মোহাম্মদ ইউনুছ আলী

বন সংরক্ষণের রাজনৈতিক অর্থনীতি

রাজনৈতিক অর্থনীতি বন সংরক্ষণকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে : টেকসই বন ব্যবস্থাপনার প্রথম ধাপ হতে পারে বনভূমি চিহ্নিতকরণ, বনের সীমানা নির্ধারণ, সীমানা পরিবর্তনের ঝুঁঁকি মোকাবেলা, ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্য নির্ধারণ, উদ্দেশ্য অনুসারে কর্মপরিকল্পনা তৈরি ও তার হুবহু বাস্তবায়ন এবং বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ, বিচ্যুতি সংশোধন, অর্থনৈতিক বিশ্নেষণ, পরিবেশগত ও সামাজিক সমীক্ষা সম্পন্ন করে বিনিয়োগ করা।

আমাদের দেশে বন ব্যবস্থাপনার ইতিহাস ১৮৯৪ সালের বননীতি অনুমোদনের পর থেকে। ভারত ভাগের পর ১৯৫৫, ১৯৬২ সালের বননীতি বন ব্যবস্থাপনাকে ধারণ করতে পারেনি। রাজনৈতিক বিবেচনায় বন আহরণের ঘোষণা পূর্ববঙ্গের জন্য এবং পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য মরুভূমির মধ্যে সেচ দিয়ে বনায়ন করা। ওই সময়ে বন শিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের জন্ম। ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তৈরি করা হলেও বিনিয়োগ করা হয়নি। বননীতি বাস্তবায়নে কোনো আইন তৈরি করা হয়নি।

বন ব্যবস্থাপনার মূল উদ্দেশ্য জনগণের চাহিদা পূরণ, পরিবেশ সংরক্ষণের অন্যতম উপাদান বন সংরক্ষণ। বনের পরিবেশগত অবদান ছাড়াও পণ্য ও সেবা উৎপাদন বনের মূল কাজ। সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। ঐতিহাসিক কারণগুলো হচ্ছে :উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।

ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা ও ১৯৯০-এর পরে আর তৈরি করা হয়নি। তবে সুন্দরবনের জন্য সমন্বিত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা এখনও চালু আছে। যদিও বেশিরভাগ সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয় না। বনজ সম্পদ আহরণের পরিকল্পনা সততা ও স্বচ্ছতার অভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে বন বিভাগ থেকে। সুন্দরবনে ১৬টি স্টেশন আছে। ৪টি রেঞ্জ, ৫০টি টহল পোস্ট বনজসম্পদ আহরণের দেখভাল করে থাকে। দুর্গম এলাকা, পানীয় জল ও চিকিৎসকের সংকট, নিত্যপণ্য দুষ্প্রাপ্য। নৌকা ছাড়া যাতায়াতের কোনো বাহন নেই। বনের মাঝে থাকতে হয়; পরিবার কাছে রাখার সুযোগ নেই। নিম্ন বেতনভুক কর্মচারীর জীবিকা অন্যদের মতোই। তার পরও এদের দুর্নীতি সবার চোখে পড়ে, বিশেষ করে গোয়েন্দা সংস্থার করা নজরদারিতে থাকতে হয় এদের। বন ব্যবস্থাপনার জন্য যে আন্তরিকতা, সততা ও নিষ্ঠা থাকতে হয়, তা আমাদের দেশে অনুপস্থিত। এর কারণও আছে। যে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সম্পদ আহরণ করা জবাবদিহির ঊর্ধ্বে এবং তা শ্রেণিবিভক্ত- ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, উকিল, চিকিৎসকদের বেলায় শর্তসাপেক্ষে প্রশ্নাতীত। তারপর আছে নেতা-সংশ্নিষ্টতা; ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে নেতাকর্মীরাই খুঁজে নেয় টু-পাইসের আশায়।

সুন্দরবন একটি প্রাকৃতিক বন। লবণাক্ত জলাভূমিতে বীজ ও শিকড় থেকে জন্ম লাভ করে বেড়ে ওঠা উদ্ভিদরাজি বিস্তীর্ণ এলাকাব্যাপী অজৈব উপাদানের সঙ্গে যে প্রতিবেশ সৃষ্টি করেছে তার নাম লবণামবুজ বন। প্রজাতির বৈচিত্র্য, কি উদ্ভিদ বা প্রাণীপ্রীতি অসাধারণ, অসামান্য, অতুলনীয়।

সুন্দরবনকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের জীবিকা অনিশ্চিত হতে পারে ডাকাত উপদ্রুত ও আবহাওয়ার বৈরী আচরণে। প্রতিষ্ঠান হিসেবে বন বিভাগের দক্ষতা, জলযান, আবাসন, যোগাযোগ উন্নয়নের বিকল্প নেই। ঐতিহাসিকভাবে প্রথাগত জীবিকায় অভ্যস্ত লক্ষাধিক পরিবার সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল।

