিধা হয়নি।
মাতৃভাষায় পারঙ্গমতা থাকলে, অন্য ভাষায় লেখা যে কোনো বিষয়ের ভাবার্থ সম্যকভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব। মাতৃভাষা মানুষের ভাবের (অনুভূতির) ভাষা। কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের (জন্ম ১৮৬১ সালে) প্রায় চার দশক আগে ১৮২৪ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তখন ব্রিটিশ আমলে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির যুগসন্ধিক্ষণে ইংরেজি শিক্ষা মধুসূদনের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিল সত্য, যার পরিণতিতে তিনি ধর্মান্তরিত হয়েছেন, পাশ্চাত্যের বিভিন্ন ভাষা শিখে হোমার, ভার্জিল ও মিলটনের মহাকাব্যের মধুর রসসুধা পান করেছেন, এবং ্তুঈধঢ়ঃরাব খধফু্থ ও ্তুঠরংরড়হং ড়ভ ঃযব চধংঃ্থ ইংরেজিতে কাব্য রচনা করেছেন। কিন্তু পিতার মৃত্যুর পর বন্ধুদের অনুরোধে তার বঙ্গানুভূতি প্রবলভাবে আবার জাগ্রত হয়। তিনি পাশ্চাত্যের ‘অমিত্রাক্ষর ছন্দ (ইষধহশ ঠবৎংব)’ ও ‘চতুর্দশপদী ছন্দ (ঝড়হহবঃ)-রসে সিঞ্চিত করে বাংলা সাহিত্যে ‘নতুন যুগ’-এর সূচনা করে গেছেন। এ সম্পর্কিত তার কয়েকটি রচনার মধ্যে সবচেয়ে সাফল্যজনক সৃষ্টি অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত ‘মেঘনাদবধ কাব্য’। নতুন ছন্দের প্রয়োজনে তিনি মাতৃভাষার অনুভূতি দিয়ে নতুন নতুন শব্দ,’বারুণী’, ‘বাহিরিল’ প্রভৃতি চয়ন করেছেন। তার বহুমুখী প্রতিভার প্রভাবে, ‘মাতৃভাষা বাঙলার অন্তর্নিহিত শক্তিকে জাগ্রত করে মাইকেল অমরত্ব লাভ করেছেন।’
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘বিজ্ঞান ও সাহিত্যের প্রকোষ্ঠ সংস্কৃতির ভিন্ন ভিন্ন মহলে। কিন্তু… আসা-যাওয়ার … পথের পথিক ছিলেন (আচার্য) জগদীশ (বসু ও কবিগুরু)।’ কবিগুরুর ভাষায়, ‘আমার নিজের বিজ্ঞানের অনুশীলন ছিল না; কিন্তু তা প্রবৃত্তির মধ্যে ছিল। জগদীশেরও অনুরূপ অবস্থা ছিল সাহিত্য সম্বন্ধে। আমাদের মিলনের অবকাশ ছিল নিবিড় দেশপ্রেমের মাধ্যমে।’ কবিগুরুর উক্তি থেকে শিক্ষণীয় যে, রবীন্দ্রনাথ মাতৃভাষার আবেগ নিয়ে বিজ্ঞানকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। অন্যদিকে একই অনুভূতির কারণে আচার্য জগদীশ বসু বাংলাভাষাতে প্রথম বিজ্ঞান-গল্প এবং বিজ্ঞানকে বাংলা প্রবন্ধে পরিবেশন করতে পেরেছিলেন। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ও একই অনুভূতি নিয়ে বিজ্ঞান-পাঠ্যবই এবং মাসিক সাময়িকীতে বিজ্ঞান প্রবন্ধ বাংলাতে লিখতেন। এ ছাড়াও তিনি ক্লাসে বাংলাতে পড়াতেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ তার অনুভূতি প্রভাবে পরমাণু-বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কে যা বুঝেছেন তা তিনি তার ‘বিশ্বপরিচয়’ বইতে ব্যক্ত করেছেন। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা এটা পড়লে বুঝতে পারবে, কী করে বিজ্ঞানকে অনুভূতিতে আনতে হয়।
অক্ষয়কুমার দত্তের (১৮২০-১৮৮৬) ১৮৪১ সালে বাংলা ভাষাতে লেখা ভূগোল প্রথম বিজ্ঞান-বিষয়ক এবং ১৮৫৬ সালে বাংলাতে রচিত পদার্থবিদ্যা বিশুদ্ধ বিজ্ঞানের প্রথম গ্রন্থ। কলকাতার বিখ্যাত হেয়ার স্কুলের স্থপতি ডেভিড হেয়ারের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে তিনি প্রথম ব্রিটিশ শিক্ষানীতিতে মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন।
