বজলুর রহমান চৌধুরী

ঢাকার সবুজায়ন কীভাবে

সরকার কর্তৃক বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম জোরদার করায় গ্রামাঞ্চলে ব্যক্তি পর্যায়ে প্রচুর বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। তবে শহরাঞ্চলে পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন কর্তৃক এ বিষয়ে খুব একটা সাফল্য লাভ হয়নি বলে প্রতীয়মান। বিশেষ করে ঢাকা নগরে পরিকল্পিত বৃক্ষায়নে এখনও অনেক কিছু করার আছে। এ প্রসঙ্গে বৃক্ষরোপণ সম্পৃক্ত একটি বহুল শ্রুত গল্প স্মরণ করা যায়। ডিসি সাহেব (জেলা প্রশাসক) আনুষ্ঠানিকভাবে বৃক্ষরোপণ অভিযান আরম্ভ করার প্রক্রিয়ায় কোর্ট ভবন প্রাঙ্গণের কোনো এক স্থানে একটি গাছের চারা রোপণ করবেন। ঠিক কোন জায়গায় চারাগাছটি লাগাবেন তা নিয়ে উপস্থিত কর্মকর্তারা একেকজন একেক জায়গা দেখাচ্ছিলেন। হঠাৎ মালী বেটা বেয়াদবের মতো বলে বসল, ‘স্যার, এইখানটায় লাগান।’ সবাই অবাক! ডিসি সাহেব একটু রাগতস্বরে বললেন, ‘এইখানটায় কেন?’ মালীর উত্তর, ‘স্যার, আগের ডিসি সাহেবও এইখানটায়ই লাগাইছিলেন!’ এরপর মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। ১৯৭৫ সালে বরিশালের তৎকালীন জেলা প্রশাসক সরকারি কাজে কয়েকদিনের জন্য ঢাকায় থাকার কারণে চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে আমি আনুষ্ঠানিকভাবে ওই বছরের বৃক্ষরোপণ অভিযান উদ্বোধনের সময় কালেক্টরেটের সামনের আঙিনায় এ গল্পটি বলে একটি চারা লাগিয়ে বলেছিলাম, ভবিষ্যতে বরিশাল ভ্রমণের সুযোগ হলে দেখতে আসব, আমার লাগানো চারাগাছ এবং উপস্থিত কর্মকর্তাদের রোপিত অন্যান্য চারাগাছ বেঁচে আছে কি-না? আমার সে দিনের আশঙ্কা ভুল ছিল না। পরবর্তীকালে সরকারি কাজে বরিশাল যাওয়ার প্রথম সুযোগে সেই একই জায়গা দেখতে গিয়েছিলাম। দেখলাম, জায়গাটি তৎকালীন জেলা প্রশাসক কর্তৃক একইভাবে (অর্থাৎ আনুষ্ঠানিকভাবে) বৃক্ষরোপণের অপেক্ষায় ছিল। কারণ, আগে লাগানো একটি গাছের অস্তিত্বও সেখানে ছিল না। অবশ্য গত ১৫-২০ বছরে অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। কারণ জেলা শহরের পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন কর্তৃক চোখে পড়ার মতো কিছু বৃক্ষরোপণ কাজ হয়েছে (এবং হচ্ছে), যা দেখে আমরা আশাবাদী, দিন দিন আমাদের শহরগুলো আরও সবুজ হয়ে উঠবে।

আমাদের দেশে এখনও শহরকে বৃক্ষায়ন করতে বড় বড় গাছ, যেমন- মেহগনি, কড়ই, শিশু, সেগুন জাতীয় গাছ রাস্তার উভয় পাশে, এমনকি ডিভাইডারেও লাগানো হয় এবং একেক রাস্তায় একেক ধরনের গাছ না লাগিয়ে পাঁচমিশালিভাবে লাগানো হয়, যা শোভনীয় নয়। কয়েক বছর আগে লেখক কর্তৃক সরেজমিন যাচাই করে দেখা গেছে, মিরপুর সড়কের শ্যামলীস্থ শিশুমেলা প্রান্ত থেকে সিটি কলেজ মোড় পর্যন্ত রাস্তার ডিভাইডারে ৮-১০ ধরনের গাছ, মেহগনি, শিশু, দেশি দেবদারু, আম, কাঁঠাল, বরই, নিম এমনকি পেঁপে গাছ লাগানো ছিল। ফলে ওই সড়কে প্রচুর গাছ থাকলেও তা দৃষ্টিনন্দন ছিল না। অত্যধিক উচ্চতার ফলে অনেক গাছ নুইয়ে ছিল এবং কিছু গাছে দু-তিনটি মাথা (শাখা) গজিয়েছিল, যা কাম্য নয়।

