মো: সাইফুল ইসলাম মাসুম

একটি স্বপ্নের অপমৃত্যু

ডানাভাঙ্গা পাখিটা বাঁচার আকুল আরতিতে ম্রীয়মান হয়ে বাঁচার তীব্র আকাংখায় প্রকৃতির উদার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় দিন গুনতে গুনতে হটাৎ আছড়ে পড়ল, ব্রাত্য হল অন্ধকার অতল বিবরে। বামেতর ডানা হারিয়ে অসহায় ছটফট ও মৃত্যুর সংগ্রাম করে শেষ অবধি আর পেরে উঠতে পারলনা। অবশেষে তার পঞ্চত্ব প্রাপ্তি হলো বড় নিঠুর পরিনতিতে। এইতো জীবন! চোখের সামনে দেখতে দেখতে চলে গেল একটি পরিপূর্ন জীবন। সেই সাথে বন্ধ হয়ে গেল সম্ভাবনার সম্ভাব্য কাষ্ঠের খিড়কি। এ বড় করুণ, বড়ই মর্মান্তিক।

ডানা ভাঙ্গা যে পাখিটার কথা বলছি-সে হলো রাজীব,মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় যার প্রথমে ডান হাত যায় এবং শেষতক না ফেরার দেশে চলে যাওয়া । হায়রে নিঠুর জীবন !

খবরটা শুনার পর কাল সারারাত একটুও ঘুমাতে পারিনি। একটি বারের জন্যও চোখটা বুঝতে পারছিলামনা। রাজিবের অপমৃত্যু নয়, এতো সমগ্র বাঙ্গালী জাতির বিবেকের অপমৃত্যু। এ কেমন জাতি আমরা? চুপটি করে মেনে নিলাম এত বড় অন্যায়? আমাদের শরীরে কি রক্ত নেই, নাকি মেরুদন্ড নেই?

দুঃস্বপ্নের মত স্বপ্নাতুর একটি বালকের স্বপ্নের ডানা ভেঙ্গে গেল। সেই সাথে শেষ হয়ে গেল একটি কিশোরের জীবনের পুঞ্জিভুত সকল আবেগ, অনুভূতি, আশা ভালবাসা, স্বপ্ন সাধ। অপূর্ণ স্বপ্নগুলো চিরদিনই তার সমাধির পরে বোবা কান্না করবে।

এভাবে একের এক কত রাজিবের প্রাণ গেলে টনক নড়বে এ জাতির, আর কত মৃত্যু হলে সচেতন হবে এদেশের চালক সমাজ?

প্রতিদিন কেউ না কেউ মরছে সারা দেশের আনাচে কানাচে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছেই। এমন কোন দিন নেই পত্রিকা খুললে কিংবা হাতের রিমোট কন্ট্রোলে বাসার টিভি চ্যানেলগুলো স্ক্রল করলে কোথাও না কোথাও মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা, সারিবদ্ধ লাশ, স্বজনহারা মানুষের কান্নার আহাজারি, এসবের খবরে হ্নদয় ভারী হয়ে উঠেনা। মৃত্যুর মিছিল আর কত বড় হবে? আর কত দেখব দুর্ঘটনায় অকাল মুত্যু? মন্থর দেহে শোকার্ত মানুষের শবযাত্রার দৃশ্য আমাকে কাতর করে তুলে। এমনি করে হয়তো আমার মত সারা দেশের অগনিত সংবেদনশীল মানুষ তাদের কষ্টের রোদন ও চাপা কান্না চেপে ধরে নীরবে সহ্য করে দ্রোহের ছাই চাপা আগুন ও তপ্ত হ্নদয়ের অস্ফুট প্রতিবাদ মানুষের প্রতি মানুষের অকুন্ঠ ভালবাসা চিরকালই ছিল, আছে, থাকবে।

কিন্তু কতিপয় মানুষ রুপি জানোয়ারের পশুরুপ পাশবিকতার নীরব শিকার রাজিবের মতো হাজারো অসহায় রাজিবেরা। একের পর এক জীবন দিয়েও বদলানো গেলনা এসব নরপিশাচ ড্রাইভারদের চরিত্র। নেশা করে মাতাল হয়ে গাড়ি চালানো বেপরোয়া ওভারটেকিং অপ্রয়োজনে পাল্লা দিয়ে গাড়ি চালানো এখন রাস্তার নৈমত্তিক দৃশ্য। আর ঠিক একারনেই ঘটছে অসংখ্য দুর্ঘটনা ও অসংখ্য অকাল মৃত্যু। এত লাশ দেখেও, এত রক্ত স্রোত দেখেও বোধোদয় হয় না এসব নিষ্ঠুর জানোয়ারদের। জানোয়ারেরা চিরকাল জানোয়ারই রয়ে গেল। মাঝখান থেকে এ দেশ হারালো অসংখ্য মেধাদীপ্ত তরুন তরুনী। এভাবেই প্রতি নিয়ত ক্রমবর্ধমান হারে বেড়েই চলছে সড়ক দুর্ঘটনা ও নারকীয় মানব হত্যা। মানুষের জীবন আজ নিশ্চিতভাবে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি।

