কবির চৌধুরী তন্ময়

মুখোশধারি শহিদুল আলম!

আমাদের সমাজ-রাষ্ট্রে এমন কিছু মানুষ আছে, যাদের একটি জেনারেশন আলোর বর্তিকা মনে করেন। কিন্তু যখন আলোর নীচের অন্ধকার ফুটে ওঠে তখন অনেকে প্রচণ্ড দুঃখ পায়, কষ্ট অনুভব করে। হতাশায় নিজেকে নিরব-নিথর করে রাখে। আবার অনেকে যা জানে তা নিয়েই তর্ক করে। নিজের চোখে সবকিছু দেখার পরেও তারা তাদের জানা কথাগুলোর মাঝে থাকতে চায়।

শেখ হাসিনাকে ঘিরে ষড়যন্ত্রর দ্বিতীয় ভার্সন ছিল কোটা সংস্কার আন্দোলন। এটি যে নামে কোটা সংস্কার আন্দোলন ছিল-এটি অনেকে জানার পরেও সমর্থন করেছে। তার কারণও আছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের পর-পরই দেশটা তার মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর খুব কাছাকাছি সময় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার, আলবদর, আলসামস ও রাজাকার বাহিনী লুটপাট করে মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছিল। সাথে দেশটাকেও কেড়ে নিতে চেয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধা ও তার পরিবার স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে রীতিমতো পথে বসেছিল। অর্থ-সম্পদ লুটপাট হয়ে পড়ায় এক পর্যায়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছিল। বঙ্গবন্ধু হাজার বছরের চিন্তা শক্তি দিয়েই ১৯৭২ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের উপহারস্বরূপ মুক্তিযোদ্ধা কোটা পদ্ধতি চালু করেন। দুঃখজনক হলেও সত্য- ১৫ আগস্ট জাতির কলঙ্কময় ইতিহাস রচনা করার মাধ্যমে নেতার নেতৃত্ব ও অকার্যকর বাংলাদেশ গড়ে তোলার চেষ্টায় সর্বপ্রথম টার্গেট করা হলো এই মুক্তিযোদ্ধা কোটাকে। কোটার জায়গায় কোটা থাকলেও মুক্তিযোদ্ধা কোটায় কাউকে চাকরি দেওয়া হয়নি। দীর্ঘ একুশ বছর পর বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা প্রথমবারের মত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে সেই মুক্তিযোদ্ধা কোটার সাথে যুক্ত করেন মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের।

তখনই মাঠে নামে স্বাধীনতাবিরোধী জামাত-শিবির। কোটা পদ্ধতি থেকে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের অন্তর্ভুক্তির প্রতিবাদে জামাত-শিবির মাঠে-ময়দানে স্লোগান তুলে। সেই স্লোগান আজও অব্যাহত রয়েছে…! কিন্তু কেন তারা মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে? এটি একেবারেই স্পষ্ট যে, সমাজ-রাষ্ট্রে যাদের আলোর বতির্কা মনে করা হয় তারাই পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। অনেক বুদ্ধিজীবী বিবৃতি প্রদান করে কোটা সংস্কারের মোড়কে ঢাকা শিবিরের আন্দোলনের পক্ষ নিয়েছে। অনেকে আবার কলাম লিখেও তাদের সমর্থন দিয়ে বিভ্রান্ত যুবসমাজকে উস্কে দিয়েছে। এখানে না জেনে, না বুঝে ব্যবহার হয়েছে এদেশের কতিপয় শিক্ষার্থী। কারণ, তাদের কাছে ভুল বার্তা পাঠানো হয়েছে। বলা হয়েছে, কোটা পদ্ধতির কারণে মেধাবীরা বঞ্চিত হচ্ছে আর মেধাহীনরা এগিয়ে যাচ্ছে।

