যৌন সন্ত্রাসীদের যেভাবে রুখে দিলো মেয়েটি

রাজধানীর ভিকারুন্নিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক ছাত্রীর লোমহর্ষক জবানবন্দি এটি। সাহস আর একটি স্টিলের টিফিন বক্স যেভাবে তাকে বাঁচিয়ে দিলো…
 
“একটা স্টিলের টিফিন বক্স আজকে আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।
 
আব্দুল্লাহপুর থেকে রামপুরা আসার জন্য বাসে উঠেছিলাম সাড়ে ৬টার দিকে। বাসে দুজন কন্ডাক্টরের একজন মনে হয় ড্রিংক করেছিল।
 
অনেক ভিড় ছিল, তবে রামপুরা আসতে আসতে প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। পেছনের দিকে কয়েকজন ছেলে বসেছিল আর সামনের দিকে আমি আর আম্মু।
 
বাসের লাইটগুলো বনশ্রীতে এসে বন্ধ করে দেয় ড্রাইভার, বলে যে তার হেডলাইট নষ্ট এ জন্য বন্ধ করেছে।
 
কালকে (সোমবার) সকালে পরীক্ষা, হাতে সময় নেই বলে কেউ এটা নিয়ে ঝামেলা করিনি।
 
রামপুরায় পৌঁছে গেলে বাস জ‍্যামে পড়ে আর আমরা নামার জন্য দরজার দিকে যেতে থাকি।
 
আম্মু প্রথমে নামে। আমি দরজা পর্যন্ত যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একজন আমার হাত চেপে ধরে, আম্মু ততক্ষণে নেমে গেছে।
 
আমি নামার চেষ্টা করি কিন্তু বাস সামনের দিকে যেতে থাকে আর পেছনে কয়েকজন বলছিল- ‘মাইয়াটারে ধর’।
 
কী করব বোঝার মতো সময় ছিল না। অন্য হাতে একটা স্টিলের টিফিন বক্স ছিল ওইটা দিয়ে লোকটাকে বাড়ি মারলাম। কতটা লেগেছিল জানি না, কিন্তু আমাকে ধরে রাখা হাতটার শক্তি কমে গেল। ধাক্কা দিলাম লোকটাকে, বাস থেকে লাফ দিলাম।
 
আমার ভাগ্য ভালো ছিল যে বাস আস্তে যাচ্ছিল আর মধুবনের সামনে জ‍্যাম ছিল। নেমে পেছনে দৌড় দিলাম। দূর থেকে আম্মুকে দেখতে পেলাম, আমাকেই খুঁজছে।
 
জানতাম যে রাস্তায় একা বের হলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তবে আজকে জানলাম মায়ের সঙ্গেও বের হয়েও আমি নিরাপদ না।
 
কালকের খবরের কাগজে আমিও হয়তো একটা কলাম হয়ে যেতাম- আমার রক্ত-মাংসের শরীরটার জন্য, কিছু জানোয়ারের জন্য।
 
যে দেশে একটা মেয়ে তার মায়ের সঙ্গেও সুরক্ষিত নয়, সেই দেশ আর যাই হোক স্বাধীন নয়।”
 
এইচএসসি পরীক্ষা চলাকালে এমন একটি বর্বরতার মুখে পড়তে যাচ্ছিলো মেয়েটি। কালকে সে সত্যিই যদি আক্রান্ত হয়ে যেতো, তাকে নিয়ে আমরা মুখরোচক নানা মন্তব্য করতাম। তার ঘটনার বিচার দাবিতে রাজপথে নেমে পড়তাম। ঘটনা ঘটেনি বলে ওইসব যৌন সন্ত্রাসীদের বিচারের দাবিতে কেউ আমরা মাথা ঘামাই না।
 
এ দেশের গণপবিহন নামের রাস্তার সন্ত্রাসের কাছে আমাদের মাথাবনত হয়ে আছে। আমাদের তরুণ রাজীবদের হাত থেঁতলে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সেই মানসিক যন্ত্রণায় রাজীবেরা সুন্দর পৃথিবীতে আর বাঁচতেও চায় না। তাতেও আমাদের চিত্ত নড়ে না।
 
এই শহরের গণপরিবহনের কর্মী নামক মাস্তানদের কাছে আমাদের মেয়েরা নিরাপদ নয়। মেয়েরা ধর্ষিত হওয়ার পরেও রক্ষা পায় না। তথাকথিত ধর্মগুরুরা বয়ান করেন, ওই মেয়ের পোশাক টাইট-ফিট ছিলো বলে…।
 
আমার বলতে লজ্জা হচ্ছে। কাল রাতে মেয়েটি তার মায়ের সঙ্গেই বাসে উঠেছিলো। পাশে মা থাকা সত্ত্বেও মেয়ের দিকে যে লোলুপ দৃষ্টিগুলো হুমড়ি খেয়ে পড়ে, এ রাষ্ট্র কেন ওই দৃষ্টিশক্তির বিনাশ ঘটাতে পারে না?
 
বাসে গণধর্ষণের পরে নির্মম নিষ্ঠুরভাবে হত্যার প্রবণতা এই দেশে বেড়ে চলেছে। তাহলে বাসার বাইরে কি করে পা রাখবে মেয়েরা, মায়েরা? কি করে তারা স্কুলে যাবে? কি করে কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে?
 
হে রাষ্ট্র, ওই লোলুপ দৃষ্টিগুলো অন্ধ করে দাও, যদি তুমি নিজে অন্ধ না হয়ে থাকো।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।