আমরা আজ ভয়াবহতম কঠিন বাস্তবতার উদরে বাস করছি। ভুখন্ড মাঝে বয়ে চলছে অভিশাপের দমকা হাওয়া এবং সেটা শুধু মাত্র মানুষের পাপাচার আর সচেতনতার অভাবে। মানুষই আজ মানুষের জল্লাদ, মানুষই মানুষের আততায়ী। নিজ ভুখন্ডে নিজ দেহটাকে পশুর মত কামড়ে খাচ্ছে স্বজাত শকুন। আধুনিকতা ও ব্যস্ত জীবনের ক্ষিপ্রগতির জীবন প্রবাহের উত্তাল প্রবাহে আমরা যেমন বেগবান হয়েছি তেমনি হয়েছি নিদারুন নিষ্ঠুর, প্রাণহীন, পাষন্ড ও মানুষরুপি জানোয়ার। সভ্যতার উৎকর্ষের সাথে সাথে আমরা যেমন করে এগিয়ে চলেছি তেমনি করে পিছিয়েছিও বহুদুর পেছনে- মধ্যযুগীয় বর্বতার মতো। মানুষ এখন ভয়াবহ রকম স্বার্থপর, নিষ্ঠুর ও আত্মকেন্দ্রিক। শুধু এ তিনটা শোচনীয় বিষয়ের কারনে মানুষের মধ্য থেকে উঠে গেছে মায়া, মমতা, আন্তরিকতা, হ্নদ্যতা, শ্রদ্ধাবোধ, মূল্যবোধ। ফলে নিষ্ঠুর ও নিষ্প্রানের মত বেড়ে গেছে মানব হত্যা। সেটা সড়ক দুর্ঘটনায় হোক কিংবা অন্য কোনভাবেই হোক।

সামান্য একটু সচেতনতার অভাবে, সামান্য একটু হেয়ালিপনার কারনে এবং বেসামাল অথচ প্রয়োজনহীন ওভারটেকিং এর কারনে প্রাণ দিতে হল রাজিবের। এভাবেই চলছে ‘কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ’ খেলা।

মা-বাবাহীন চিরএতিম রাজিব তার অকাল প্রস্থানের মধ্য দিয়ে চির অনিশ্চয়তার অতল গহ্বরে নিজের অনিচ্ছাতেই বড় অকালেই নিক্ষিপ্ত করলেন তার মাদ্রাসায় পড়–য়া ফুলের মত নিষ্পাপ তার ছোট্ট দুটো ভাইকে, যাদের জীবনে ছোটবেলায় পিতা-মাতাকে হারানোর পর নিষ্ঠুর এই ভুসংসারে বড় ভাই রাজিবই ছিল একমাত্র অভিভাবক, বটবৃক্ষের মত একমাত্র ছায়া, অনাথ জীবনে এক আকাশসম ভরসা। পরিবারের বড় ছেলে রাজিব তার জীবনে কোনদিন কোন স্বাদ, আহ্লাদ, ইচ্ছা-অনিচ্ছার কথা মুখ খুলে বলতে পারেনি এই পৃথিবীর কারো কাছে। স্বেচ্ছায় মেনে নিয়েছিল জীবন যুদ্ধের কঠিন এ জীবনের সমস্ত কাঠিন্যকে।

অল্প বয়সেই পিতা-মাতাকে হারিয়ে শোকস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন রাজিব। এই শোককে শক্তিতে রুপান্তরিত করে ইস্পাত কঠোর মনোবল নিয়ে নিজের জীবনের সমস্ত সাধ, আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে নেমেছিলেন জীবন যুদ্ধের বৈতরনী নিয়ে। কিন্তু নিষ্ঠুর এই পৃথিবী, নিষ্ঠুর এই দেশ তাকে যুদ্ধ জয়ের সুযোগটাও দিলনা। কম্পিউটারের দোকানে টাইপ রাইটারের কাজ করে যে সামান্য মাহিনা পেতেন রাজিব তা দিয়ে বড় কায়ক্লেশে নিজের এবং পরম স্নেহেন ছোট ভাইদের পড়াশুনার খরচ চালাতেন জীবন যুদ্ধের অবিরাম পথচলার বিপ্লবী সৈনিক রাজিব। রাজিবের সমস্ত স্বপ্ন ও সংগ্রাম আজ কবরে মাটি চাপা পড়ে গেল। তার রেখে যাওয়া দুটি কলিজার টুকরা ছোট ভাইদের জীবনে কখনো মা, কখনো বাবা, কখনো ভাই, কখনো বন্ধু, সর্বোপরি এক আকাশ আশ্রয় ও শেষ ভরসার কফিনে শেষ পেরেকটিও মারা হয়ে গেছে। কুপকাত হল একটি সম্ভাবনার এবং নিষ্ঠুর ও করুণভাবে ঘটলো একটি স্বপ্নের অপমৃত্যু।

ছবি: সাইফুল ইসলাম মাসুম(লেখক)

লেখক: ব্যাংকার।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।