তুহিন ওয়াদুদ

হুমায়ূন বেঁচে থাকবেন পাঠকের হৃদয়ে

হুমায়ূন আহমেদ বাংলা সাহিত্যে জনপ্রিয় লেখক। তাঁর লেখনী শক্তি একই সঙ্গে সব শ্রেণির পাঠককেই আকৃষ্ট করতে সক্ষম। তাঁর লেখার সৌন্দর্য হচ্ছে তাঁর লেখার অন্তর্নিহিত গতি। একজন পাঠক অবসর সময়ে বসেও তাঁর বই একটানা পড়ে শেষ করতে পারে। আবার একজন রোগী হাসপাতালে বসে বসে তাঁর বই পাঠ করতে পারে। ভীষণ ব্যস্ততার মধ্যেও ক্লান্তিবিহীন তাঁর বই পড়ে শেষ করা সম্ভব। তাঁর গদ্যশৈলীই মূলত তাঁকে পাঠকপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে গেছে। বিষয়বৈচিত্র্য তাঁকে ততখানি বিশেষ মর্যাদায় উন্নীত করেনি যতখানি করেছে শিল্পগুণ।

বাংলা সাহিত্যে হাজারো লেখক। তাঁদের মধ্যে কিছু কিছু লেখক আছেন যাঁরা স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে সাহিত্যকর্ম করেন। বর্তমান বাংলা সাহিত্যে লেখার বিষয়ের চেয়ে আঙ্গিক গুরুত্বপূর্ণ। বিষয় নিয়ে বৈচিত্র্যপূর্ণ লেখালেখি হয়েছে যে বিষয়ের নতুনত্ব আর নেই। এখন লেখকরা তাই সচেষ্ট থাকেন ভাষা-বাক্য এবং বিনির্মাণ কৌশলে নতুনত্ব নিয়ে আসার। যাঁরা পারেন তাঁরাই সময়ের স্রোতে বেঁচে থাকেন, জেগে থাকেন। কালোত্তীর্ণ কিংবা দেশোত্তীর্ণ বিশেষণ তাঁদের কপালেই সাফল্যতিলক হিসেবে আসে। বাংলা সাহিত্যে লেখকের তুলনায় এই মর্যাদায় উন্নীত হওয়া লেখকের সংখ্যা খুবই নগণ্য। হুমায়ূন আহমেদ সেই স্বল্পসংখ্যকদেরই একজন।

যেসব লেখক-পাঠক আজ বাংলা সাহিত্যে সিরিয়াস ধারার সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত তাঁদেরও অনেকেই একসময়ে হুমায়ূন পাঠে মগ্ন ছিলেন। সামান্যকে অসামান্য করে তুলতে পারায় হুয়ায়ূন আহমেদের জুড়ি নেই। তাঁর সাহিত্যের অন্যতম চরিত্র হিমু। পাঠক পড়তে পড়তে হিমু চরিত্রের ধরন বুঝে ফেলে। কোন কথায় কোন উত্তর আর কোন ঘটনায় কোন ভূমিকায় হিমু থাকতে পারে, তা হুমায়ূন পাঠকমাত্রই অনুমান করে আগাম বলে দিতে পারে। হিমু চরিত্রটির প্রতি হুমায়ূন আহমেদের একধরনের বিশেষ যত্ন লক্ষণীয়। এই চরিত্রটিকে তিনি অ্যান্টি-লজিক হিসেবে দাঁড় করাতে চেয়েছেন। রূপা চরিত্রটিও কোন বৈশিষ্ট্যে নির্মিত সেই অনুমানও পাঠক করতে পারে। মিসির আলী চরিত্রটি সৃষ্টি করা ছিল হুমায়ূন আহমেদের পক্ষেও কঠিন কাজ। হুমায়ূন আহমেদ সে কথা নিজেই বলেছেন। একজন লেখকের লেখার ধরন অনুমান করার পর সেই লেখকের পাঠকসংখ্যা কমে যাওয়ার কথা ছিল। বাস্তবে তা হয়নি। পাঠকপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেই তাঁর লেখক জীবনের অবসান ঘটেছে।