এ প্রসঙ্গে সিডনি সিটি কাউন্সিলের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, সেখানে বনায়নের দায়িত্ব পালনের জন্য ফরেস্ট অফিসারের পদ আছে, যেখানে বন বিভাগের একজন উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা প্রেষণে নিয়োজিত থাকেন। তার কাজ হলো সিডনি শহরে বনায়ন করা। সেখান থেকে জানা যায়, বনায়নের দুটি ধারণা আছে :একটি হচ্ছে বনায়নের জন্য পরিকল্পিতভাবে বনায়ন করা, যাতে দেশের বনজসম্পদ বৃদ্ধি পায়। অন্যটি হচ্ছে শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য বনায়ন, যা আমাদের শহর-নগরে করা হচ্ছে না। এ উদ্দেশ্যে সিডনিতে প্রধানত মৌসুমি ফুল ধরে সেই রূপ গাছ লাগানো হয় এবং একেক রাস্তায় একেক ধরনের গাছ লাগানো হয়। রাস্তার দৈর্ঘ্য বেশি হলে কিছুদূর পরপর ভিন্ন ভিন্ন ধরনের গাছ লাগানো হয়। যার ফলে সবুজের সমারোহে বৈচিত্র্য আসে এবং একঘেয়ে লাগে না।

শহরাঞ্চলে পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন কর্তৃক প্রতি বছর প্রচুর সংখ্যক বৃক্ষরোপণ করা হলেও সেগুলোর অধিকাংশ স্থায়ী হয় না। এর প্রধান কারণ সেগুলো টেন্ডারের মাধ্যমে লাগানো হয়, যে টেন্ডারের মেয়াদ হয় এক বছরের। ফলে ঠিকাদার এক বছরপূর্তির পর চূড়ান্ত বিল নিয়ে যাওয়ার পর রোপিত গাছগুলোর পরিচর্যা করা হয় না এবং অধিকাংশ গাছের চিহ্নও থাকে না। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তাপুষ্ট একটি প্রকল্পের আওতায় দশটি জেলা শহরের পৌরসভা এলাকায় রোপিত কয়েকটি শহরে (যেমন রংপুর, পাবনা, ভোলা, বরগুনা, ময়মনসিংহ, ফেনী ইত্যাদি) এই অভিজ্ঞতা হয়েছে। উল্লেখ্য, বর্ণিত প্রকল্পের আওতায় পৌরসভার আর্থিক অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য লেখকের ৩-৪ বার উল্লিখিত পৌরসভা ভিজিটের সময় এ অবস্থা দেখা গিয়েছিল। অন্যদিকে, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের আওতায় উন্নীত সব জাতীয় সড়কের উভয় পাশে রোপিত গাছের ৮০-৮৫ শতাংশ টিকে থাকে এবং তাদের বৃক্ষরোপণের সফলতা প্রশংসার দাবি রাখে। এর প্রধান কারণ ওই দপ্তর কর্তৃক দুই বছর মেয়াদি প্রাক্কলন তৈরি করে তদনুযায়ী দরপত্র আহ্বান করে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ওই দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী প্রথম বছরে বৃক্ষরোপণ সমাপ্ত করার পর মোট বিলের ৬০-৭০ শতাংশ অর্থ ঠিকাদারকে পরিশোধ করা হয় এবং রোপিত গাছের পরিচর্যার সম্পূর্ণ দায়িত্ব থাকে ঠিকাদারের ওপর। দ্বিতীয় বছরের শেষ পর্যায়ে এসে ঠিকাদার কর্তৃক ইতিমধ্যে মরে যাওয়া (বা চুরি হওয়া) গাছগুলো নতুন করে রোপণ করে প্রাক্কলনের হিসাব অনুযায়ী সব গাছ কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়ার পর বিলের বাকি টাকা পরিশোধ করা হয়। এ পদ্ধতি চালু করার জন্য ঢাকা সিটি করপোরেশনকে (প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং প্রধান প্রকৌশলীকে) লেখক কর্তৃক একাধিকবার লিখিত ও মৌখিকভাবে অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু কাজ হয়নি। এমনকি ঢাকা সিটি করপোরেশনে প্রধান প্রকৌশলী পদে কর্মরত একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেলকে এটাও বলা হয়েছিল যে, ঢাকা সেনানিবাসের প্রধান সড়ক নির্মাণের মতো করে ঢাকা নগরীর রাস্তাগুলো নির্মাণসহ সেনানিবাসের সদর দপ্তরের সামনের সড়কের ডিভাইডারের Weeping Willow গাছগুলো যেভাবে ছেঁটে রাখা হয়েছে, সেভাবে ঢাকার ডিভাইডার ও আইল্যান্ডের গাছগুলোও যেন একইভাবে ছেঁটে রাখা হয়। কিন্তু কাজ হয়নি। ঢাকায় পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণের জন্য কয়েকটি প্রস্তাব পেশ করছি :