গোলপাতার সাহায্যে গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণ দক্ষিণাঞ্চলের জনপ্রিয় আবাসন সংস্কৃতি।

গরান কাঠের জ্বালানি অত্যধিক উত্তাপ সৃষ্টি করে বলে গরান আহরণ সুন্দরবন এলাকায় জনপ্রিয় পেশা। মাছ ধরা, কাঁকড়া, চিংড়ি পোনা, বিশেষ করে গলদা-বাগদা-ইলিশ আহরণ-পরিবহন-বিপণন কাজে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান সৃজনের ফলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় সাংবৎসরিক। অর্থাৎ দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সুন্দরবনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

সম্প্র্রতি SMART টহল শুরু করেছে বন বিভাগ সুন্দরবনে। এ বিশেষ ধরনের টহল এক কথায়, ডিজিটাল পদ্ধতিতে ডাটা সৃষ্টি, সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা হয়। এতে জিপিএস (Global Positioning Systems) ব্যবহূত হয়। এ পদ্ধতির টহলে কমপক্ষে ১০ দিন একনাগাড়ে ৮-১০ জন স্টাফ ২-৩টি জলযানে সার্বক্ষণিক বনের অভ্যন্তরে জিপিএস, হাতিয়ার, খাদ্যদ্রব্য, পরিধানের পোশাক, ল্যাপটপ ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়। স্পেশাল মনিটরিং অ্যান্ড রিপোর্টিং টুলস ব্যবহার করে সুন্দরবনে অবৈধভাবে প্রবেশকারী বহু লোককে গ্রেফতার করে থানায় চালান দেওয়া হয়েছে। সুন্দরবন একটি সংরক্ষিত বন। বিনা অনুমতিতে সুন্দরবনে প্রবেশ করার বিধান নেই। কিন্তু মোংলা বন্দরে পশুর চ্যানেল দিয়ে দিনরাত বড় জাহাজ চলাচল করে। মালগত্র খালাস করে ছোট ছোট বার্জ, কার্গোর সাহায্যে সারাদেশে সুন্দরবনের নদী দিয়ে চলাচল করে। ভারতের সঙ্গে নৌ প্রটোকলে শত শত জলযান চলাচল করে সুন্দরবনের নদী দিয়ে। সুন্দরবনে গাছ, মাছ, বন্যপ্রাণী ছাড়াও বহু জলজ প্রাণী বাস করে। পানি দূষিত হলে মাটি দূষিত প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম ব্যাহত হয়। জীবিকার জন্য বনের ওপর যে চাপ অব্যাহত আছে, অনৈতিক উপায়ে আবহমানকাল ধরে সম্পদ আহরণের যে সংস্কৃতি চালু আছে, সামাজিক অবক্ষয় যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, ডাকাত-পুলিশ-র‌্যাবের যে কর্মকাণ্ড চলছে, তাতে বন বিভাগ অসহায় হয়ে পড়েছে। বন বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার কোনো বিকল্প নেই।

মানবেতর জীবনযাপন করে বন বিভাগের কর্মচারীরা অসহায়। তারা জনগণ ও সাংবাদিকদের কাছে সমালোচিত। বন সংরক্ষণের মহান ব্রত নিয়ে যেসব কর্মচারী-কর্মকর্তা নিয়োজিত তাদের কর্মপরিবেশ, ঝুঁঁকি ও জীবিকার টানাপড়েন কেউ বিবেচনায় আনে না। ঝুঁঁকি ভাতা আদায়ের উদ্দেশ্যে সরকারের কাছে বারবার এসব অসহায়ত্ত তুলে ধরা হয়েছে। সরকার হয়তো ঝুঁঁকি ভাতা মঞ্জুর করবে।

গবেষকদেরও ভূমিকা কম নয়। গাছের জাত নির্বাচনে বৈজ্ঞানিক মতামত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় ছিল না। যেমন মিনজিরি লাগানোর সুপারিশ ছিল পাহাড়ের চূড়ায়। এটি বিদেশি গাছ। কাঠ বা জ্বালানি হিসেবে মোটেই ভালো না। ইপিলইপিল বিদেশি গাছ। দেশে এত জাত থাকতে ইউক্যালিপ্টাস, আকাশমনি, ম্যানজিয়াম, মিনজিরি, ইপিলইপিল, লম্বু, দেবদারু প্রভৃতি গাছ কীভাবে এলো? জীববৈচিত্র্যের ওপর এর চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে, সে দায়িত্ব ছিল গবেষকদের।

প্রধান বন সংরক্ষক (অব.)। সূত্র: সমকাল।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।