এমনি করে সড়ক নিরাপদ আন্দোলনকে রীতিমত ব্ল্যাকমেইল করেছে বিএনপি-জামাত। আর তাদের সমর্থন দিয়েছে এ দেশের তথাকথিত সেইসব বুদ্ধিজীবী ও পাবলিক সেলিব্রেটিরা। পরিকল্পিতভাবে এখানেও তারা ব্যবহার করেছে স্যোশাল মিডিয়াকে। মনে হচ্ছে এইমাত্র জীবন বাঁচানোর জন্য দৌঁড়ে লাইভে এসেছে! অভিনয় করে এমন এমন ভিডিও ভাইরাল করেছে যা দেখে সাধারণ অ্যাক্টিভিষ্ট বিভ্রান্ত হয়েছে খুব সহজে। সেই সাথে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা তো আরও আগে। চোখ তুলে ফেলা হয়েছে, চারজন হত্যা করেছে, দুইজন মেয়ে শিক্ষার্থীকে তুলে নিয়ে শেখ হাসিনার দলীয় কার্যালয়ে ধর্ষণ করেছে নিজের চোখে দেখা-এই ধরনের মিথ্যাচার-গুজব ছড়িয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মাঝে সেন্টিমেন্ট তৈরি করেছে তথাকথিত সেলিব্রেটি ও বুদ্ধিজীবীরা।

এটি যে বাচ্চাদের সড়ক নিরাপদ আন্দোলনকে ব্ল্যাকমেইল করা বিএনপি-জামাতের নতুন ষড়যন্ত্র তা কিন্তু নয়। তারা কোটা সংস্কার আন্দোলনেও করেছে। ঢাকা বিশ্ববিধ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবি সিদ্দিকীকে পুলিশ বাহিনী গুলি করে নিমর্মভাবে হত্যা করেছে, ছাত্রলীগের নেত্রী আরেক ছাত্রীর পায়ের রগ কেটে দিয়েছে-এই ধরনের গুজব ছড়িয়ে স্বাধীনতাবিরোধীরা প্রথমে চারুকলায় পয়লা বৈশাখের সকল আয়োজন ধ্বংস করে, অগ্নিসংযোগ করে এবং দ্বিতীয়ত উপাচার্যের বাসভবনকে ঘিরে ধ্বংসলীলায় মেতে উঠে।

কোটা সংস্কার আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সাহস ও সুযোগ পেয়েছিল এদেশের কিছু বুদ্ধিজীবীদের বিভ্রান্তিকর তথ্য ও সমর্থনের কারণে।আর এই ঔদ্ধত্য দেখানোর সুযোগ পেয়েছে সরকারের অদক্ষতার কারণে। কোটা সংস্কার তথা মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল ও সরকার পতনের নীল নকশার আন্দোলনে যারা গুজব ছড়িয়েছিল, যারা পুলিশ বাহিনীর উপর কলঙ্ক লেপন করার ষড়যন্ত্র করেছিল, যারা পরিকল্পিতভাবে যুব সমাজকে বিপদের দিকে ঠেলে দিয়েছিল; সরকার তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে বলেই বাচ্চাদের যৌক্তিক ও সুন্দর একটি আন্দোলনকে ব্ল্যাকমেইল করে ধ্বংসলিলায় মেতে উঠেছিল স্বাধীনতাবিরোধী জামাত-শিবির ও তাদের দোসর বিএনপি।

আর সেইসব গুজব বা মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর অন্যতম আলোকচিত্রী শহিদুল আলম। তিনি পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়ানোর মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে তার ভেরিফাইড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট। কারণ, তার এই ফেসবুকের সাথে যুক্ত আছে দেশি-বিদেশি মিডিয়ার ব্যক্তি ও মানবাধিকারকর্মী। বাংলাদেশে গণতন্ত্র নাই! মানবাধিকার নাই। মানুষের বাক স্বাধীনতা নাই ইত্যাদি বুঝানোর জন্যই শহীদুল আলম এই সোশ্যাল মিডিয়ার প্লাটফর্ম ব্যবহার করেছে।

