আমার প্রথম মামলাটা তোমায় নিয়ে লিখতে হলো

দিন রাত এক করে পরিশ্রম করেছিলাম।লক্ষ্য রেখেছিলাম প্রথম বারেই বিসিএসে চান্স নিতে হবে। অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে একদিনও বেকার থাকবো না। লক্ষ্য পূরণ হল,প্রশাসনে পুলিশ ক্যাডারে গেজেটেড হলাম। আজই প্রথম অফিশিয়াল ডিউটিতে যাচ্ছি,গায়ে সিএমপি পুলিশের বেগুনি আর নীল রঙের পোশাক। নামের শেষ যোগ হল, সহকারী কমিশনার,চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ(সিএমপি)। মাকে সালাম করে বের হলাম। পাঁচলাইশ থানা দিয়েই পুলিশ জীবন শুরু হতে যাচ্ছে।থানায় ঢুকার পূর্বে থানার সামনের মাটি স্পর্শ করে ঢুকলাম। অধিনস্ত পরিদর্শক,উপ-পরিদর্শক অফিসাররা স্বাগত জানলো। সবাই একে একে পরিচয় হচ্ছে। নিজের রুমে গিয়ে বসলাম।

অনেকদিন পর নিজের মাঝে প্রশান্তি পেলাম।কত কষ্ট করেছি এই স্বপ্নের জায়গায় আসতে। ইজি চেয়ারে গা হেলিয়ে চোখ বন্ধ করে ভাবছিলাম। যার কথা প্রথম মনে পড়ল সেই হল মানতাসা।মানতাসার উপর জেদ করে এই পদে আসা হয়েছে। অনার্স ৩য় বর্ষে থাকা অবস্থায় মানতাসার সাথে ফেইসবুকে পরিচয়। খুব ভাল লেগেছিল মেয়েটাকে,খুব মায়ার মুগ্ধতা ছিল তার মায়াবী চেহারায়। ভাল লাগার অজানা টান কাজ করতো বলে ভালবাসার অধিকারের জন্য একদিন প্রপোজ করে বসেছিলাম। মানতাসা আমাকে উত্তর টা পরে জানাবে বলেছিল।

তার উত্তরটা ছিল,আপনি এখনো নন-গ্র্যাজুয়েট।দুই বছর পর আমাকে বিয়ে দিয়ে দিবে। আপনি যেই সাবজেক্টে পড়েন তাতে ভবিষ্যৎ এ বের হয়ে তেমন কিছু হতে পারবেন না। আমার পক্ষে আপনাকে গ্রহণ করা সম্ভব না। এরপর কয়েকদিন কয়েকমাস মানতাসার পিছনে লেগে রইলাম। মানতাসার সোজাসাপ্টা উত্তর, আপনার ইচ্ছে হল আমার বাসায় প্রস্তাব দিন। বাসার পারমিশন পেলে তবেই আমি রাজি। মানতাসাকে কতভাবে বুঝালাম,এখন কিভাবে আমি তোমার পরিবারে প্রস্তাব পাঠাবো? আগে তুমি আমাকে ভরসা দাও,আগে তোমার হাত ধরার অধিকার দাও। প্রতিষ্ঠিত হয়ে তোমার পরিবারের সামনে দাঁড়াবো। মানতাসা রাজী ছিল না। ফেইসবুক থেকে ব্লক মেরে দিল। ভীষণ খারাপ লেগেছিল,কয়েকটা দিন মন খারাপের মাঝে কাটিয়ে দিলাম। সুস্থ হয়ে উঠলাম ব্যর্থ প্রেমিক হওয়ার শোক থেকে। পড়াশুনায় মন দিলাম। অনার্স ফাইনাল ইয়ার পরীক্ষার দিন সকালে জানতে পারলাম,আজ মানতাসার বিয়ে। ইচ্ছে আর স্বপ্ন ভাঙ্গার মন নিয়ে পরীক্ষা দিলাম,রেজাল্ট ভাল। সাথে সাথে বিসিএস পরীক্ষাটাও দেওয়ার সুযোগ পেলাম। মাত্র ৫ মাস হাতে ছিল। কঠিন পরিশ্রম,শুধু পড়া আর পড়া।মাটির নিচে কোন পোকা থাকে সেটা পর্যন্ত মুখস্থ করে ফেললাম। ভাবতে ভাবতে চোখ লেগে আসল। আজ আমাদের পাঁচলাইশ থানায় উৎসব উৎসব মুহু। একজন সুন্দরী মহিলা এসেছেন,একটা কেইস ফাইল করতে। পুলিশ মানেই ব্যস্ত আর জনতার সেবক।

