ইকরামউজ্জমান

ফুটবলের জয় হোক

অনেক রঙে রাঙানো বিশ্বকাপ ফুটবল উৎসব আজ শেষ হবে রাশিয়ার মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়ার মধ্যে অনুষ্ঠিত ফাইনাল ম্যাচের মাধ্যমে। চার বছরের জন্য আনন্দ-বেদনার ফুটবলময় দিনগুলো বিদায় নেবে। দেশে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে ফুটবল হয়ে পড়েছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ ও অপ্রতিরোধ্য বিষয়। আমরা ভেসেছি আবেগে। অথচ হাজার হাজার মাইল দূরের রোমাঞ্চকর ফুটবল নাটকে আমাদের ভূমিকা তো স্রেফ পার্শ্বচরিত্রের। রাশিয়ার মাটিতে ৩২ দলের মধ্যে মঞ্চস্থ নাটকের অভিনেতাদের জন্য আমাদের ভালোবাসা, উচ্ছ্বাস, বেদনা, আনন্দ ও অস্বস্তি কি তাঁরা জানেন বা জানতে পেরেছেন। তাঁরা কি জানেন ফুটবল উপভোগকে আঁকড়ে ধরে কোনো ধরনের নাড়ি বা আত্মিক সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও তাদের স্বপ্নভঙ্গে আমরা মুষড়ে পড়েছি, ধাক্কা বুকে লেগেছে। আবার কারো কারো উজ্জ্বল সফলতা ও বড় স্বপ্নপূরণে আনন্দিত ও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছি। ফুটবলের অগ্রযাত্রাকে স্বাগত জানিয়েছি। এ ধরনের প্রবণতা ও মানসিকতার বিশ্লেষণ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে হতেই পারে।

তবে সব কিছুর ওপরে হলো ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা। ফুটবলপ্রেমীরা বলছেন, তাঁদের ভালোবাসার খেলা জিতেই চলেছে, আবেদন, আকর্ষণ ও মায়ার টানে। ফুটবল মানুষের সঙ্গে মানুষকে মিলায়। ঐক্যবদ্ধ করে। সমঝোতা, বোঝাপড়া সৃষ্টির মাধ্যমে আপন করে। বাতাসভর্তি গোলকপিণ্ডটির মানবিক আবেদন যেকোনো খেলাকে ছাড়িয়ে যেতে পেরেছে বলেই খেলার জগতে সবচেয়ে সুন্দর খেলা হতে পেরেছে। হয়েছে বিশ্বের সেরা খেলা। এই খেলা দেশে দেশে গণ্ডির দেয়াল ভেঙে ফেলেছে। ভেঙে ফেলেছে মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব। পারছে বিশ্বকে এক করতে একই লক্ষ্যে। এখানে আন্তর্জাতিক রাজনীতি আর কূটনীতি পেছনে পড়ে গেছে। যে খেলা কোটি কোটি মানুষের বিষয়, তা মোটেই শুধু একটা খেলা নয়! এখানে তো ভালোবাসা, উচ্ছ্বাস ও উন্মাদনা থাকবেই।

রাশিয়ার প্রাণবন্ত আকর্ষণীয়  ফুটবল চত্বর নতুন দেশকে শিরোপা বিজয়ী  হিসেবে চিহ্নিত করে নতুন ইতিহাসের জন্ম দেবে, না পুরনো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি আবার ঘটবে—এই প্রশ্নের জবাব দেওয়া মুশকিল। পরিচিত ফুটবলকে তো এবার চেনা যায়নি।

ফুটবল পণ্ডিতদের ধারণা তো এবার মাঠে অন্তঃসারশূন্য প্রমাণিত হয়েছে। আর তা-ই হয়তো ফাইনালের আগে সরাসরি অনুমানে সবাই গররাজি। শুরুর আগে যা ভাবা হয়নি, বাস্তবতায় সেটাই দেখা গেছে। ফুটবলে ধারণার হিসাব পুরোপুরি বদলে গেছে। যাদের হিসাবের খাতায় রাখা হয়েছিল, তারা অনেক আগেই মাঠ থেকে বিদায় নিয়েছে। হিসাবের খাতায় নাম উঠিয়েছে এমনরা, যাদের নিয়ে ভাবা হয়নি। তাহলে কি ফুটবলে অনেক কিছু অজানা থাকে। সবচেয়ে বড় ফুটবল চত্বরে এই যে ‘সাইক্লোনের’ তীব্রতায় সব কিছু লণ্ডভণ্ড—এটাকে কিন্তু স্বাগত জানানো হচ্ছে। এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের মাঠের ফুটবলের পার্থক্য  ভীষণভাবে কমে গেছে। বেড়েছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ক্লাব ফুটবলের প্রভাব এখন দেশে দেশে জাতীয় দলে। কোনো দেশের মাঠে নামার আগে বলার  শক্তি নেই। লক্ষ্যের পথ ধরে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমরা স্বাচ্ছন্দ্য। এখানেই সার্বিক ফুটবলের অগ্রগতি। যারা অতীতে চ্যাম্পিয়ন, যাদের ফুটবল ইতিহাস ও ঐতিহ্য আছে, যাদের বলা হয় ‘ফেভারিট’—তারা এবার মাঠে নেমে টের পেয়েছে মাঠের ফুটবল কত শক্ত হয়ে গেছে। কেউ বলতে পারেনি আমাকে ঠেকিয়ে রাখবে কে?