সড়ক নিরাপদ আন্দোলনে ‘ভীতি ও সন্ত্রাস’ ছড়াতে ইন্টারনেটে ‘কল্পনাপ্রসূত উসকানিমূলক মিথ্যা’ তথ্য প্রচারের অভিযোগ এনে রমনা থানায় তথ্য-প্রযুক্তি আইনের মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে দৃক গ্যালারির প্রতিষ্ঠাতা শহিদুল আলমকে। আর এই গ্রেপ্তারকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের মাঝে আলোচনার পাশাপাশি সমালোচনাও দেখা যাচ্ছে।

দুঃখজনক হলো, দেশের সিনিয়র বুদ্ধিজীবী এই আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের ব্যাপারে ভালো তথ্য রাখলেও তারা নীরবতা পালন করে এক প্রকার তার প্রতিই যেন সমর্থন করছে। আর এতে বিভ্রান্ত হচ্ছে দেশের কোটি কোটি যুব সমাজ।

ফটোগ্রাফার শহিদুল আলম দেশি-বিদেশি খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেক সফলতার পুরস্কারও তিনি পেয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য তিনি কী করেছেন? স্বাধীন সার্বভৌমত্বের নতুন প্রজন্মের প্রতি শহিদুল আলমের ভুমিকা কী?

শহিদুল আলম ১৯৮৪ সালে লন্ডন থেকে দেশে ফিরে আলোকচিত্রী হিসাবে কাজ শুরু করেন এবং ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন দৃক। আর এটি আলোকচিত্র গ্রন্থাগার হিসেবে শুরু করলেও পরে দৃকের সঙ্গে যুক্ত হয় দৃক গ্যালারি, পাঠশালা, দৃক আইসিটি।

সরকারি কোনো সংস্থার অনুমোদন ছাড়াই দেড় যুগ ধরে তার গড়া প্রতিষ্ঠানের চলচ্চিত্র ও ফটোগ্রাফির সার্টিফিকেট কোর্স চালিয়ে এসেছে আলোকচিত্রী, দৃকের প্রতিষ্ঠাতা শহিদুল আলম। সে তার নিজস্ব বিবেচনায় স্নাতক, ডিপ্লোমা, শর্ট কোর্স, লং কোর্সসহ বিভিন্ন নামে সনদ দেওয়া দিয়েছে তার প্রতিষ্ঠিত পাঠশালা সাউথ এশিয়ান মিডিয়া ইনস্টিটিউট থেকে।

শহিদুল আলম তার পাঠশালায় নিজের একক আধিপত্য বিস্তার করতেই সরকারি অনুমোদন নিয়ে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি সব সময় এড়িয়ে গেছে দীর্ঘদিন ধরে। একটা সময় তার প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের তীব্র প্রতিবাদ আর অভিযোগের মুখে বাধ্য হয়েই গত বছর সরকারি সংস্থার অনুমোদন নিয়েছেন।

অন্যদিকে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সাথে ব্যক্তিগত মধুর সম্পর্ক বজায় রেখে তার পরিচালিত ১৯৮৯ সালের অনুমোদনহীন ফটোগ্রাফিক কোর্স ২০১৮ সালে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করেন। শহীদুল তার প্রতিষ্ঠানকে অলাভজনক বললেও এক বছর মেয়াদী কোর্সের জন্য পাঠশালায় আদায় করা হয় ৮০ হাজার টাকা। অন্যান্য কোর্সের জন্য রয়েছে পৃথক ফি!

