সোহরাব হাসান

সুমন জাহিদেরা কেন হারিয়ে যায়?

সুমন জাহিদ ছিলেন শহীদ সাংবাদিক-সম্পাদক সেলিনা পারভীনের একমাত্র সন্তান। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের একেবারে শেষ দিকে ১৩ ডিসেম্বর সেলিনা পারভীনকে পাকিস্তানি সেনা বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসর আলবদরের ঘাতকেরা বাসা থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। বিজয়ের পর ১৮ডিসেম্বর রায়ের বাজার বধ্যভূমি থেকে তাঁর ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়।

সুমনের বয়স তখন ১০ বছর। সেই থেকে যে জীবনযুদ্ধ শুরু গত বৃহস্পতিবার সকালে তারই যবনিকা ঘটল খিলগাঁওয়ে রেল লাইনের ওপর সুমনের রক্তাক্ত লাশ আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে।

প্রশ্ন উঠেছে এটি দুর্ঘটনা না পরিকল্পিত হত্যা? আবার কেউ কেউ আত্মহত্যা বলেও সন্দেহ করছেন। প্রতিটি শহীদ পরিবারকে কঠিন জীবনসংগ্রাম করে টিকে থাকতে হয়েছে। স্বাধীনতার সাতচল্লিশ বছরেও শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংগ্রাম শেষ হয়নি।

কিন্তু শহীদ সেলিনা পারভীনের সন্তান সুমন জাহিদের সংগ্রামটি ছিল আরও বেশি কঠিন। শহীদ পরিবারের সদস্যরা অনেক দাবি নিয়ে আসতেন। কিন্তু সুমন জাহিদের একটিই দাবি ছিল, মা সেলিনা পারভীনকে শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। একাত্তরে সেলিনা পারভীন সিদ্ধেশ্বরীতে থাকতেন। সুমনের দাবি ছিল মৌচাক-মালিবাগের সড়কটি যেন তাঁর মায়ের নামে করা হয়। এ নিয়ে সুমন কত ক্ষমতাধর ব্যক্তির কাছে ধরনা দিয়েছেন, পত্রিকায় কত চিঠি লিখেছেন, তার ইয়াত্তা নেই।

পত্রিকায় চিঠি লেখার সূত্রেই সুমনের সঙ্গে আমার পরিচয়। সুমন ছিলেন খুবই বিনয়ী ও ভদ্র। সংবাদ-এ থাকতে দেখেছি, তিনি প্রখ্যাত সাংবাদিক সন্তোষ গুপ্তের কাছে চিঠি নিয়ে আসতেন। চিঠি ছাপাও হতো। কিন্তু সড়কের নামকরণ করার দায়িত্ব যাদের , সেই ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের মন গলে না। বিভিন্ন পত্রিকায় সুমনের আবেদন প্রকাশিত হয়। বুদ্ধিজীবীরা বিবৃতি দেন। শহীদ সেলিনা পারভীনকে নিয়ে লেখালেখি হয়।

একপর্যায়ে ঢাকা সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ দাবিও মেনে নেয়। শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের নামে সড়কের নাম করার ঘোষণা আসে। কিন্তু সুমন জাহিদের সংগ্রাম শেষ হয় না। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ঘোষণা এলেও কার্যকর হয় না। সুমন জাহিদ আক্ষেপ করে বলেন, মায়ের নামে সড়ক হলেও পুরো কার্যকর হয়নি। সড়কের একদিকে মায়ের নাম লেখা হলেও আরেক দিকে আগের নামই রয়ে গেছে।

পত্রিকায় আবার চিঠি। আবার বিবৃতি। এরপর কর্তৃপক্ষ পুরো সড়কটিই সেলিনা পারভীনের নামে করলেন। সুমনের মুখে হাসি ফুটে উঠল। কেননা তাঁর আর কোনো দাবি নেই। শুধু মায়ের স্বীকৃতিটুকু চান। সেলিনা পারভীন ছিলেন সাপ্তাহিক বেগম, পাক্ষিক ললনার সাংবাদিক। তিনি ছিলেন সাহিত্য পত্রিকা শিলালিপির সম্পাদক, যাতে সেই সময়ের প্রগতিশীল সব লেখক-কবি লিখতেন। শুধু লেখালেখি নয়, সেলিনা পারভীন রাজপথের আন্দোলন সংগ্রামেও যুক্ত ছিলেন।