আমার অধিনস্ত TSI কে বললাম,আজ প্রথম যেই ব্যক্তি থানায় হেল্প চাইতে বা সাধারণ ডায়েরী কিংবা কেইস ফাইল লেখাতে আসবে তাহাকে আমার রুমে পাঠাবে। জীবনের প্রথম কেইসটা কি রকম হয় দেখতে চাই। কিছুক্ষণ পর একজন কনস্টেবল এসে বলল, স্যার একজন মহিলা এসেছেন তার স্বামীর এগিনস্টে মেন্টাল এন্ড ফিজিক্যাল এবিউসের ধারায় মামলা করতে চান। আমার রুমে মহিলাটা প্রবেশ করতেই আকাশটা ভেঙ্গে পড়ল। নিজের অজান্তে দাঁড়িয়ে গেলাম। কি দেখলাম আমি? আর মানতাসা থমকে গেলেন,হোঁচট খেলেন,আমাকে দেখে। আমতা আমতা করে বললেন,আপনি?? আমি স্বাভাবিক হয়ে বসতে বললাম।পানি খেতে দিলাম। মানতাসা বসল,আড়ষ্টভাব কাটিয়ে তার কথা শুনলাম। মানতাসার বিয়ে হয়েছে ২ বছর হল,স্বামী অনেক বড় লোক।বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় যেতে দেয় না,অনার্স ফাইনাল দিতে দিচ্ছে না। বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যে তাদের মাঝে মনোমালিন্য শুরু হয়,সামান্য বিষয় নিয়ে ঝগড়া হতো। মানতাসার স্বামী তার এক বন্ধুর ব্যাপারে সন্দেহ করা শুরু করেছিলো। মানতাসার লেখাপড়া বন্ধ করে দিতে চাপ দিচ্ছে,কিন্তু মানতাসা গ্র্যাজুয়েট হতে চায়। তার স্বামী বাঁধা হয়ে দাঁড়াল।তালাক দেওয়ার হুমকিও পেল। দিন দিন গায়ে হাত তুলতে শুরু করল।কয়েকদিন আগেও হাত তুলল।বাপের বাড়ীও যেতে দিচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে আইনের শরণাপন্ন হতে আসল। নিজ হাতে মানতাসার কেইসটা ফাইল করলাম।থানার জিপ দিয়ে বাসায় পৌঁছে দিতে চাইলাম। কিন্তু সেই তার নিজ মত করে চলে গেল। যাওয়ার সময় একটা প্রশ্ন করল,আপনি বিয়ে করেছেন? না,আমি আজি প্রথম জয়েন করলাম সিএমপিতে আর প্রথম কেইসটা তোমারই ছিল। রাতে বাসায় ফিরলাম,মা ভাত নিয়ে বসে আছে। তার ছেলে আজ পুলিশ। মা,আমি পুলিশের চাকরীটা ছেড়ে দিব ভাবছি। মায়ের কন্ঠে আতঙ্ক ও বিস্ময়ের স্বর,কি হয়েছে বাবা?তুই কত কষ্ট করেছিস এই চাকুরীরটার জন্যে,প্রথমদিনেই বলছিস ছেড়ে দিবি!! মা, আজ থেকে ৩ বছর আগে একজনকে ভালবাসার কথা বলেছিলাম,মেয়েটা বেকার,নন-গ্র্যাজুয়েট আর শক্ত ভবিষ্যৎ নেই বলে রিজেক্ট করেছিলো আমার প্রপোজাল। আজ প্রথম জয়েনিং এর দিনে তার স্বামীর বিরুদ্ধে নিজ হাতে কেইস ফাইল করতে হলো। কত নিমর্ম! যাকে আমি ভালবাসতাম সেই এসেছে আমার কাছে তার স্বামীর বিরুদ্ধে কেইস করতে।

মিজানুর রহমান নোবেলে

চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।