বিদেশে লবিং করে নিয়ে আনা কোটি কোটি টাকার অনুদানের টাকা স্থানান্তর করছেন নিজের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে। এ জন্য তাকে কোথাও জবাবদিহি করতে হয়নি কখনো। কারণ, তার একক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয় শিক্ষার্থীসহ ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের উপর। যখন ইচ্ছে কাউকে চাকরি দিতে আবার বরখাস্ত করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

২০১৬ সালের এপ্রিলের ঘটনা। পাঠশালার সিনেমা বিভাগের প্রধান চলচ্চিত্র নির্মাতা ইশতিয়াক জিকোসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করেন শহিদুল আলম। তখন শিক্ষকদের ওইভাবে ছাঁটাইয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন সিনেমা বিভাগের এক বছর মেয়াদী কোর্সের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকদের না ফেরালে প্রতিষ্ঠান ছাড়ার হুমকিও দেন তারা।

জিকোসহ চাকরিচ্যুত শিক্ষকরা সে সময় আর ফিরতে পারেননি। কারণ, ততদিনে ৮০ হাজার টাকা কোর্স ফির অর্ধেক তারা পরিশোধ করে ফেলেছেন। নিজেদের দাবিতে দৃঢ় শিক্ষার্থীরা শেষ পর্যন্ত পাঠশালা ছেড়েছিলেন।

আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের বাবা অধ্যাপক ডাঃ কাজী আবুল মনসুর ছিলেন একজন প্রখ্যাত চিকিৎসক ও অনুজীব বিজ্ঞানী। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে অধ্যাপনা করেন দীর্ঘদিন। এছাড়া তিনি ১৯৬১ সাল থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত ইন্সটিটিউট অব পাবলিক হেলথের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তিনি আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ছিলেন।

চিকিৎসা ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদানের জন্য ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের ‘সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার’ হিসাবে পরিচিত ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ প্রদান করা হয় তাকে। কিন্তু শহিদুল আলম এটিকে রীতিমত অস্বীকার করে তার মার নামেই চালিয়ে দিতে তার ফটোগ্রাফিং কারিশমা করেছিল। সোশ্যাল মিডিয়াতে সেই ছবিও ঘুরে বেড়াচ্ছে।

১৯৯৬ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়া তালিকায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অধ্যাপক এ, এম, জহুরুল হক, চিকিত্সা বিজ্ঞানে মরহুম ডা. কাজী আবুল মনসুর (মরণোত্তর), সাহিত্যে মরহুম মৌলভী আবুল হাশিম (মরণোত্তর), চারুশিল্পে সফিউদ্দীন আহমেদ, সঙ্গীতে মোহাম্মদ আবদুল জব্বার, সঙ্গীতে সাবিনা ইয়াসমীন, ক্রীড়া ও খেলাধুলায় কাজী মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন এবং জনসেবায় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম নাম দেখা গেলেও শহীদুল আলমের মার নাম ড. কাজি আনোয়ারা মনসুরের নাম ওই তালিকায় দেখা যায়নি।

আরেকটি কথা, ১৯৯৬ সালের জুন মাসে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে। আর স্বাধীনতা পদকটি দেওয়া হয় মার্চ মাসে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে-জুনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসে কীভাবে মার্চে স্বাধীনতার পদক তুলে দেওয়া হয়েছিল? নাকি তিনি স্বামীর পক্ষ থেকে পদক গ্রহণ করেছে যেটি পরে তার ছেলে আলোকচিত্রী শহিদুল আলম ফটোগ্রাফির কারসাজি করেছিল? আর করে থাকলে, কেন করেছিল?

আমি এই শহিদুল আলমকে চিনি সেই গণজারগরণের আন্দোলন থেকে। তিনি একদিকে নিজের শরীরে ব্লগার লেখা টি-শাট পড়ে নিজেকে ব্লগার দাবি করতো আর অন্যদিকে মৌলবাদীদের উস্কে দিত। কারণ, তিনি ব্লগে লেখেন- মানুষের অধিকার নিয়ে, ইসলাম প্রচার করতে এবং সর্বোপরি ইসলামী শাসন কায়েম করতে! অন্য ব্লগার নাস্তিক, মুরতাদ, কাফের! কারণ, তারা ইসলামের বিরুদ্ধে লিখে। ইসলামকে কটুক্তি করে এবং নবীজীকে খাটো করার উদ্দেশ্যে লেখে।

আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের মুল উদ্দেশ্য বেড়িয়ে আসে ৫ মে তথাকথিত হেফাজতি আন্দোলনের মাধ্যমে। তিনি মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর দেওয়া তথ্যের সাথে তিনিও একমত পোষণ করে বিভ্রান্ত সৃষ্টি করেন। শহিদুল আলম যে জানেন না, তা কিন্তু নয়। তিনি জেনে-শুনে এবং বুঝেই পরিকল্পিতভাবে মিথ্যাচার করেছিল; কারণ তারা একটা এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার মিশনে নেমেছিল। সেই এজেন্ডা ডেভিড বার্গম্যানের সাথে এক হয়ে মাঠে নেমেছিল। সাথে ছিল আরেক জামাতী বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহার।

কুখ্যাত রাজাকার, মানবতাবিরোধী অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে আমরা যখন শাহবাগে আন্দোলন করি, তখন এই ফটোগ্রাফার শহিদুল আলম নাস্তিক বলে সমাজ ও রাষ্ট্রের আমাদের জীবনকে নিরাপত্তাহীন করে তোলে এবং সে সাথে ডেভিড বার্গম্যান আর এই শহীদুল আলম মিলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করতে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে মিথ্যাচার করে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার চক্রান্ত করে।

অন্যদিকে এই শহিদুল আলম একজন ফিল্ম মেকার হিসেবে তার তার দক্ষতার মাধ্যমে মেজর জিয়াউর রহমানের দুটো ভুয়া কণ্ঠস্বর যুক্ত করে বঙ্গবন্ধুর বদলে জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে দেশ ও জাতির সামনে উপস্থাপন করতে এমন কোনো চেষ্টা নেই যে সে করেনি। এখন আপনিও প্রশ্ন করতে পারেন, কেন যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে?

আমি ব্যক্তিগতভাবে পিতার দায় পুত্রের ঘাড়ে দিতে চাই না। কিন্তু পিতার কর্মকাণ্ড পুত্র বহন করে বেড়ালে সেটা অটো চলে আসে। আপনিও সকল রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী, মানবতাবিরোধী অপরাধীর সন্তানদের দিকে তাকালে স্পষ্ট দেখতে পাবেন, তারা তাদের পিতা-মাতার অপকর্মের কর্মী। একাত্তরের তাদের পূর্বপুরুষের দ্বারায় সংঘঠিত সকল অপরাধের ব্যাপারে তাদের ভিতর অনুসূচনা বা অনুতপ্তবোধ কাজ করে না।

যেমন ফেসবুকে গুজব ও মিথ্যাচার ছড়ানো মডেল ও নায়িকা কাজী নওশাবা আহমেদের কথা। সে কিন্তু ভুল করে কিংবা আবেগ তাড়িত হয়ে ফেসবুকে মিথ্যাচার-গুজব ছড়াননি। সে পরিকল্পিতভাবেই ছড়িয়েছে। কারণ, তিনিও একই আদর্শের অনুসারী। এই নওশাবার চাচাতো বোন কর্নেল শফির মেয়ে সাবা যুদ্ধাপরাধী-রাজাকার সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীর ছোট ভাই জামালউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পুত্রবধু। সাকা চৌধুরী ছিল তাদের উভয় পরিবারের অভিভাবক বা কর্তা। রাজনৈতিক সেল্টার, অর্থনৈতিক যোগানদাতা এবং মাঝে মাঝে লেজ- নাড়িয়ে কুকুরকে দিয়ে ঘেউ ঘেউ করাতো এই রাজাকার সাকা।

কুখ্যাত রাজাকার সাকা চৌধুরীর মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসি হলে তারা কেউ এটাকে মেনে নিতে পারেননি। আর এটা স্বাভাবিকও বটে। কারণ জন্মগত আদর্শ আর দর্শনগত আদর্শ-উভয় আদর্শের পরিবার এই সাকা চৌধুরী ও জামালউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সদস্যগণ।