হুমায়ূন আহমেদ জনপ্রিয়তার কোন পর্যায়ে ছিলেন তা বোঝা গেছে তাঁর অসুস্থতার দিনগুলোতে। সারা দেশের সব হুমায়ূন পাঠক একাগ্রভাবে খোঁজখবর রাখছিল তাঁর অসুস্থতার। অনিঃশেষ মুগ্ধতায় নিবিড় ছিল তাঁর ভক্ত পাঠককুল।

হুয়ামূন আহমেদ যা লিখেছেন তাতেই পাঠকের আগ্রহ ছিল। হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যকে ছাড়িয়ে গেছে তাঁর নাটক-চলচ্চিত্রের দর্শকপ্রিয়তা। নিজের লেখা-নির্দেশনার চলচ্চিত্র সম্পর্কে তিনি বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘আমার নিজের আনন্দের জন্য সিনেমা বানিয়েছি। যদি কারো ভালো লাগে তা আমার জন্য অতিরিক্ত পাওয়া।’ বাংলাদেশে এমন একটি সময় গেছে সারা দেশের মানুষ হুমায়ূন আহমেদের নাটক দেখার জন্য দিন-ঘণ্টা-মিনিট হিসাব করেছে। দেশে যখন বিদ্যুৎ সর্বত্র ছড়িয়ে যায়নি, যখন সবার ঘরে ঘরে টেলিভিশন হয়নি—এমন সময়েও হুমায়ূন আহমেদ নামটি ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয় নাম। একটি গ্রামে হয়তো একটি টেলিভিশন আছে—ব্যাটারিচালিত সেই টেলিভিশনে হুমায়ূন আহমেদের নাটক দেখার জন্য সব গ্রামের মানুষ এসে ওই বাড়িতে ভিড় করত। তারপর সম্পূর্ণ সপ্তাহ ধরে চলত সেই নাটকের আলোচনা। এখনো হুমায়ূন আহমেদের নাটকের সংলাপ-চরিত্র মানুষের মুখে মুখে ফেরে। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘অয়োময়’সহ অনেক নাটক এখনো নাট্যজগতের সেরা নাটকের মর্যাদায় ভূষিত। ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘শ্যামলছায়া’, ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র।

বাংলা সাহিত্যে জনপ্রিয় ধারার প্রধানতম লেখক হচ্ছেন হুমায়ূন আহমেদ। শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে বলা হয়, শরৎ-সাহিত্য বিক্রি হতো অনেক পরিমাণে। তাঁর একেকটি শব্দ কত টাকায় বিক্রি হচ্ছে তা বের করা যেত। অর্থাৎ বিক্রি এত বেশি ছিল যে শব্দ দিয়ে টাকার পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব ছিল। কাজী নজরুল ইসলামেরও জনপ্রিয়তা ছিল। তাঁর লেখা পড়ার জন্য এক শ্রেণির পাঠক অপেক্ষা করে থাকত। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের মতো আর কেউ নন।

আমাদের দেশে শুধু লেখাকেই পেশা হিসেবে নির্বাচন করার মতো অবস্থা আসেনি। সব লেখককেই কোনো কোনো জীবিকার উৎস বজায় রেখেই লিখতে হয়। হুমায়ূন আহমেদ লেখাকেই জীবনের পেশাও বানিয়েছিলেন। তাঁর জীবনের দিকে তাকালেই বোঝা যায়—তিনি সারা জীবনের সবটুকু সময় বিনিয়োগ করেছেন শিল্প-সাহিত্যের জন্য। আমরা বলতে পারি হুমায়ূন আহমেদের ধ্যান, জ্ঞান, সাধনা ছিল শিল্প-সাহিত্য। লেখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনাও ছেড়েছেন। তবে তিনি যে সব কিছু ছেড়ে শিল্প-সাহিত্যেই থেকেছেন তা বৃথা যায়নি।