উনসত্তরের গণ-আন্দোলনের সময় শিশু পুত্র সুমনকে নিয়ে মিছিলে যেতেন। সেই লেখালেখি ও আন্দোলনের কারণেই তিনি পাকিস্তানি ঘাতকদের নিশানা হন।

আর আজ সাতচল্লিশ বছর পর তাঁর একমাত্র সন্তান সুমন জাহিদকে আমরা হারালাম। প্রথম আলোর সংবাদের শিরোনাম ছিল, ‘শহীদ বুদ্ধিজীবীর সন্তান সুমন জাহিদের রহস্যজনক মৃত্যু।’ কেন একজন শহীদ বুদ্ধিজীবীর সন্তানকে স্বাধীন বাংলাদেশে এ রকম রহস্যজনক মৃত্যুর শিকার হতে হলো?

এটি যদি দুর্ঘটনা হয়, সেই দুর্ঘটনার কারণ খুঁজে বের করা সরকারের দায়িত্ব। যদি পরিকল্পিত হত্যা হয়ে থাকে হত্যাকারীদের বিচারের মুখোমুখি করাও সরকারের কর্তৃব্য। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সন্দেহ তাঁকে হত্যা করা হতে পারে। যুদ্ধাপরাধের বিচার আদালতে বিদেশ পলাতক দুই ঘাতক চৌধুরী মুইনউদ্দিন ও আশরাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার কারণে তাঁকে আগেও হুমকি দেওয়া হয়েছিল।

তবে একাধিক পত্রিকায় প্রত্যক্ষদশী তিন শিশুর সাক্ষ্যে যে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, তা আমাদের ভীষণ ব্যথিত ও বিচলিত করেন। তারা বলেছে, সুমন জাহিদ পাশের এক দোকানে চা খেয়েছেন। এরপর ট্রেনের হুইসেল বাজতেই তিনি রেল লাইনের ওপর শুয়ে পড়েন। আবার পরিবার থেকে বলা হয়েছে, সকাল ৯টায় টেলিফোন করে কেউ তাঁকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। সেই টেলিফোনের সূত্র ধরেও মৃত্যু রহস্য বের করা যেতে পারে। পরিবারের থেকে আরও জানানো হয়েছে, সুমন একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করতেন। কিন্তু হত চার মাস আগে তিনি সেখান থেকে চাকরি ছেড়ে দেন। কেন তিনি চাকরি ছেড়ে দিলেন? এই যে চার মাস তিনি বেকার ছিলেন, কীভাবে চলেছেন স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে? সুমনের মৃত্যু রহস্য উদ্ঘা্টন করতে হলে এসব প্রশ্নের জবাব খুঁজে বের করা জরুরি।

বন্ধু জাহীদ রেজা নূর, যিনি নিজেও শহীদ সিরাজউদ্দীন হোসেনের সন্তান, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় লিখেছেন, ‘সুমন জাহিদের মৃত্যু খুন, আত্মহত্যা নাকি দুর্ঘটনা—তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। আমি আমার যে সতীর্থকে চিনি, শহীদ সেলিনা পারভীন যার মা, সেই সুমন জাহিদ আত্মহত্যা করতে পারে—এমন কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়। জীবনের কঠিনতম সময়গুলো ও পার করেছে। ভাগ্য সব সময় সুপ্রসন্ন থাকেনি, এরপরও লড়াকু সুমন কোথাও পরাজয় স্বীকার করে নেয়নি। ….সুমন জাহিদ আত্মহত্যা করতে পারে বলে আমার মনে হয় না। এ রকম একজন লড়াকু সৈনিক হঠাৎ করে জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে আত্মহত্যা করবে, তা ভাবতেও পারি না আমি।’

আমরাও মনে প্রাণে বিশ্বাস করতে চাই সুমন জাহিদ আত্মহত্যা করেননি। তাহলে কেন এই মৃত্যু? কেন শহীদের সন্তানের এভাবে হারিয়ে যাওয়া? কেন আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র তাঁদের নিরাপত্তা দিতে পারে না? তাঁর মৃত্যুর কারণ যাই হোক, শহীদ সন্তান সুমন জাহিদকে আমরা আর ফিরে পাব না। কেন হারিয়ে যায় শহীদ সন্তানেরা—দেশ থেকে, জীবন থেকে?

কী জবাব দেবে—ত্রিশ লাখ শহীদের জীবনের বিনিময়ে পাওয়া এই বাংলাদেশ?

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।