এই নওশাবার মতই আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের স্ত্রী রেহনুমা আহমেদকে আজকের প্রজন্ম বেশ ভালো করে জেনেছে জামাত-শিবিরের কোটা সংস্কার আন্দোলনের নামে নতুন ষড়যন্ত্রের পক্ষে জোরালো বক্তব্য দেওয়ায়।

আর এই অধ্যাপিকা রেহনুমা আহমেদ হচ্ছে কুখ্যাত রাজাকার খান এ সবুর সম্পর্কে মামা-ভাগ্নী। ২০১৪ সালে তথাকথিত ব্রিটিশ সাংবাদিক যুদ্ধাপরাধী বিচারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার কাজে নিয়োজিত ডেভিড বার্গম্যান আদালত অবমাননার দায়ে সাজা হলে, তখন যে ৫০ জন জামাতপন্থী বুদ্ধিজীবী তার পক্ষে বিবৃতি দিয়েছিলো, শহিদুল আলমের স্ত্রী এই রেহনুমা আহমেদ তাদের একজন। অনেকে বলে বেড়ান যে শহীদুল আলম যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার পক্ষে কাজ করেন। আর এই কথার রেফারেন্স টানেন তার নিউইয়র্ক টাইমসের লেখা।

আমি যতটুকু জেনেছি, নিউইয়র্ক টাইমসের লেখাতে সে তথাকথিত প্রগতিশীলদের মতো ১৯৭৩ সালের সাধারণ ক্ষমার প্রসঙ্গ এনে রাজাকারদের পক্ষ অবলম্বন করেছে। ঠিক যেমনিভাবে রাজাকারদের প্রতি সহানুভূতিশীল অন্য লেখকরা তাদের অবস্থান নিয়ে থাকেন। শহিদুল আলমের লেখার মূল উদ্দেশ্য মোটেই রাজাকারদের বিচার করার পক্ষে ছিল না, বরং আমি বলব আওয়ামী লীগ বিরোধীতার কয়েকটি ফ্রন্টের একটিকে কার্যকর রাখাই ছিল আসল উদ্দেশ্য। কারণ, আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের শক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল।

একটু লক্ষ্য করলে আপনিও দেখবেন, বিএনপি সব সময় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কয়েকটি ফ্রন্টকে ব্যবহার করে। জামাত-শিবির ও জামাত মনষ্ক বিএনপির কর্মীরা সব সময় আওয়ামী লীগকে ইসলামের শত্রু  হিসেবে চিহ্নিত করতে সদা সক্রিয় থাকে এবং বিপুল সংখ্যক জনগণ এদের বিভ্রান্তির শিকার হয়ে আছে।

অন্যদিকে মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক ও জনগণের একটি অংশের জন্য সরকারের গৃহীত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে, তা যখন ইতিবাচক বলে গণ্য হয়, তখনই আরেকটি ফ্রন্ট সক্রিয় হয়, ট্রল করা হয় মদিনা সনদের নামে, আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রচার হয় আওয়ামী লীগ মৌলবাদীদের প্রতি সহানুভূতিশীল।

আলোক বর্তিকা খ্যাত আলোকচিত্রী এই শহিদুল আলম সাহেব এই দ্বিতীয় ফ্রন্টের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। কারণ, তাকে দেশের মানুষের চেয়ে বিদেশের মানুষ বেশি চেনে ও জানে। নিউইয়র্ক টাইমসে আলোকচিত্রী শহীদুল আলম শঙ্কা প্রকাশ করছেন রাজাকারদের বিচার নিয়ে। তাই হয়তো আপনারা অনেকেই ভেবেছেন, তিনি আপনার চেয়েও বড় প্রতিবাদি, শহীদুল বিচারের পক্ষে কাজ করছেন। ওই লেখায় শহীদুল আলম পরিকল্পিতভাবে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন তথ্য দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন- শেখ হাসিনা দুর্ধর্ষ ২০ খুনিকে মুক্তি দিতে যাচ্ছেন।