১. এখন থেকে সড়কের ডিভাইডারে কোনো বড় গাছের চারা (যেমন মেহগনি, সেগুন, কাঁঠাল, কড়ই, শিশু, নিম) রোপণ না করা। ২. সড়কের আইল্যান্ড ও ট্রায়াঙ্গলে বাগানবিলাস, সাদা/গোলাপি মোচন্ডি, রঙ্গন, ক্রিসমাস ট্রি, কামিনী ও পাতাবাহার গাছ লাগানো। একেক আইল্যান্ড/ট্রায়াঙ্গলে একেক ধরনের (ফুল) গাছ লাগানো। ৩. এখন থেকে রাস্তার উভয় পাশে শুধু পুষ্পময় গাছ যেমন কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, জারুল, বকুল ও নাগেশ্বর গাছ লাগানো। ৪. খালি মাঠ/উদ্যানে নিম (আরাফাতের ময়দানে লাখ লাখ নিমগাছ আছে), মেহগনি, পাকুড়, অশ্বত্থসহ অন্যান্য গাছ, যেগুলোয় পাখি আকৃষ্ট হয়, তা লাগানো। ৫. এখন থেকে ঢাকার দুটি সিটি করপোরেশন কর্তৃক সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অনুকরণে দুই বছর মেয়াদি প্রাক্কলন তৈরি করে তদনুযায়ী বৃক্ষরোপণ করা। ৬. মিরপুর সড়কসহ অন্যান্য সড়কে বিদ্যমান Weeping Willow গাছগুলো একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় (১০-১২ ফুট) ছেঁটে রাখা (ঢাকা সেনানিবাসের মতো)। ৭. ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসারের একটি করে পদ সৃষ্টি করে (সিডনির মতো) তার তত্ত্বাবধানে ঢাকা নগরে পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ করা। ৮. ঢাকা নগরের বিভিন্ন সড়ক সংযোগের গোলচত্বর, ত্রিকোণা আইল্যান্ড ইত্যাদি স্থাপনার সৌন্দর্য বর্ধন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব বিভিন্ন সরকারি ব্যাংক, করপোরেশন ইত্যাদিকে (তাদের ছোট বিজ্ঞাপন প্রচার সাপেক্ষে) দেওয়া যেতে পারে। ৯. বহুতলবিশিষ্ট বাণিজ্যিক ভবনের নকশা রাজউক কর্তৃক অনুমোদনের সময় প্রতিটি ভবনের সামনে বৃক্ষরোপণের ল্যান্ডস্কেপসহ প্ল্যান অনুমোদন এবং নকশা অনুযায়ী বৃক্ষরোপণ করা হলো কি-না তা নিশ্চিত করা। ১০. পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে সব বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবনের নকশা রাজউক কর্তৃক অনুমোদনের সময় প্রতিটি ভবনের ছাদে ফুল ও ছোট উচ্চতার গাছ লাগানোর জন্য চৌবাচ্চা আকারের স্থায়ী বাক্স নির্মাণের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা। ১১. ৯ ও ১০ নম্বরের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য উভয় সিটি করপোরেশন থেকে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে পূর্ত মন্ত্রণালয় কর্তৃক রাজউককে নির্দেশ প্রদানের জন্য অনুরোধপত্র প্রেরণের ব্যবস্থা করতে হবে।

সাবেক অতিরিক্ত সচিব।

নোট: সমকাল থেকে নেয়া।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।