মাতৃভাষার আবেগ নিয়ে বাংলাভাষার মর্যাদা রক্ষার্থে ১৯৫২ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন হয়েছিল। ওই সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে রফিকউদ্দিন আহমদ, আবুল বরকত, সফিউর রহমান, আবদুল জব্বার ও আবদুস সালাম যেভাবে মাতৃভাষার জন্য জীবনদান করেছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সংবিধানে বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এই আবেগেরই অনন্য নিদর্শন ১৯৬৯ সালে ড. সৈয়দ মুহম্মদ শামসুজ্জোহার আত্মাহুতি। এ আবেগেই ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ডাক এসেছিল। বঙ্গবন্ধু সর্বস্তরে বাংলাভাষা প্রচলন শুরু করেছিলেন। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটি জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোতে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হচ্ছে।
জগদীশচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ও প্রফুল্লচন্দ্র প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির যুগসন্ধিক্ষণে মাইকেল মধুসূদনের মতো পাশ্চাত্য শিক্ষায় দীক্ষিত হয়েছিলেন। কিন্তু জগদীশ, রবীন্দ্রনাথ ও প্রফুল্লচন্দ্র তিনজনই পাশ্চাত্য সংস্কৃতির ভালো অংশটুকু গ্রহণ করেছিলেন। ফলে তাদের জীবন অকালে ঝরে পড়েনি বা ট্র্যাজেডিতে পর্যবসিত হয়নি। তারা তিনজনই দীর্ঘ জীবনের পুরো সময় মানুষের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। তাদের সাংস্কৃতিক প্রকোষ্ঠে বিভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও তারা নির্ভেজাল অসাম্প্রদায়িক, অকৃত্রিম অধ্যবসায়ী, অসাধারণ মানুষদরদি, অকুতোভয় দেশপ্রেমিক ও মাতৃভাষায় প্রবল আবেগবান ছিলেন। তিনজনই বহু ভাষা জানতেন। প্রফুল্লচন্দ্র রায় জগদীশ বসুর তিন বছরের বয়োকনিষ্ঠ এবং রবীন্দ্রনাথের সমবয়সী ছিলেন।
বিজ্ঞানী সত্যকে উদ্ঘাটন করেন, যন্ত্রের মাধ্যমে ফলাফল প্রদর্শন করে। কবি ও সাহিত্যিক আনন্দ দান করেন মানুষের হৃদয়কে হরণ করে। বিজ্ঞান ও সাহিত্য দেশ তথা সমগ্র বিশ্বে পারস্পরিক সহনশীলতা, বন্ধনশক্তি এবং সৌহার্দ-একাত্মতা এনে দিতে পারে। আচার্য জগদীশ বসু ও আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় দেশপ্রীতির স্বার্থে বহুবিষয়ক (সঁষঃর-ফরংপরঢ়ষরহধৎু ভরবষফ) অনুশীলন ও গবেষণার দ্বার উন্মুক্ত করে গেছেন।
ইউরোপীয় সাধারণ বিজ্ঞানকে বাংলা ভাষাতে প্রথম তুলে ধরেন অক্ষয়কুমার দত্ত। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ও আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় মৌলিক ধারণা-প্রসূত এবং গবেষণানির্ভর বিজ্ঞানকে বাংলা ভাষাতে ব্যক্ত করেছেন। উভয়েই বিজ্ঞান গবেষণার মূল ভিত্তি রচনা করে গেছেন উপমহাদেশে। জগদীশের রচনাতে আকাশচুম্বী গবেষণার প্রাধান্য অনেক বেশি। অব্যক্ত পুস্তকটিতে আচার্য বসু তার বিজ্ঞান সাধনায় আবিষ্কৃত প্রকৃতির বিভিন্ন রহস্যজনক স্বরূপ প্রাঞ্জল বাংলা ভাষাতে উপস্থাপন করেছেন। পুস্তকটিতে তার উদ্ভাবিত অদৃশ্য আলোক (মাইক্রোওয়েভ), নির্বাক উদ্ভিদ জীবন ও উদ্ভিদ-স্নায়ুতে উত্তেজনা-প্রবাহ আলোচনা করেছেন। অন্যদিকে মৌলিক গবেষণাতে জগদীশচন্দ্রের মতো অতটা নব নব আবিষ্কার শোভিত না হলেও প্রফুল্লচন্দ্রের রচনা বিভিন্নমুখী। মূল গবেষণা ছাড়াও তিনি হারিয়ে যাওয়া ভারতবর্ষের মধ্যযুগীয় বিজ্ঞান-গবেষণাকে পুনরুদ্ধারপূর্বক ভারতবর্ষে বিজ্ঞানচর্চার ধারাবাহিকতা উপস্থাপন করেছেন। তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলা ভাষায় সরল জীব-বিজ্ঞান গ্রন্থ ও প্রকৃত সৃজনশীল মানুষ হতে উপদেশমূলক প্রবন্ধ, বাঙালি জাতির উন্নয়নে সামাজিক প্রতিবন্ধকতা উল্লেখসহ প্রতিকারের পরামর্শমূলক বক্তৃতা করেছেন, প্রবন্ধ রচনা এবং বাংলা ভাষায় বৈজ্ঞানিক পরিভাষা প্রণয়ন করেছেন। আচার্য রায় শিক্ষার্থীদের তাদের মন উদার করতে বলতেন, ‘সর্বত্র জয় অনুসন্ধান করবে, তবে পুত্র ও শিষ্যের নিকট পরাজয় স্বীকার করে সুখী হবে।’
