তরুণ চক্রবর্তী

বেফাঁস মন্তব্যে বিপ্লবের রেকর্ড

ভালো করে বাংলা বলতে পারেন না এখনো। গা থেকে ‘প্রবাসী’ বা ‘আগন্তুক’ তকমাও মুছে যায়নি। ত্রিপুরার রাজনীতিতে প্রবেশ মাত্র তিন বছর আগে। দলের রাজ্য সভাপতি হয়েছেন আড়াই বছর হয়নি। এরই মধ্যে একাধিক পরিষদীয় ও দলীয় রাজনীতিতে ঝানু ব্যক্তিকে ধরাশায়ী করে দীর্ঘ ২৫ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটানোর মূল কান্ডারি বিপ্লব কুমার দেব ছিনিয়ে নিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সি।

এখন বিপ্লব একাই এক শ! প্রতিদিনই খবরের শিরোনামে। জাতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা ‘আতঙ্কে’ দিন কাটান। কারণ কখন, তিনি কোথায় কী বলে ফেলেন, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই! শুরু করলেন মহাভারতের যুগে ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইট থাকার কথা বলে। এরপর প্রশ্ন তুললেন ডায়না হেডেনের বিশ্বসুন্দরী খেতাব নিয়ে। টেক্সটাইল মাফিয়ারাই নাকি বিশ্বসুন্দরী ঠিক করে দেয়। দেশ-বিদেশে সমালোচনার ঝড় বইল। কিন্তু কুচ পরোয়া নেহি; বিপ্লব এবার আরও বড় বোমা ফাটালেন। বললেন, ‘মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়াররা নন, সিভিল ইঞ্জিনিয়াররা আসুক সিভিল সার্ভিসে।’ হাসির খোরাক হলেন! থামলেন না। সমালোচকদের হাতের নখ উপড়ে নেওয়ার কথাও শোনালেন তিনি।

ভোটের আগে মিসড কলেই চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিপ্লবের দল বিজেপি। ভোট মিটতেই বিপ্লব শিক্ষিত বেকারদের পানের দোকান খোলার পরামর্শ দিলেন। রাজ্যের নতুন নিয়োগ নীতি তৈরির ঘোষণা করে চাকরির বাজারই বন্ধ করে দিল বিপ্লবের সরকার। মুখ্যমন্ত্রী পরামর্শ দিলেন, চাকরির জন্য নেতাদের পেছন পেছন না ঘুরে গরু পোষার। চাকরিপ্রার্থীদের উদ্দেশে বিপ্লবের দাওয়াই, ‘কবে কাঁঠাল পাকবে তার জন্য গোঁফে তা দেওয়ার দরকার নেই। চাকরি হলে এমনিই হবে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে স্বাবলম্বী হোন।’

এখানেই শেষ নয়, বুদ্ধপূর্ণিমার দিন তিনি বলেন, ‘ভগবান বুদ্ধ বৌদ্ধধর্ম প্রচারে পায়ে হেঁটে চীন-জাপান-মিয়ানমার সফর করেন।’ অন্য এক অনুষ্ঠানে তাঁর মন্তব্য, হিউয়েন সাং ছিলেন চীনা সাংবাদিক। চাণক্যকে অধ্যাপক বানাতেও চেষ্টা করেন তিনি। তাঁর কথায়, সংস্কৃত পৃথিবীর প্রাচীনতম ভাষা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা ও ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের তুফান ছুটলেও থামার কোনো লক্ষণ নেই বিপ্লবের। বিপ্লবের সব বিতর্কিত মন্তব্যেরই অডিও-ভিডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়ে রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। তবু সাংবাদিকদের বাড়িতে ডেকে বলেন, অপব্যাখ্যা হচ্ছে তাঁর বক্তব্যের। ছোট ঘটনাকে বড় করে দেখাচ্ছে মিডিয়া।

এবারের ২৫ বৈশাখ তো তিনি নিজের অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ফেললেন নিজেই। বললেন, ‘ইংরেজ শাসনের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল প্রাইজ বর্জন করেন।’ দর্শক-শ্রোতা সবাই অবাক। তাঁদের বিস্ময় কাটতে না কাটতেই বিপ্লবের ‘বৈপ্লবিক’ উক্তি: ‘গীতাঞ্জলি পুরস্কারে রবীন্দ্রনাথকে বেঁধে রাখা যায় না।’ ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীর এহেন মন্তব্যে চমকে উঠলেন সবাই। সমালোচনার ঝড় উঠল সর্বত্র। রাজনৈতিক দলগুলোও মসলা পেল বিজেপি-বিরোধিতার।

সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক বিজন ধর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘হাসি পাচ্ছে। আমার প্রতিক্রিয়া শুধু এটুকুই। হাসি ছাড়া আমার কিছু বলার নেই।’ তাঁর দলেরই পশ্চিম ত্রিপুরা জেলা সম্পাদক পবিত্র কর বলেন, ‘অপরিপক্ব লোকের হাতে ক্ষমতা গেলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। লজ্জায় রাজ্যবাসীর মাথা হেঁট হয়ে যাচ্ছে। ত্রিপুরার সুনাম ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন আমাদের নবাগত মুখ্যমন্ত্রী।’ প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি বীরজিত সিনহা বিপ্লব দেবকে ‘জ্ঞানপাপী’ বলে বর্ণনা করেছেন। চলতি ভাষায় একটি কথা আছে, ‘ছাগল দিয়ে হালচাষ হয় না!’ বিপ্লব প্রসঙ্গে এ কথাটিই স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘অনেক হয়েছে। এবার দয়া করে মুখ্যমন্ত্রী তাঁর মুখ বন্ধ করে আমাদের আরও লজ্জার হাত থেকে বাঁচান।’ তাঁর দলেরই সাবেক সভাপতি গোপাল রায় বিপ্লবকে ‘আগন্তুক’, ‘প্রবাসী’ প্রভৃতি বিশেষণে আক্রমণ করে ‘তুঘলকি’ কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানান। তাঁর অভিযোগ, রাজ্যের বাইরে ত্রিপুরার লোকেরা মুখ দেখাতে পারছেন না। কারণ তাঁদেরও বিদ্রূপ হজম করতে হচ্ছে।

অনেক প্রতিশ্রুতি ছিল বিজেপির ‘ভিশন ডকুমেন্টে’। ক্ষমতায় এসে সেটা কিন্তু ভোলেননি বিপ্লব। এক এক করে সব প্রতিশ্রুতি পালনের কথা নিজেই জনগণকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। সপ্তম পে কমিশনের হাতছানি ছিল বিজেপির সরকারি কর্মীদের ভোট আদায়ের মূল স্লোগান। মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই সে জন্য কমিটি গঠন করেন। দুই সাংবাদিক খুনের তদন্তভার তুলে দেন সিবিআইয়ের হাতে। সাংবাদিকদের পেনশন ১০ গুণ বাড়িয়ে দেন। তিনি প্রতি সপ্তাহে সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ শুনছেন। মন্ত্রিসভার সদস্যদের পাশাপাশি দলীয় বিধায়কদেরও বাধ্য করছেন জনতার সামনে হাজির হতে। তাঁর সরকার ইতিমধ্যেই সরকারি হাসপাতালে অন্তর্বিভাগের রোগীদের বিনা মূল্যে সব ওষুধ দিতে শুরু করেছে। বামফ্রন্ট আমলে চিকিৎসাক্ষেত্রে বিশাল খরচের বোঝা মাত্র দুই মাসের মধ্যেই অনেকটা কমাতে সক্ষম হয়েছে বিজেপির জোট সরকার। সিদ্ধান্ত নিয়েছে, মেধার ভিত্তিতেই শুধু চাকরি হবে। রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশ কার্যকর হবে না। স্বচ্ছ নিয়োগ-প্রক্রিয়ার জন্য নতুন নিয়োগনীতি হতে যাচ্ছে। বাইরের বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাকে এনে রাজ্যে করা হচ্ছে চাকরির মেলা। স্বচ্ছতা আনা হচ্ছে ঠিকাদারি ব্যবস্থাতেও। স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় রাজ্য রাজনীতির দুই তুখোড় ব্যক্তিত্বকে এনে বসিয়েছেন। অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের কাজেও গতি আনতে সক্ষম। প্রশাসনিক ঢিলেমি দূর করে রাজ্যে কর্মসংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করছেন। সরকারি কর্মীদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক আচরণ এখনো দেখা যায়নি; বরং বাম আমলের সরকারের স্নেহধন্য বহু অফিসার এ সরকারে সমান গুরুত্ব পাচ্ছেন।

প্রতিবেশী বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব বাড়াতে প্রথম থেকেই সচেষ্ট বিপ্লব। তিনি বুঝেছেন, তিন দিক দিয়ে বাংলাদেশবেষ্টিত রাজ্যটির উন্নয়নে প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে বন্ধুত্ব অত্যন্ত জরুরি। তাই প্রথম থেকেই সুসম্পর্কের বার্তা দিয়ে চলেছেন তিনি। ফেনী নদীর ওপর নির্মীয়মাণ মৈত্রী সেতু বা আগরতলা-আখাউড়া রেলপথ নির্মাণের কাজও নিজে তদারকি করছেন। সরকারি জমি বেদখলমুক্ত করে রাস্তাঘাট চওড়া করার কাজে হাত দিয়েছে তাঁর সরকার। নদী সংস্কারের প্রয়োজনে দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস দেখাতেও পিছপা হয়নি মাত্র দুই মাসের সরকার। সর্বত্রই উন্নয়নের বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। সব মিলিয়ে মানুষ তাঁর কাজকর্মে আশার আলো দেখছেন।

কিন্তু কাজের জন্য প্রশংসিত হলেও নিজের বেফাঁস মন্তব্যের জন্যই অনেকের কাছে হাসির খোরাক হয়ে উঠেছেন বিপ্লব দেব। কেউ কেউ অবশ্য বলছেন, জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরাতেই রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের বুদ্ধিতে এহেন পথে হাঁটছেন তিনি। কারণ যা-ই হোক, তাঁর লাগামহীন মন্তব্যে দলেরও বিড়ম্বনা বাড়ছে।

তরুণ চক্রবর্তী প্রথম আলোর ত্রিপুরা প্রতিনিধি। সূত্র: প্রথম আলো।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।