ভারতে অ্যাডল্ফ হিটলার কেন ঘৃণিত নন?

ভারতে এ সপ্তাহেই একজন এমপি তার নিজের রাজ্যের জন্য আরও বেশি সরকারি অনুদানের দাবিতে পার্লামেন্টে এসেছিলেন অ্যাডলফ হিটলারের পোশাক পরে।

নাৎসি পোশাক পরে পার্লামেন্টে এলে পৃথিবীর বহু দেশেই হয়তো ধুন্ধুমার বেঁধে যেত – কিন্তু ভারতে এই ঘটনাকে প্রায় সবাই বেশ হালকাভাবেই নিয়েছেন।

এর আগেও ভারতে হিটলারের নামে ক্যাফে, রেস্তোরাঁ, টি-শার্টের দোকান – এমন কী আইসক্রিম পর্যন্ত চালু হয়েছে, কিন্তু দেশের খুব সামান্য কয়েক হাজার ইহুদী ছাড়া কেউই তার বিশেষ প্রতিবাদ করেননি।

পর্যবেক্ষকরাও বলছেন, ভারতীয় সমাজে হিটলারের একটা গ্রহণযোগ্যতা বহুদিন ধরেই তৈরি হয়েছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই – আর তার পেছনে কিছু ঐতিহাসিক কারণও আছে।

গত বুধবারই (৯ আগস্ট) ভারতীয় পার্লামেন্টে হিটলার সেজে এসেছিলেন তেলুগু দেশম পার্টির এমপি ও সাবেক অভিনেতা নারামাল্লি শিবপ্রসাদ।

রাজধানী দিল্লির ফুটপাথে বিক্রি হচ্ছে হিটলারের আত্মজীবনী
রাজধানী দিল্লির ফুটপাথে বিক্রি হচ্ছে হিটলারের আত্মজীবনী

তার বক্তব্য ছিল, নিজের রাজ্য অন্ধ্রপ্রদেশের জন্য বাড়তি অর্থ সহায়তার দাবি যাতে আরও বেশি লোকের নজরে পড়ে – সে কারণেই নাকি তিনি হিটলারের পোশাক পরে এসেছেন।

পার্লামেন্টের বাইরে ক্যামেরায় পোজ দিয়ে তাকে বিচিত্র অঙ্গভঙ্গীতে বারবার ‘ডিক্টেটর’, ‘ডিক্টেটর’ বলতেও শোনা যায়।

কিন্তু টুইটারে সামান্য কিছু মৃদু প্রতিবাদ ছাড়া ভারতে এই হিটলার সাজার মধ্যে কেউই প্রায় দোষের কিছু দেখছেন না।

দিল্লি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অনিরুদ্ধ দেশপান্ডের তো এটাও বলতে দ্বিধা নেই হিটলার ভারতে রীতিমতো জনপ্রিয়ও।

তিনি জানাচ্ছেন, “হিটলারের আত্মজীবনী ‘মাইন ক্যাম্ফ’ তো ভারতে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া বইগুলোর একটা। দেশের প্রায় প্রতিটা ট্র্যাফিক ক্রসিংয়ে আপনি বইটা বিক্রি হতে দেখবেন। হিটলার ব্র্যান্ডের টি-শার্ট পর্যন্ত পাওয়া যায় এ দেশে।”

ভারতের আহমেদাবাদ শহরে হিটলারের নামে একটি টিশার্ট বিপণি
ভারতের আহমেদাবাদ শহরে হিটলারের নামে একটি টিশার্ট বিপণি

“হিটলার আসলে কে ছিলেন, সে সম্পর্কে ভালভাবে না-জেনে না-বুঝেই ভারতের মানুষ তার সম্পর্কে একটা ধারণা তৈরি করে নিয়েছে। ভারতীয়দের বিশ্বাস হিটলারের সব দোষত্রুটি সত্ত্বেও তিনি জার্মানিকে এক মহান দেশ বানিয়েছিলেন – এবং তিনি ছিলেন বিরাট ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির মূর্ত প্রতীক।”

ভারতে জিউইশ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান আইস্যাক মালেকার অবশ্য বিবিসিকে বলছিলেন, এ দেশের ইহুদীরা হিটলারকে দেখেন সম্পূর্ণ অন্য চোখে।

তিনি জানাচ্ছেন, “হিটলার শব্দটা এইচ দিয়ে শুরু হয় বলে আমরা কোনও শব্দের শুরুতে এইচ-টা উচ্চারণ পর্যন্ত করি না। আসলে ষাট লক্ষ ইহুদীর সঙ্গে তিনি যা করে গেছেন, আমৃত্যু তা আমরা কখনও ভুলতে পারব না – ভোলা সম্ভবই নয়!”