হুমায়ূন আহমেদ জনপ্রিয় ধারার লেখক বলে যে তিনি সিরিয়াস ধারার কিছুই লেখেননি তা নয়। তাঁর লেখার মধ্যে ইতিহাস-সমাজ সব কিছুই বিধৃত হয়েছে। মধ্যবিত্তের জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে তিনি পৌঁছেছিলেন। তিনি যেন মধ্যবিত্তের সংকট পাঠ করতে পারতেন। ফলে তাঁর লেখায় সেসব উঠে এসেছে অত্যন্ত সাবলীলভাবেই। হুমায়ূন আহমেদের কাছে এক শ্রেণির পাঠকের দাবি ছিল তিনি আরো এমন কিছু লিখুন, যা বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে থাকবে। তিনি হয়তো লিখতে পারতেন যদি তাঁর জীবনাবসান না হতো। এ কথা তো ঠিক হুমায়ূন আহমেদের গদ্য অত্যন্ত সরল এবং ঝরঝরে। সেই ব্যঞ্জনাই পাঠকচিত্ত জয় করেছে। তার কালজয়ী রচনা শঙ্খনীল কারাগার, নন্দিত নরকে।

হুমায়ূন আহেমদ নেই। তাই বলে তাঁর পাঠকপ্রিয়তা কমেনি। তবে বাংলা সাহিত্যে এমন অনেক পাঠক আছে যারা হুমায়ুন আহমেদের সব গ্রন্থই পাঠ করেছে। তাদের জন্য হুমায়ূন আহমেদের অনুপস্থিতি একটি বড় শূন্যতা। এই শূন্যতা থাকলেও সেসব পাঠককে ভাবতে হবে—মানুষ মাটি ও মহাকালের অংশ হবেই। প্রাকৃতিক সেই নিয়মই হুমায়ূন আহমেদকে নিজস্ব নিয়মেই বেঁধেছে।

হুমায়ূন আহমেদের সব লেখাই সমাজের কাছে দায়বদ্ধতা থেকে উঠে এসেছে এমন কথা বলা যাবে না। তবে তাঁর সব লেখাই পাঠকচিত্তে আনন্দধারা বইয়ে দিতে সক্ষম। তাঁর রচনা কখনো সমাজের দায়বদ্ধতা থেকে উৎসারিত, কখনো আনন্দদানই ছিল মুখ্য। হুমায়ূন আহমেদকে জানতে হলে তাঁর আত্মজৈবনিক রচনাগুলো পাঠ করা যেতে পারে। তাঁর ‘আমার ছেলেবেলা’, ‘হোটেল গ্রেভার ইন’, ‘এলেবেলে’, ‘এই আমি’, ‘কিছু শৈশব’, ‘বলপয়েন্ট’, ‘কাঠপেন্সিল’, “নিউ ইয়র্কের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ’, ‘বসন্তবিলাপ’ ইত্যাদি আত্মজৈবনিক রচনা।

তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস—‘দেয়াল’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘মেঘের ওপর বাড়ি’, ‘রূপা’, ‘আনন্দ বেদনার কাব্য’, ‘লিলুয়া বাতাস’, ‘বৃষ্টি বিলাস’, ‘মেঘ বলেছে যাব যাব’, ‘আমার আছে জল’, “হিমু সমগ্র” ইত্যাদি।

বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কারে তিনি ভূষিত হন।

২০১২ সালের ১৯ জুলাই হুমায়ূন আহমেদ দেহান্তরিত হন। গাজীপুরের নুহাশপল্লীতে তিনি সমাধিস্থ হন। হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে বিনম্র প্রণতি। তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর শিল্পকর্মে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।। সূত্র: কালের কন্ঠ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।