আহমদ রফিক

মুনাফাবাজি নামক ভূত ঠেকাবে কে?

মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে নিম্নবর্গীয় পর্যায়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাপনে বড় একটি সমস্যা ‘বাজার’, অর্থাৎ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের নিয়মিত ঊর্ধ্বগতি। যেসব পণ্যদ্রব্য না হলে রান্নাঘর অচল, সেগুলোর ওপরই দেখা যায় মুনাফাবাজ ব্যবসায়ী তথা শিকারিবাজের শ্যেনদৃষ্টি। এ ধারা বছরের পর বছর ধরে চলছে। দেখার কেউ নেই। কথা বলার দায়িত্বে থাকলেও বাস্তব ব্যবস্থা গ্রহণে কেউ নেই।

বাংলাদেশ যে মূলত ব্যবসায়ীকুলের মুনাফাবাজির দেশ, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘বৈশ্যের’ দেশ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বহু অবাঞ্ছিত ঘটনা তার প্রমাণ। বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতি বেশ কিছুদিন আগে একটি অপ্রিয় সত্য উচ্চারণ করেছিলেন জাতীয় সংসদের শ্রেণিগত চরিত্র সম্পর্কে। তাঁর সমালোচনা ছিল সংসদে ব্যবসায়ীকুলের অতিরিক্ত প্রভাব-প্রতিপত্তি সম্পর্কে, তাদের রাতারাতি রাজনীতিক হয়ে ওঠা সম্পর্কে।

তাঁর এ কথার মর্মবস্তু বা নির্যাস আমরা এভাবে নিতে পারি যা আমাদের বরাবরের বক্তব্য যে এ দেশে বৈশ্যকুলের রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির মধ্য দিয়েই তাদের মুনাফাবাজির বিপুল বিস্তার, বাধা দেওয়ার শক্তির অভাব। তাতে অর্থনৈতিক দিক থেকে জনজীবন বিপন্ন। অনেক অনেক উদাহরণ রয়েছে আমাদের এ বক্তব্যের পক্ষে। এ বিষয়ে আমরা নিয়মিত লিখে যাচ্ছি, তাতে কোনো ফল দেখা যাচ্ছে না।

এই তো কিছুদিন আগে হঠাৎ করে চালের দাম কেজিপ্রতি আট টাকা বাড়ানো হলো, সরকারের মধ্যস্থতায় দুই টাকা কমানো হলো, নিট মুনাফা কেজিপ্রতি ছয় টাকা। সে সময়ের একটি খবরে প্রকাশ, এতে সে সময় ব্যবসায়ীকুলের মোট মুনাফা ২২ হাজার কোটি টাকা। এখনো সে ধান্দা অব্যাহত। অর্থাৎ ওই ২২ হাজার কোটি টাকা তাদের থলিতে সোনালি রং ঝরাচ্ছে এবং ঝরাবে।

এ ছাড়া নিয়মিত ও পরিকল্পিতভাবে দাম বাড়ে কখনো আদা, কখনো কাঁচা মরিচ, কখনো পেঁয়াজ, কখনো হলুদ, যখন যেটা সুবিধা মনে করা হয় সেটারই আশ্চর্য জাদুকরী খেলায়। অনেক দিন আগেকার কথা, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার পরিকল্পনায় সরকারি প্রতিষ্ঠান টিসিবি (ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ) গঠন করা হয়েছিল।

সাময়িক কিছু সুযোগ-সুবিধার পর দেখা গেল ‘সরষের মধ্যে ভূতের আছর’। দুর্নীতিতে ভরে গেল টিসিবির সর্বাঙ্গ। চিকিৎসার কোনো উপায় রইল না। আমার   চেনাজানা টিসিবির একাধিক সাধারণ কর্মকর্তার আর্থিক অবস্থা আঙুল ফুলে কলাগাছ। একজনের তো সিদ্ধেশ্বরীতে বহুতল ভবন। বিস্তর এমন ঘটনা টিসিবি গঠনের উদ্দেশ্য বরবাদ করে দেয়। সেখানে দু-চারজন সৎ কর্মকর্তার জীবনযাত্রা ছিল নিতান্তই সাদামাটা।

দুই.

বাংলাদেশি সমাজ এভাবে নানা মাত্রায় দূষিত হয়েছে, দুর্নীতি তার সর্বাঙ্গে পুঁজ-রক্তমাখা ক্ষত সৃষ্টি করেছে। দুর্নীতির প্রভাব এতটা সর্ববিস্তারি হয়ে দাঁড়ায় যে এর বিস্তার ঘটে চলেছে বিভিন্ন খাতে, সর্বোচ্চ শ্রেণি থেকে সর্বনিম্ন শ্রেণিতে, শিক্ষা বিভাগ থেকে একাধিক বিভাগে, বাজার থেকে বাজারে, বিভিন্ন পণ্যকে কেন্দ্র করে।

