কোটা সংস্কারের প্রতি সরকারের এতো অনীহা কেনো কিংবা সরকারের লাভটা কোথায়?

সরকারী চাকরীতে বিদ্যমান কোটা সিস্টেম নিয়ে কথা আজকে হচ্ছে না,এই সিস্টেম নিয়ে কথা প্রায় পুরানো।কারণ বাংলাদেশে প্রচলিত কোটা সিস্টেম পুরোটাই অস্বচ্ছ ও দুর্নীতি গ্রস্থ।দিন দিন করে ফুঁসে থাকা ব্যাপারটা এই বছরেই বিস্ফোরণ ঘটেছে।এর আগে যখন এই আন্দোলন হয়েছিলো তখন কিন্তু শিবির কিংবা জামাত এজেন্ডা বাস্তবায়ন বলে ট্যাগ দেয় নাই।এখন দিচ্ছে!আমি কেনো প্রচলিত কোটা সিস্টেমের বিপক্ষে কথা বলছি?সরকারী চাকরীর এই কোটা বাংলাদেশ জন্মলগ্ন থেকে চলে আসছে।এরপর বিভিন্ন সরকার তাদের দলীয়করণ এর প্রয়োজনে এটার % বাড়িয়েছে।প্রচলিত কোটা সিস্টেম পুরোটাই অস্বচ্ছ ও দুর্নীতিগ্রস্থ।কিভাবে সেটা?
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে লজ্জাজনক হচ্ছে,বাংলাদেশে ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা আছে।হাজার হাজার ডকুমেন্টেশন আছে টাকা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা বনে যাওয়ার।এই কাজটা আওয়ামী ও বিএনপি দুই সরকারই করেছে।এখনো মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার আবেদন জমা পড়ে আছে ১০ হাজারের বেশি।মুক্তিযোদ্ধা কোটার কারণে যারা চাকরী পাচ্ছে তারা প্রায় দলীয় করণের চাকরী পায়।যেখানে দলীয়করণে চাকরী হয় সেটা পুরোটাই ইনজাস্টিস এবং প্রশাসনকে একপ্রকার দলীয় করণ করা।আওয়ামী সরকার মুক্তিযোদ্ধা কোটা ১৫% থেকে বাড়িয়ে করল ৩০% এ।এই ক্ষেত্রে দেখা দিলো দেশের চাকরীর মূল ৩০% হচ্ছে দলীয় কেন্দ্রী ও পরিবার কেন্দ্রী।মুক্তিযোদ্ধা সনদ ধারী পরিবারের প্রায় সবার চাকরী হচ্ছে ঐ সনদ দ্বারা।
কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা কোটা দেওয়ার কারণ ছিল,অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাকে স্বাবলম্বী করা।কিন্তু এখানে স্বাবলম্বী করতে গিয়ে দেখা গেলো দেশের চাকরীর ৩০% একই পরিবারের সকল সদস্য দ্বারা।তাহলে দেশের বিশাল একটি অংশ বাদ পড়ে যাচ্ছে।কারণ একটি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারে দশজন থাকলে সেই দশ জনেরই চাকরী হচ্ছে।মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানার্থে যদি সিস্টেমটা এমন হতো,মুক্তিযোদ্ধা পরিরিবার থেকে একজনকেই কোটায় চাকরী দেওয়া হবে।কিন্তু এখন যোগ হলো তৃতীয় প্রজন্ম পর্যন্ত। তৃতীয় প্রজন্ম পর্যন্ত সুবিধা যদি একবার কোটা ব্যবহারের সুযোগ পায় তাহলে সেটা ব্যালেন্সড হবে।আসুন এবার নারীরা কেনো কোটা সিস্টেম এর বিপক্ষে?নারীরা তো ১০% কোটা পাচ্ছে! তারা কেনো মাঠে?শুধু একজন সাধারণ নারী হলেই যে নারী কোটার জন্য সুপারিশ প্রাপ্ত হয় না।
১ম শ্রেণীর চাকরীতে সবচেয়ে দলীয়করণ ও দুর্নীতি হয় নারী ও জেলা কোটায়।এই দুই কোটায় সুপারিশ প্রাপ্ত হতে মন্ত্রী এমপি নেতাদের দোয়া লাগে।এই ক্ষেত্রে দেখা গেলো টাকা পয়সাহীন মফস্বল থেকে উঠে আসা সাধারণ নারী ‘নারী কোটার’ জন্য সুপারিশ প্রাপ্ত হতে হতে অন্য কোনো প্রভাবশালী নারী সুপারিশ প্রাপ্ত হয়ে গেছে।জেলা কোটার ক্ষেত্রেও একই রকম।আমি অনেক ভেবে দেখলাম একমাত্র প্রতিবন্ধী কোটা ছাড়া আর কোনো কোটায় স্বচ্ছতা নাই।সরকারের কেনো অনীহা?কারণ কোটা সিস্টেম দ্বারাই সরকার প্রশাসনকে দলীয় করতে পারছে,একটা পরিবার তান্ত্রিক প্রশাসন তৈরি করতে পারছে।
আপনি দেখুন বাংলাদেশ রেলওয়ে পুরাপুরি একটি পরিবার তান্ত্রিক সিস্টেমে চলে।কারণ সেখানে ৮০% নিয়োগ কোটায় হয়,আর গত বিশ বছরের রেলওয়ে কখনো লাভের মুখ দেখে নাই।প্রচলিত কোটা সিস্টেম একটি ইনজাস্টিস প্রথা।যেখানে স্বচ্ছতা নাই সেখানেই করাপশন বলা হয়।হ্যাঁ,কোটা সিস্টেম চালু হয়েছিলো পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে তুলে আনতে।বাংলাদেশ বদলেছে।এখন সিস্টেমের সংস্কার করা উচিত।সরকারী চাকরীতে কোটার ব্যবহারকে একবার করা হোক।এক পরিবার থেকে একজন ব্যক্তিই যদি কোটা ব্যবহার করতে পারে সেটাই হবে প্রকৃত পিছিয়ে পড়াকে তুলে আনা।এখন যেটা দেখা যাচ্ছে,একই পরিবার থেকে সবাই চাকরী পাচ্ছে।
সেটাকে তুলে আনা বলে না,বলা হয় দলীয়করণ ও পরিবার তান্ত্রিক করা।এই কোটা সিস্টেমের কারণে দেশে আজকে দুইটা পক্ষ বিপক্ষ দাঁড়িয়ে আছে।
তরুণরা তরুণদের শত্রু হয়ে যাচ্ছে।আপাত পক্ষে তরুণরা কিন্তু দুইটা গ্রুপে ভাগ হয়ে একে অপরকে ঘৃণা করতে শুরু করেছে।এই অবস্থা থেকে বাঁচানো সরকারের দায়িত্ব।গত ১০ বছরের আওয়ামী সরকারের কাছে এইদেশের তরুণরা একটা দাবীর কথাই জানিয়েছিলো।সেটা যদি আওয়ামী সরকার পূরণ করতে না পারে,আর কিছু বলার নাই।যেটা আওয়ামী সরকার পূরণ করছে না সেটা অন্যদল এসে ইশতিহার দিতে চাইবে, স্বাভাবিক একটা ব্যাপার।স্বচ্ছতা যেখানে নাই সেটাকেই বলা হয় করাপশন!ভারসাম্যহীন কোটা সিস্টেমকে ব্যালেন্সে নিয়ে আসা দরকার।
 
মিজানুর রহমান নোবেল
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।