ইকরামউজ্জমান

ফুটবল জীবনেরই গল্প

জীবনের গল্পের সঙ্গে ফুটবলের গল্পের মিলকে কি অস্বীকার করার উপায় আছে! জীবন তো আর সহজ-সরলভাবে চলে না। চলতে চলতে মোড় নেয়! দেখতে হয় আরেক রঙ্গ, আর এই রঙ্গর মধ্যেই অন্য এক ধরনের অভিজ্ঞতার স্বাদ। এই অভিজ্ঞতা নিষ্ঠুর আর করুণ হওয়া সত্ত্বেও মেনে নিতে হচ্ছে, আমরা মেনে নিচ্ছি! এটাই জীবনের শেষ কথা।

জীবন তো সেই নিয়মে চলে না, চলে না প্রত্যাশা, আকাঙ্ক্ষা ও স্বপ্ন অনুযায়ী। চড়াই-উতরাই, সাফল্য-ব্যর্থতার মধ্য দিয়েই চলে। একেক সময় একেক ধরনের স্বাদ আর অভিজ্ঞতা। এখানে হিসাবটা অন্য রকম। চিন্তা, ধারণা আর প্রত্যাশার বাইরে তাই অনেক কিছুই ঘটে। একদিকে কারো প্রত্যাশা ও স্বপ্নের মৃত্যু, অন্যদিকে তো আরেক জীবনে স্বপ্নের স্বাদ পূরণের উজ্জ্বল ছবি। হাহাকারের মধ্যেও তো আনন্দ, উচ্ছ্বাসের সুর ঝরে। বিষয়টি জটিল; কিন্তু এটাই জীবনের নিষ্ঠুর আর আনন্দের খেলা। রাশিয়া বিশ্বকাপে বিস্ময় নিয়ে আলোচনা, তর্ক, আবেগের ঝড় বইছে। তবে উপসংহারে বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া ছাড়া কি উপায় আছে!

বিশ্বকাপ তো দেখিয়ে দিয়েছে সুন্দর এই খেলায় অনেক কিছুই সম্ভব। বাতাসভর্তি গোলকপিণ্ডটি মাঠে প্রচণ্ড শক্তিধর। তার ক্ষমতা আছে অগণিত মানুষের হৃদয়, আবেগ আর প্রাণের আকুতি নিয়ে খেলার। সে খেলবেই, আর এর জন্যই তার এত আকর্ষণ।

৩২ থেকে ১৬। এরপর আট থেকে চারে এসে গেছে। এবার সেমিফাইনাল। চার দেশের স্বপ্নের বন্দর এখন খুব কাছাকাছি। স্বপ্নের বন্দরে নোঙর করার জন্য চারটি দেশ এখন উদ্গ্রীব। এর মধ্যে ফুটবলের সবচেয়ে বড় বন্দরে জাহাজ ভেড়ানোর অভিজ্ঞতা আছে শুধু দুটি দেশের—ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের। এরা যথাক্রমে ৫২ এবং ২০ বছর আগে একবার করে ফুটবল জাহাজ নোঙর করতে পেরেছে সফলতার সঙ্গে। অন্য দুটি দেশ বেলজিয়াম ও ক্রোয়েশিয়া তো ১৯৮৬ ও ১৯৯৮ সালে চতুর্থ ও তৃতীয় হয়ে নোঙর করেছে। এবার কি এই দুটি দেশ আরো আগে নোঙর করতে পারবে? যত কিছুই বলা হোক না কেন, এই চারটি দেশ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠেছে তাদের শ্রেষ্ঠতর প্রমাণ করেই। মাঠে অঙ্কের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই বর্তমান অবস্থায় স্থান করে নেওয়া। ওরা বুঝতে পেরেছে, ফুটবল মাঠের আসল প্রাণ ভোমরাটা কী?