আমাদের মূল আলোচনা বাজার ও দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে, যা চলছে বছরের পর বছর ধরে। এক ধরনের ‘এতিম’ অবস্থা বাজারের। ভুক্তভোগী মাত্রেরই নিশ্চয় মনে আছে, গত বছর কয়েকটি সাধারণ পণ্যের দাম হঠাৎ আকাশছোঁয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছেছিল। যেমন কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন। ভাবতে পারেন ২০-২৫ টাকা কেজি কাঁচা মরিচের দাম ১০০ টাকা, দিনকয়েকের জন্য ২০০ টাকার অঙ্কে পৌঁছেছিল। কেউ সে বৃদ্ধির লাগামে হাত লাগায়নি।

এ তো গেল বছরকার সাধারণ সময়ের কথা। কিন্তু রোজা ও ঈদ উপলক্ষে সেখানে আগুন লাগে, অবশ্য পণ্যবিশেষে। যেমন বেগুন, ছোলা, পেঁয়াজ, রসুন, চিনি ইত্যাদি। বেশ কয়েক দিন আগে বাণিজ্যমন্ত্রী রমজান সামনে রেখে এক বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন, এবার সরবরাহ ভালো, রমজানে রোজাদারদের কোনো অসুবিধা হবে না।

আমরাও জানি, চাহিদা ও সরবরাহের অর্থনৈতিক নিয়মের কথা। ঠিকই, সংবাদপত্রগুলোর ভাষ্য মতে রমজান শুরুর এ সময়ে সরবরাহ পর্যাপ্ত, তবু কিছু জিনিসের দাম ঠিকই বেড়ে গেছে। ব্যাবসায়িক, তথা মুনাফাবাজির ঐতিহ্য বলে কথা। তাই দেখা যায়, বাংলাদেশের বাজারে পূর্বোক্ত অর্থনীতির নিয়ম অচল। তাই চাহিদা মেটানোর ঊর্ধ্বে সরবরাহ, তবু মূল্যবৃদ্ধি, মুনাফাবাজি নামক ভূতের প্রভাবে। এ ভূতের শক্তি অপরিসীম। কার সাধ্য তাকে ঠেকায়।

রমজান ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে তবু কাগজে বিস্তর লেখালেখি, বিশেষ করে রমজানের পর রমজানে এবং এই রমজানেও। তাই দেখি, একটি দৈনিকের প্রথম পাতায় মোটা হরফে লিড শিরোনাম, ‘সরবরাহ বিপুল, দাম চড়া’। এ সংবাদ প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে সাদামাটা খাদ্যপণ্য বেগুনের দাম বেড়ে ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি।

অথচ এর দাম ছিল ২০ টাকা কেজি, বেড়ে সপ্তাহখানেক আগে ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি। বেগুনির টানে এই আগুনের ঝাঁজ একইভাবে বেড়েছে শসা (৭০ টাকা কেজি), লেবু (৪০ টাকা হালি), কাঁচা মরিচে (৬০-৮০ টাকা কেজি), সেই সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের মাংসের দামও হঠাৎ চড়া। এ ব্যাপারে বড় ব্যবসায়ী থেকে খুচরা ব্যবসায়ী তথা দোকানি সমান অসাধু। না হলে আড়তে যে কাঁচা মরিচের দাম ২০-৩০ টাকা, তা দোকানে এসে ৬০-৮০ টাকা হয় কিভাবে? রমজানে মনে হয় খুচরা ব্যবসায়ীদের পোয়াবারো, কে তাদের অন্যায়ের হাত বন্ধ করবে?

আমাদের প্রশ্ন, কী করছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও মন্ত্রণালয়? শুধু বিবৃতি দিয়েই তারা দায়িত্ব থেকে খালাস? বাণিজ্যমন্ত্রী চেয়ে দেখছেন না যে তাঁর ঘোষণার বিন্দুমাত্র দাম দিচ্ছে না বৃহৎ ব্যবসায়ী থেকে খুচরা ব্যবসায়ী-দোকানদার। সাংবাদিকরা কিন্তু তাঁদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। যেমন একটি দৈনিকে শিরোনাম : ‘রমজানে দাম বাড়ানোর কারিগর ৮৬ ব্যবসায়ী’।

এ শিরোনামের বিবরণে প্রকাশ : ‘রমজান সামনে রেখে রেকর্ড পরিমাণ পণ্য আসার পরও দাম বাড়ছে পেঁয়াজ, চিনিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কয়েকটি ভোগ্যপণ্যের।’ এর প্রাথমিক দায় ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের। উল্লিখিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ছোলা, চিনি, পেঁয়াজ, ডাল, খেজুর ও ভোজ্য তেলে এখন ভর্তি আছে ৮৬ ব্যবসায়ীর গুদাম।’ খবর চট্টগ্রামের। ‘পণ্যে ঠাসা গুদাম’, ‘বাজারেও সরবরাহ প্রচুর’—তবু অদ্ভুত মূল্যবৃদ্ধি।