সেমিফাইনালে এমন চারটি দেশ—এর মধ্যে ফ্রান্স ছাড়া এবার নিয়ে গত পাঁচটি বিশ্বকাপে কোনো দেশ তো সেমিফাইনাল কখনো খেলেনি।  সেমিফাইনাল টপকে উঠে এসেছে ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়া—এই দুটি দেশ তো চার বছর আগে (২০১৪) বিশ্বকাপে প্রথম রাউন্ডেই বাড়ি ফিরে গিয়েছিল। এখন তারাই ফুটবল মাঠের হিরো।

ছোট দেশ  ক্রোয়েশিয়া। জনসংখ্যা আমাদের ঢাকা নগরীর চেয়েও অনেক কম। মাত্র ৪১ লাখ ৫০ হাজারের কিছু বেশি। ক্রোয়েশিয়া এবার ফাইনালে উঠেছে। ছোট দেশ এখন বড় স্বপ্ন দেখছে। বড় স্বপ্ন দেখছে এর জন্য যে তারা সাহস, আত্মবিশ্বাস ও সামর্থ্যের সব কিছু উজাড় করে দিয়ে বিশ্বকাপ ছোঁয়ার একেবারে কাছে যে চলে এসেছে। ১৯৯৮ সালে অংশ নিয়ে তৃতীয়  হয়েছিল। সেবার সেমিফাইনালে হেরেছে এবারের ফাইনালে প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্রান্সের কাছে। এবার লুকা মডরিচ, ইভান রাফিটিচ, কালিনিচ, পেরিশিচরা কি পারবেন বিশ্বকাপে নতুন ইতিহাসের জন্ম দিতে? ১৯৯২ সালে ফিফা র্যাংকিং চালু হওয়ার পর সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দল হিসেবে ফাইনালে উঠেছে (২০তম) ক্রোয়েশিয়া। ফিফা র্যাংকিং যে সব কিছু নয়, মাঠের লড়াইটাই আসল—এটা প্রমাণের সুযোগ এখন ক্রোয়েশিয়ার।

ফ্রান্স ১৯৯৮ সালে চ্যাম্পিয়ন। ২০০৬ সালে রানার্স-আপ। বিশ্বকাপের ইতিহাসে তৃতীয়বারের মতো ফাইনালে পৌঁছেছে। পণ্ডিতরা ফেভারিটের তালিকায় ফ্রান্সকে রেখেছিলেন, তবে চারটি দেশের পর। পল পগবা, কিলিয়ান এমবাপ্পে, গ্রিয়েজমান, বেঞ্জামিন অলিভিয়েরা কি পারবেন ফ্রান্সকে দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা উপহার দিতে। এক ঝাঁক প্রতিভাবান খেলোয়াড় নিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন কোচ দিদিয়ের দেশম। নিজে ছিলেন ১৯৯৮ বিশ্বকাপ জয়ী দলের অধিনায়ক। এরই মধ্যে কোচ হিসেবে দেশকে ফাইনালে নিয়ে এসেছেন।

রাশিয়া বিশ্বকাপ নিয়ে কত কথা, কত আলোচনা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত  রাশিয়া দেখিয়ে দিয়েছে সবচেয়ে গোছানো ও আন্তরিকতায় ভরপুর একটি বিশ্বকাপ আয়োজন উপহার দিয়ে। মাঠেও স্বাগতিক দেশ সব ধরনের  ধারণাকে অমূলক করে খেলেছে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত। ফুটবলে ভাগ্য লাগে, ভাগ্যের সাহায্য ছাড়া একটা সময় অসহায় হয়ে পড়া ছাড়া উপায় থাকে না। রাশিয়ার ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম হয়নি।