চোখ ধাঁধানো ফুটবল, গতির সঙ্গে শৈল্পিক ফুটবলের সমন্বয় সব কিছু নয়। সফলতার শেষ কথাই হলো গোল করা। ভালো খেলা অথচ গোল করতে না পারলে তো রূঢ় বাস্তবতায় এই খেলা মূল্যহীন। যতই বলা হোক না কেন, ভাগ্যকে টেনে আনার দরকার নেই। কিন্তু তা তো সম্ভব নয়।

আমি, আপনি সেই প্রথম থেকে যা ভাবতে চাইছি, সেটাই তো দেখতে হয়েছে রাশিয়া ফুটবলে এ পর্যন্ত। ফুটবলের ৩২ দেশের খেলায় তো আসতে পারেনি চারবারের চ্যাম্পিয়ন ও দুইবার রানার্স-আপ গৌরবের অধিকারী ইতালি। ইতালি ছাড়া বিশ্বকাপ ফুটবল ভাবা যায়? রাশিয়ার মাঠে ফুটবল গড়ানোর পর প্রথম রাউন্ডেই বিদায় নিয়েছে জার্মানি। শুধু তো গতবারের চ্যাম্পিয়ন নয়, এ পর্যন্ত চারবার চ্যাম্পিয়ন, চারবার রানার্স-আপ। শুধু তা-ই নয়, সবচেয়ে বেশিবার ফাইনাল খেলেছে। কী অসহায়ভাবে তাদের বিদায়। আর্জেন্টিনা ও স্পেনের বিদায় নক আউট রাউন্ডে। অনেক হিসাব ওলটপালট হয়ে গেছে।

বিদায় হয়েছে রোলানদোর পর্তুগালের। এরপর ব্রাজিল ও উরুগুয়ের বিদায় কোয়ার্টার ফাইনালে। কী ধারণা করা হয়েছিল আর কী হয়েছে। দেশের ফুটবল মনন তো আর্জেন্টিনার মেসি, ব্রাজিলের নেইমার, পর্তুগালের রোলানদোকে ঘিরে। তাঁরা নেই, ভক্ত ও সমর্থকদের বুকে হাহাকার আছে, দুঃখ আছে। তার পরও দেখছি বিশ্বকাপ ঘিরে উচ্ছ্বাস আর আবেগের কমতি নেই। বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই এখনো সবাই ছোট ও বড় স্ক্রিনে খেলা দেখছে রাতের নীরবতা ভেদ করে, উল্লাস ধ্বনি আছে। এখানেই জীবনের সঙ্গে ফুটবলের মিল। জীবন তো থমকে থাকে না। জীবন চলে, চালাতে হয়। দল সমর্থন নিয়ে তো চিন্তাভাবনায় অনেকেরই পরিবর্তন এসেছে। তবে এই দল পরিবর্তনের সঙ্গে কিন্তু রাজনীতির ক্ষেত্রে দল পরিবর্তনের কোনো মিল নেই। এটা নেহাত ফুটবলের আনন্দ উপভোগের জন্য। একটি নির্মম সত্য, ফুটবল জীবনে মানুষ অনুভব করেছে, তা হলো তারকারা দল জেতান না, দল জেতে সবাই মিলে খেলে। বিশ্বকাপের আগে অনেক ধারণা ও চিন্তাভাবনা  থেকে প্রতিফলন বাস্তবতায় মাঠের লড়াইয়ে প্রতিফলিত না হলেও কিন্তু কিছু ধারণার প্রতিফলন লক্ষণীয় হয়েছে। যেমনটি বলা হয়েছিল ইউরোপ থেকে ইউরোপিয়ান দেশ ছাড়া কারো কাপ জেতা সম্ভব নয়। সেটা তো প্রতিফলিত হতে চলেছে। এবার সেমিফাইনালে চারটি দেশই ইউরোপিয়ান। ফুটবলের ইতিহাসে এবার নিয়ে পাঁচবার শুধু ইউরোপিয়ান দেশ সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে বিশ্বকাপের আসরে। লাতিন আমেরিকার দেশগুলো কোয়ার্টার ফাইনালে বিদায় নিয়েছে। ফুটবলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসা সত্ত্বেও লাতিন আমেরিকার কোনো দেশের পক্ষে ইউরোপিয়ানদের সঙ্গে তাদের মাঠে লড়াই করা এখন দুষ্কর। আর এটাই বাস্তবতা। লাতিন আমেরিকার ব্রাজিল ১৯৫৮ সালে ইউরোপ থেকে কাপ জিতেছে প্রথম। জার্মানি লাতিন দেশ ব্রাজিল থেকে কাপ জিতেছে ২০১৪ সালে। ২০০২ সালের পর থেকে বিশ্বকাপ জিততে পারেনি ইউরোপের বাইরের কোনো দেশ। এবার ২০১৮ বিশ্বকাপে এর ব্যতিক্রম হচ্ছে না। বিশ্ব ফুটবলে ইউরোপের দেশগুলো একচেটিয়া শাসন করছে। এটা নিয়ে তর্কবিতর্ক আছে। এর সমাধান কিভাবে সম্ভব? ফিফা এটা নিয়ে কী ভাবছে তা জানা যায়নি। এই যে ২০২৬ সাল থেকে বিশ্বকাপে ৩২টি দেশের পরিবর্তে ৪৮টি দেশ খেলবে। এতে বিশ্বকাপের ভারসাম্যতা ঠিক থাকবে কি না, বলা মুশকিল। কেননা উয়েফা থেকে আরো দল বাড়বে। এ ক্ষেত্রে তো সেখানেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়বে। প্রাথমিক পর্যায়ের খেলায় ইতালি, নেদারল্যান্ডসের মতো দল এবার ৩২ দেশের খেলায় আসতে পারেনি। আগামী দিনে যদি এ ধরনের বড় দল জার্মানি এবং অন্যরাও আসতে না পারে, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু ঘটবে না। কেননা নির্দিষ্ট দেশের মধ্যেই তো থাকতে হবে।

বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইতালি-ব্রাজিল-জার্মানি-আর্জেন্টিনা নেই; যারা ২০টি বিশ্বকাপে ১৫ বারই শিরোপা জিতেছে। শিরোপা বিজয়ের ক্ষেত্রে বিশ্বকাপটি ইতিহাসের পথ ধরেই সাঙ্গ হবে, না এবার নতুন দেশকে বিশ্বকাপ জিততে দেখা যাবে। এদিকে বাণিজ্যিক ব্র্যান্ডের যুদ্ধে কে জিতবে—নাইকি, না অ্যাডিডাস। সেমিফাইনাল তো চার দেশের মধ্যে। ক্রোয়েশিয়া, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড নাইকি। শুধু অ্যাডিডাসের এনডোর্সমেন্টে বেলজিয়াম।

এবারের ফুটবল প্রথম দিকে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে এগিয়ে এসেছে। বড় দলগুলো ভুগছে। কেউ কেউ ধাক্কা খেয়ে বাদ হয়েছে। ছোট দলগুলো আগের তুলনায় ফুটবল নিয়ে অনেক বেশি ভাবছে। এটা মাঠের লড়াইয়ে দেখা গেছে। কিন্তু এটা ঠিক, মাঠে দুটি ইউরোপিয়ান দল যখন একে অপরের বিপক্ষে লড়েছে, সেখানে কিন্তু অন্য স্বাদ মিলেছে। ফুটবলের জনপ্রিয়তা ও সম্ভাবনাকে কিভাবে যে কাজে লাগানো যাবে, এটা নিয়ে এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের বাস্তবধর্মী চিন্তার বাস্তবায়ন এখন জরুরি। রাশিয়া ২০১৮ ফুটবলের ঘণ্টা জানান দিয়েছে, এশিয়া ও আফ্রিকার ফুটবলকে আবেগ আর উচ্ছ্বাস থেকে বেরিয়ে বাস্তবতায় আসার সময় হয়ে গেছে। এশিয়ার উচিত নিজেদের গণ্ডির বাইরের ফুটবলে বেশি উৎসাহ দেখানো।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক । সূত্র: কালের কন্ঠ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।