একরাম কন্যার কান্না এবং আমাদের অসার অনুভূতি

মেয়ে ফোন করে কোথায় আছে তা জিজ্ঞেস করছে। কিন্তু বাবা ইতিমধ্যে বুঝে গেছে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই তার জীবনাবসান হতে চলেছে। অসহায় বাবা কান্না ছাড়া আর কিইবা করতে পারে? বাবার কাঁদো কণ্ঠ শুনে মেয়ে আঁৎকে উঠে জিজ্ঞেস করছে, ‘আব্বু তুমি কান্না করতেছো যে?’ এর কিছুক্ষণ পর ‘ঘাতকের’ বুলেট একরামের বুক ঝাঁঝরা করে দিল। ফোনের অপর প্রান্তে অসহায়ের মত শুনছে আর আর্তনাদ করছে মেয়ে এবং স্ত্রী। কি এক নির্মম পরিস্থিতি!

নাহ, আমি পুরোপুরি শুনতে পারিনি অডিওটা। যতবার চেষ্টা করেছি বুকটা কেঁপে উঠেছে। আমার ভাবতে কষ্ট হয়, আমাদের ট্যাক্সের টাকায় আর রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় একদল দয়ামায়াহীন বাহিনী তৈরি হচ্ছে দিন দিন।

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। ২০০৫ সালের শেষ দিকে আমি চট্টগ্রাম ইপিজেডে একটি প্রতিষ্ঠানে এক্সিকিউটিভ এডমিন পদে চাকরি করছিলাম। এর মাঝে আমাকে কর্তৃপক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন বিভাগে ম্যানেজার পদে প্রমোশন দিল। এই পদে আমার কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। প্রমোশন পাবার কয়েক দিনের মাথায় আমার কাছে ম্যাসেজ আসলো, একটা ছেলেকে চাকরি বের করে দিতে হবে। তো কারাখানা ছুটির পর আমি ছেলেটাকে ডাকলাম। তার সমস্ত পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে বললাম কর্তৃপক্ষ তোমাকে না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরক্ষণেই তাকিয়ে দেখি ছেলেটার দুচোখ দিয়ে পানি ঝরছে। তারপর সে বলল, স্যার আমার এক মাসের একটা বাচ্চা আছে। এই চাকরিটা চলে গেলে আমার বাচ্চার দুধ কেনার টাকা থাকবে না।

আমি সেদিন একজন শ্রমিকের কান্না দেখিনি। আমি দেখেছি একজন অসহায় বাবার কান্না। আমিও কান্না ধরে রাখতে পারিনি। কারণ, তখন আমিও মাত্র বাবা হয়েছি। আমার বড় মেয়ের বয়সও তখন এক বছরের কাছাকাছি। একজন বাবার আবেগ বোঝার জন্য এর চেয়ে উত্তম সময় বোধহয় আর নেই। আমি সাথে সাথে সিদ্ধান্ত পাল্টালাম। আমি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বললাম। আমি তাদের সাফ জানিয়ে দিই এই ধরনের চাকরি আমার পছন্দ নয়। প্রয়োজনে আমি ম্যানেজার পদ ছেড়ে আগের পদে ফিরে যেতে চাই। আমার বস আমার দিকে তাকিয়ে দেখেন আমিও কাঁদছি। আমি শধু বসকে বললাম, আমিও একজন বাবা।

 

 

মেয়ের ফোন পেয়ে একরাম হয়তো নিজের জন্য কাঁদেনি। আমি নিশ্চিত, একরাম কেঁদেছে তার মেয়ে এবং স্ত্রীর কথা ভেবে। কারণ একরামও তো একজন বাবা কিংবা স্বামী।

আমি জানিনা একরাম কি অপরাধী নাকি নিরাপরাধ? যদি একরাম অপরাধী হয়েও থাকে, কিংবা মাদক ব্যবসার সাথে যুক্ত থেকেও থাকে তারপরও কি এই ধরনের বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সমর্থনযোগ্য?

পিতার কাছে মেয়ের শেষ প্রশ্ন- আব্বু তুমি কান্না করতেছো যে- এর উত্তর দিবে কে? এজন্য আমরা কি একরামের নিথর দেহ থেকে উত্তরের আশায় বসে থাকবো? নাকি আমাদের কিছু বলার সময় হয়েছে? এভাবে তো একটা রাষ্ট্র চলতে পারে না। আসুন বিচারহীন এসব হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আমাদের অসার অনুভূতিকে জাগাই। ক্রসফায়ারের নামে বিনা বিচারে মানুষ খুন বন্ধে সম্মিলিত কন্ঠে আওয়াজ তুলি।

লেখক : ফজলুল কবির মিন্টু

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।