কী করছে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা কর্তৃপক্ষ? স্বভাবতই সংবাদপত্রে শিরোনাম : ‘রমজানেও লোভের ব্যবসা চলবে?’ হ্যাঁ চলবে, কারণ এদের অপতৎপরতা বন্ধের ইচ্ছা বা ক্ষমতা কারো নেই। এর মধ্যেও রয়েছে ভেজালের কাণ্ডকারখানা। এটা জনস্বাস্থ্যের জন্য যে কী ভয়ানক মাত্রায় ক্ষতিকর তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিষয়টি আজকের আলোচ্য নয়, তাই উল্লেখে শেষ; বারান্তরে বিশদ বলা যাবে।

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি সম্পর্কে যোগাযোগে একটি দৈনিকের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে ক্ষুদ্র আড়ত কাঁচামাল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমাদের আশ্বস্ত করে বলেছেন : ‘সরবরাহ বেশি, শিগগিরই দাম কমে যাবে’। অর্থাৎ এ কয়দিনে যা পারি, কামিয়ে নিই। পরে ধীরে দাম কমানো যাবে, কারণ কিছু মাল তো দীর্ঘ সময় ধরে রাখা যাবে না, পচে নষ্ট হয়ে যাবে। ক্ষতিটা হবে গুদামেই। তাই একসময় দাম কিছুটা কমবে অথবা কমবে না।

এই হলো আমাদের বাজারের হালচাল। দাবার ছকে কে যে ঘুঁটি আর কে যে রাজা বা মন্ত্রী বোঝা মুশকিল। অথচ রাবীন্দ্রিক ভাষায় বলা যায়, ওরা ‘সবাই রাজা’। সে জন্যই কি ‘দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি’ নিয়ে এম হাফিজউদ্দিন খান লিখেছেন : ‘বাজারে ফের তুঘলকি কাণ্ড’।

এ বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনায় তাঁর মূল বক্তব্য : ‘রমজানের বাজারে যে বৈরী পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় এর পশ্চাৎ কারণ যেহেতু অজানা নয়, সেহেতু বিষয়টির প্রতিকার নিশ্চিত করাটাও দুরূহ হওয়ার কথা নয়। বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি কঠোর আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন অতি মুনাফাবাজ ব্যবসায়ীদের।’

একই রকম কথা তথা পরামর্শ এর আগে কয়েক বছর ধরে আমরা দিয়ে আসছি, গুরুত্বপূর্ণ ভোগ্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি উপলক্ষে। ওই নিবন্ধে বলা হয়েছে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা। কিন্তু এ পর্যন্ত সে ধরনের কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। তাই দেদার মুনাফাবাজি চলেছে, যেমন আড়তে গুদামে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের অসাধু তৎপরতায়, একই রকম অসাধু তৎপরতা চলেছে খুচরা বাজারে। এখানেও মালিক সমিতি, বাজার সমিতি ওই সিন্ডিকেটেরই অন্যরূপ বলা চলে।

এটাকেই পূর্বোক্ত লেখক ‘তুঘলকি কাণ্ড’রূপে অভিহিত করে দাবি করেছেন যাতে এদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যা তাঁর মতে মোটেই কঠিন কাজ নয়। তাঁর মতে, পুরো বিষয়টিই নির্ভর করছে এ ব্যাপারে দায়িত্বশীলদের দায়িত্ব পালনে নিষ্ঠার ওপর। এ প্রসঙ্গে আরো একটি কথা বলা হয়েছে, তা হলো রমজান উপলক্ষে চাঁদাবাজি, যে সম্পর্কে ব্যবসায়ীদের বক্তব্য চাঁদাবাজি বন্ধ করার জন্য। কিন্তু এখানেও রাজনৈতিক ভূত সক্রিয়, তাই চাঁদাবাজি বন্ধ হয় না। এ চাঁদাবাজি শুধু রমজান উপলক্ষেই নয়, এর ব্যাপ্তি অনেক বড়। আর এসব নিয়ে খুনখারাবির ঘটনাও কম নয়। তবু চাঁদাবাজি বন্ধের উদ্যোগ নেই।

একাধিক লেখায় এমন কথাও প্রকাশ পেয়েছে যে সরকারের কিছু প্রচেষ্টা ব্যবসায়ীদের কোনো স্তরই মানছে না। তাই যদি সত্য হয়, তাহলে প্রশ্ন করতে হয়, সরকারের গোয়েন্দা দপ্তর বা র‌্যাব-পুলিশকে এ ক্ষেত্রে কাজে লাগানো হচ্ছে না কেন? যে র‌্যাব-পুলিশ জঙ্গি দমনে বেশির ভাগ সফল তারা কী অসাধু সিন্ডিকেট চক্র ভাঙতে অক্ষম, নাকি এ ব্যাপারে সরকারের সদিচ্ছার অভাব রয়েছে?

আবারও তাহলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক উদ্বেগের কথা মনে করে বলতে হয়, অপরিসীম ক্ষমতাবান ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট কি সব ধরাছোঁয়ার ঊর্ধ্বে, রমজানও সে ক্ষেত্রে অক্ষম উপলক্ষ?

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী।সূত্র: কালের কন্ঠ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।