বিশ্বকাপের আলোচনায় এবার একটি বিষয় সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে মাঠে ‘ডিফেন্ডিং’। গোল করতে দেব না। গোল খাব না। সুযোগ পেলে গোল করব। একসময়কার সেরা স্ট্রাইকার মার্কো ফন বাস্তেন বলেছেন, ‘চলতি বিশ্বকাপে ডিফেন্স করা হয়েছে সব জায়গায়। রক্ষণ, মাঝমাঠ বা আক্রমণ ভাগ। ফাইনাল থার্ড  নকে থেকেই পাল্টা আক্রমণ নষ্ট করে দিয়েছে স্ট্রাইকাররা। মিড ফিল্ডাররা তো একধারে ডিফেন্ডারও। এতে গোল করার সুযোগ কম মিলেছে।’

সেমিফাইনালের আগ পর্যন্ত গোল হয়েছে (কর্নার ফ্রি কিক ও পেনাল্টি) ৭০টি। ৬২ ম্যাচে ১৬১টি গোলের মধ্যে সেট পিচে গোল ৭০টি। গত বিশ্বকাপে (২০১৪) মোট গোল হয়েছিল ১৭১টি। ফুটবল গোলের খেলা। খেলায় জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় গোলের মাধ্যমে। মাঠে দর্শকরা চান গোল দেখতে। ফিফা গোল নিয়ে চিন্তিত। আর বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগও নিয়েছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে কৌশলের খেলা মাঠে অন্যদিকে হাঁটছে।

ফুটবলে ইউরোপিয়ান দেশগুলোর প্রাধান্য যত সময় গড়াচ্ছে বেড়েই চলেছে। এরাই বিশ্ব ফুটবলকে ডমিনেট করছে। লাতিন দেশগুলো পেরে উঠতে পারছে না ইউরোপিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে। বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই তো আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল বিদায় নিয়েছে। ইউরোপিয়ান দলগুলো কি ক্লাব ফুটবলের বদৌলতে লাতিনদের দুর্বলতাগুলো ধরে ফেলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে চ্যালেঞ্জ করছে। ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের শক্ত মানসিকতা, টেকনিং, স্টেমিনা আর গতিটা বিশ্ব ফুটবলে প্রভাব ফেলেছে। তবে বিশ্ব ফুটবল মঞ্চ ক্লাব ফুটবল থেকে পুরোপুরি ভিন্নধর্মী। ক্লাবের রাজা আর ফুটবলের রাজার মধ্যে পার্থক্য আছে। পেলে ম্যারাডোনা ফুটবলের রাজা হতে পেরেছেন। অন্যরা পারলেন না। ফুটবলে এখন সৌন্দর্য বড় কথা নয়, জেতাটাই আসল। ফুটবল বদলে গেছে, আরো বদলে যাবে মাথা খাটানোর মাধ্যমে। চিন্তার বিষয় হলো, লাতিন দেশগুলো কিভাবে ফুটবলের সময়ের সঙ্গে তাল মেলাবে।

১৯৯০-এর বিশ্বকাপের শুরুতেই ক্যামেরুন ফেভারিট আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে চমক সৃষ্টি করেছিল। সেবারই প্রথম কোনো আফ্রিকান দেশ হিসেবে নক আউটেও গিয়েছিল। রজার মিলার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, আফ্রিকার এই জয়কে তিনি কিভাবে দেখছেন? জবাবে বলেছিলেন, ‘কিসের আফ্রিকার জয়’—এই জয় তো তৃতীয় বিশ্বের সব দেশের। চলতি বিশ্বকাপে আফ্রিকার কোনো প্রতিনিধি দ্বিতীয় রাউন্ডের বেড়া অতিক্রম করতে পারেনি। এটা মেনে নিতে কষ্ট হয়।

রাশিয়া বিশ্বকাপে এশিয়ান দেশগুলো ভালো খেলেছে। জার্মানির বিপক্ষে দক্ষিণ কোরিয়ার জয়, কলম্বিয়ার বিপক্ষে জাপানের জয়। মরক্কোর বিপক্ষে সৌদি আরবের জয়। ইরানের সাহসিক লড়াই স্পেনের বিপক্ষে এশিয়াবাসীকে আশাবাদী করতেই পারে। তবে ধাপে ধাপে এগিয়ে যেতে হলে এশিয়ার দেশগুলোর ফুটবল কাঠামোতে অনেক বেশি কাজ করা ছাড়া উপায় নেই। এশিয়ার বড় সমস্যা হলো, ব্যাপকভাবে প্রতিভাবান ভালো খেলোয়াড় উঠে আসছে না। খেলোয়াড় সৃষ্টির ক্ষেত্রগুলো এখনো দুর্বল। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ এশিয়ার কাতারে। নিজেদের মাঠে তো এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ নিতে হবে। ২০০২ সালে তো দক্ষিণ কোরিয়া সেমিফাইনালে খেলেছে।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সূত্র: কালের কন্ঠ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।