অথচ এরাই রাজাকারদের বিচার নিয়ে ভিতরে ভিতরে আঁতাত থিওরি এনেছিল। রীতিমতো বিদেশিদের দিয়ে লবিষ্ট নিয়োগও করেছেন। এখানে রাজাকারদের বিচার হওয়ায় জামাত-শিবির, মাহমুদুর রহমান ও ফরহাদ মজহারদের ব্যবহার করেছে বিএনপি। যদি কোনো কারণে রাজাকারদের বিচার নিয়ে প্রশ্ন উঠে তাহলে এই দ্বিতীয় ফ্রন্ট শহীদুল আলমদের আঁতাতের কথা বলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করার নীল নকশা ছিল।

আর শহীদ জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলো বইতে আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের মা যে পাক আর্মির দোসর ছিলেন সেটিও স্পষ্ট করেন এই বলে- খালেদ মোশাররফের স্ত্রী রুবী মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যে স্বামীর কাছে পালিয়ে আসতে পারেন। কিন্তু দুটি বাচ্চা মেয়েকে ভাইয়ের বন্ধু দীপুর বাসায় লুকিয়ে আসেন রুবী। পাক আর্মি তথ্য পেয়ে দীপুকে গ্রেপ্তার করে। বাচ্চা মেয়ে দুটিকে ধরে নিয়ে রেখে আসে শহীদুল আলমের মায়ের বাসায়। তার মা তখনকার অগ্রণী গার্লস এর হেড মিস্ট্রেস আনোয়ারা মনসুর এর জিম্মায়। পাক আর্মির দোসর এই মহিলা তখন থাকতেন এলিফ্যান্ট রোড এর নাশেমন সরকারি ভবনে।

পরে দুই নম্বর সেক্টর এর গেরিলারা বাচ্চা দুটিকে উদ্ধার করতে বাসাটিকে ঘিরে ফেলে। কিন্তু দুই মহিলা পাকি দোসর শহীদুল এর মা এবং খালা তীব্র বাধা দেয়। নারীর প্রতি সম্মান দেখাতেই সেদিন তরুণ গেরিলারা মেয়ে দুটিকে নিতে অর্ধেক ব্যর্থ হয়। এই ঘটনায় এক গেরিলা যোদ্ধার গুলি শহীদুল আলমের খালার পায়ে লাগে। ততক্ষণে লোক জমে যায় চারপাশে। আর আর্মি চলে আসার ভয়ে শহিদুল এর মায়ের মাথায় স্টেন এর বাট দিয়ে হাল্কা মেরে খালেদ মোশাররফ এর দুই বাচ্চা মেয়ের মধ্যে বড়টিকে নিয়েই দ্রুত পালিয়ে আসতে বাধ্য হয় গেরিলারা।

আমি বরাবরই স্পষ্ট ভাষায় কথা বলতে ও লিখতে পছন্দ করি। আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের পক্ষে সাফাই সুর তোলার পক্ষে কোনো তথ্য-উপাত্ত আমার জানা নেই। কারণ, শহীদুল আলম তার ব্যক্তি পর্যায়ের অপরাধগুলো পরিকল্পিতভাবে যুব সমাজের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছে। সমাজ-রাষ্ট্রের মাঝে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির এজেন্ডা বাস্তবায়নের কাজে নিয়োজিত ছিল। সে যেভাবে জামায়াতের মুখপাত্র হয়ে আল জাজিরায় বক্তব্য দিয়েছে, মিথ্যাকে সত্য বলে জাস্টিফাই করেছে, তা সুস্পষ্টভাবে দেশদ্রোহিতার সামিল।

লেখক:কবির চৌধুরী তন্ময়, সূত্র : চ্যানেল আই অনলাইন।

( বি: দ্র: মতামত কলামের জন্য কতৃপক্ষ দায়ী নয়।)

One thought on “মুখোশধারি শহিদুল আলম!

  • আগস্ট 11, 2018 at 11:59 পূর্বাহ্ন
    Permalink

    Got it many unknown information from News 1971. Many many thanks News 1971.

    Reply

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।