আচার্য বসু তার বহুমুখী গবেষণার মাধ্যমে বিজ্ঞান জগতে বাঙালি তথা ভারতবর্ষের সম্মান পাশ্চাত্যে শীর্ষস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আচার্য রায় রসায়ন গবেষণা ছাড়াও ভারতীয়দের হৃত বিজ্ঞানকে পুনরুদ্ধার করে ভারতীয় ভেষজ ও ধাতব রসায়নের নতুন করে ভিত্তি রচনা করে গেছেন। বাঙালির দারিদ্র্য মোচনের জন্য শিল্পোদ্যোগকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, ভারতীয় কুসংস্কারের প্রতি কশাঘাত করেছেন, সমাজসেবার অতুলনীয় অবদানের দৃষ্টান্ত রেখেছেন। মানবকল্যাণে তিনি ছিলেন অকৃত্রিমভাবে নিবেদিত। শিক্ষার্থীদের মাঝে দরদি শিক্ষক, বৈজ্ঞানিক মহলে তিনি বিজ্ঞানী, ব্যবসায়ী সমাজে ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ দলে অর্থনীতিজ্ঞ, রাজনীতিক মহলে দেশপ্রেমিক। তিনি ভালো বেহালা বাদকও ছিলেন।
স্বরাজ প্রতিষ্ঠাতে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ, আচার্য বসু এবং আচার্য রায় একমত পোষণ করতেন। তিনজনই এর লক্ষ্যে বাঙালি তথা ভারতবাসীর দারিদ্র্য মোচনের জন্য ব্রতী হয়েছেন। এটার বাস্তবায়নে তাদের পদ্ধতিগত বিভিন্নতা ছিল। কবিগুরু ১৯১৯ সালে জালিনওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ব্রিটিশ প্রদত্ত ‘নাইট’ সম্মান ত্যাগ করেন; কিন্তু পাশ্চাত্যে তৈরি উন্নতমানের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে সমবায় খামারের পদ্ধতি চালু করেছেন। আচার্য বসু ভারতবর্ষে দারিদ্র্য দূর করতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সার্বিক উন্নয়নে অবদান রেখেছেন। বিজ্ঞানচর্চায় বাঙালির অসামান্য সামর্থ্য প্রমাণ করেছেন বিভিন্ন দিগন্তে আকাশচুম্বী আবিষ্কার দিয়ে। আর আচার্য রায় দেশি ও বিদেশি পদ্ধতি ব্যবহার করে দেশীয় দ্রব্য ব্যবহার করে সমাজ ও শিল্প উন্নয়নের জন্য সমবায় সমিতি ও অনেক সমবায় প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছেন। তিনি সমবায় ব্যাংকও প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে চরকায় সুতো কাটাতে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেন। ব্রিটিশ গোয়েন্দা দপ্তরে তার নাম ছিল ‘বিজ্ঞানী বেশে বিপ্লবী’। তিনজন পরিপূরক ও সম্পূরকভাবে বাংলা তথা ভারতবর্ষ জাগরণে বিরাট অবদান রেখেছেন এবং উপমহাদেশে ব্রিটিশ রাজত্বের অবসান ত্বরান্বিত করেছেন।
তাদের জীবনী পাঠ করে আমরা শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা বুঝতে পারব, বড় মানুষ মানে কী? অথবা বড় হতে গেলে কী গুণাবলি অর্জন করা প্রয়োজন? উপযুক্ত ভবিষ্যৎ বংশধর তৈরিতে শিক্ষক ও অভিভাবকদের কী রকম ‘ভূমিকা’ হওয়া উচিত, আমাদের তা শিক্ষণীয়। শিক্ষার্থীদের জন্য কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ, আচার্য বসু এবং আচার্য রায় রোল মডেল। মহান শিক্ষকদের ছাত্ররাও বড় হন।
ইমেরিটাস অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়; ফেলো বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।