কিন্তু ভারতে ইহুদী সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা মাত্রই হাজার ছয়েক। বাকি কোটি কোটি ভারতীয় হিটলার সম্পর্কে একই ধারণা পোষণ করেন তা মোটেই বলা যাচ্ছে না।

মুম্বইতে হিটলারস ক্রস রেস্তোরাঁও এক সময় রমরম করে চলেছে, হিটলার আইসক্রিম খেতেও আম ভারতীয়দের কোনও সমস্যা হয়নি।

মুম্বাইতে একদা চালু হয়েছিল হিটলারস ক্রস রেস্তোরাঁ ও ক্যাফে
মুম্বাইতে একদা চালু হয়েছিল হিটলারস ক্রস রেস্তোরাঁ ও ক্যাফে

ইতিহাসবিদ মহুয়া সরকার মনে করেন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়ার যুগ থেকেই হিটলারের প্রতি ভারতের একটা দুর্বলতা তৈরি হয়েছিল।

তিনি বলছিলেন, “মৌলিক একটা অ্যান্টি-কলোনিয়াল, অ্যান্টি-ব্রিটিশ অবস্থান ভারতীয়দের মধ্যে আছেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যে দুই শিবিরে পৃথিবী ভাগ ছিল, সেখানে ভারত কিন্তু কখনওই মিত্রশক্তিকে মন থেকে সমর্থন করতে পারেনি।”

“হ্যাঁ, মিত্রশক্তির হয়ে ভারতের সেনারা যুদ্ধ হয়তো করেছে। কিন্তু আদর্শগতভাবে জার্মানি ও জাপানের প্রতি ভারতের একটা দুর্বলতা সব সময়ই কাজ করেছে যে এরা ব্রিটিশ ব্লকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে।”

“দ্বিতীয় যে ফ্যাক্টরটা বিশেষত বাংলায় কাজ করেছে, তা হল সুভাষ বোস যেটা ভেবেছিলেন – কলোনাইজারদের যারা শত্রু তাদের দিয়েই ওদের সরাব – এই ভাবনাটার প্রতিও একটা প্রবল সমর্থন ছিল”, বলছিলেন ড: সরকার।

ভারতে স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম নায়ক সুভাষ বোস ও হিটলারের মোলাকাত নিয়ে পরে সমালোচনাও কম হয়নি। মি বোসের পরিবারের সদস্য ও বর্তমানে বিজেপি নেতা চন্দ্রকুমার বোস অবশ্য বিষয়টাকে ভিন্নভাবে দেখতে চান।

তিনি বিবিসিকে বলছিলেন, “সুভাষ বোসও হয়তো হিটলারকে ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করতেন না। কিন্তু তার নীতিটা ছিল আমার শত্রুর শত্রুই আমার বন্ধু – এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সে যুগে একমাত্র হিটলারই পারতেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে টক্কর দিতে। আর বোধহয় কিছুটা পারতেন তোজো, জাপানের জেনারেল তোজো।”

বার্লিনে সুভাষচন্দ্র বোস, যে সফরে তিনি দেখা করেন হিটলারের সঙ্গে
বার্লিনে সুভাষচন্দ্র বোস, যে সফরে তিনি দেখা করেন হিটলারের সঙ্গে

“এই যে সুভাষ বোস হিটলার আর জেনারেল তোজোর সাহায্য নিয়েছিলেন সেটা এই কারণে নয় যে তিনি তাদের ভীষণ ভক্তিশ্রদ্ধা করতেন। তিনি ছিলেন বাস্তববাদী, প্র্যাগম্যাটিক লোক – আর ওটা ছিল তার মিলিটারি স্ট্র্যাটেজি। কারণ গান্ধীর অহিংসা আর অনশনের ভরসায় বসে থাকলে কোনওদিন ব্রিটিশ ভারত ছেড়ে যেত বলে মনে হয় না।”

হিটলারকে ভারতে গ্রহণযোগ্যতা দেওয়ার পেছনে আরএসএসের তাত্ত্বিক গুরু এস এস গোলওয়ালকরেরও ভূমিকা ছিল বলে মনে করা হয় – যিনি তার পরিকল্পিত হিন্দুরাষ্ট্রে হিটলারের দেখানো রাস্তাই অনুসরণ করতে চেয়েছিলেন।

মহুয়া সরকারের কথায়, “আরএসএসের মধ্যে মিলিট্যান্ট ন্যাশনালিজম বা জঙ্গী জাতীয়তাবাদের যে একটা ব্যাপার আছে, ওইখান থেকেই কোথাও একটা নাৎসিবাদকেও একটা যুক্তিসঙ্গত আদর্শবাদ বলে তারা মনে করে।”

“আরএসএসের আইডিওলজির মধ্যেও আসলে মিলিট্যান্সির একটা স্পেস রয়েই গেছে – আর সেই স্পেসটা থেকেই, সেই পটভূমিতেই নাৎসি আদর্শবাদকেও জাস্টিফাই করতে তারা দ্বিধা করে না।”

অধ্যাপক সরকার আরও বলছিলেন, নাৎসিদের স্বস্তিকা চিহ্নও হিটলার হিন্দুধর্ম থেকেই নিয়েছিলেন বলে অনেকে বিশ্বাস করেন – আর সেটাও সম্ভবত রেখে গেছে একটা যোগসূত্র।

সব মিলিয়ে হলোকস্ট শেষ হওয়ার সত্তর বছরেরও বেশি পরে হিটলার যে আজকের ভারতে তেমন একটা নিন্দিত নন – ছড়িয়ে আছে তার অজস্র প্রমাণ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।