বিএস ২১১

আবিদে শুরু, আবিদেই শেষ

‘ডে হাভিল্যান্ড বোম্বার্ডিয়ার অ্যারোস্পেস” এর তৈরি বোম্বার্ডিয়ার ড্যাশ এইট কিউ সিরিজের বিমানটি কানাডা থেকে উড়িয়ে এনেছিলেন বাংলাদেশ এয়ার ফোর্সের ফ্লাইট ল্যাফটেনেন্ট আবিদ সুলতান। গতকাল যখন নেপালের কাঠমাণ্ডুতে ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশে সমাধি হয়ে গেলো বিমানটির, তখনও ক্যাপ্টেন ছিলেন সেই আবিদ সুলতান।

এই ট্র্যাজেডি কেড়ে নিয়েছে দেশের একজন ব্রাইট বৈমানিককে। না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন বিমানটির কো-পাইলট প্রিথুলা রশিদসহ অন্তত ৫০ জন আরোহী। মৃত্যুর সঙ্গে ছটফট করছেন আরও অনেকে।

সোমবার (১২ মার্চ) ভয়াবহ দুর্ঘটনার পরে গুরুতর আহত অবস্থায় আবিদ সুলতানকে ভর্তি করা হয় নেপালের একটি হাসপাতালে। মঙ্গলবার সকালে খবর আসে, মৃত্যুর কাছে হেরে গেলেন তিনিও। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

রাজধানীর রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের ছাত্র ছিলেন আবিদ। ছিলেন বাংলাদেশ এয়ার ফোর্সের ফ্লাইট ল্যাফটেনেন্ট। বিমান বাহিনীর মিগ-২১ বিমান চালানোর অভিজ্ঞতাও ছিলো এই বৈমানিকের। সহকর্মী ও বন্ধুদের কাছে তিনি ছিলেন দেশের একজন ব্রাইট অফিসার।

জানা গেছে, কানাডার বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান “ডে হাভিল্যান্ড বোম্বারডিয়ার অ্যারোস্পেস” এর তৈরি বোম্বারডিয়ার ড্যাশ এইট কিউ সিরিজের বিমানটি ১৯৮৩ সাল থেকে যাত্রা শুরু করে। তবে কিউ ফোর হান্ড্রেড সিরিজের বিমানগুলো বাণিজ্যিকভাবে যাত্রা শুরু করে ২০০০ সালে। এ বিমানের প্রতিটির মূল্য ৩ কোটি ২২ লাখ মার্কিন ডলার।

সাধারণত ৭০ থেকে ৭৮ আসনের এ বিমানট ঘন্টায় প্রায় ৭শ কিলোমিটার গতিতে ভূমি থেকে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়তে সক্ষম। কিউ সিরিজের সবচেয়ে সবচেয়ে আধুনিক কিউ ফোর হান্ড্রেড মডেলের এই বিমানটিতে রয়েছে অত্যাধুনিক এনএনভিএস প্রযুক্তি।

কানাডার “ডে হাভিল্যান্ড বোম্বারডিয়ার অ্যারোস্পেস” এ পর্যন্ত বোম্বারডিয়ার ড্যাশ এইট মডেলের ১২র’ও বেশি বিমান নির্মাণ করেছে। যার মধ্যে কিউ ফোর হান্ড্রেড সিরিজের রয়েছে ৬১৪টি। প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭০ সালে ড্যাশ সেভেন প্রকল্প নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও, বর্তমানে এটি অত্যাধুইনিক ড্যাশ নাইন প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে বলে জানা গেছে।

তবে, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে সোমবার নেপালের কাঠমান্ডু বিমানবন্দরে ইউএস এয়ারলাইন্সের বিমান দুর্ঘটনার আগে, ২০০৭ সালে সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবরে ল্যান্ডিং গিয়ার জনিত সমস্যায় মাত্র একমাসের ব্যবধানে তিনবার দুর্ঘটনার কবলে পড়ে স্ক্যান্ডিনেভিয়ার এয়ারলাইন্সের একই মডেলের তিনটি বিমান। তোউ ঘটনার পর এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ তাদের বহর থেকে প্রত্যাহার করে নেয় ড্যাশ এইট-কিউ ফোর হান্ড্রেড সিরিজের এই বিমানটি।

এর আগেও, ২০০৭ সালে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারলাইন্সের একই মডেলের তিনটি বিমান মাত্র একমাসের ব্যবধানে তিনবার ল্যান্ডিং গিয়ার জনিত সমস্যায় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। যদিও, সেবার কোন ধরনের হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

শেষরক্ষা বুঝি হলো না। সেই বিমানটিই এবার ধ্বংসস্তুপে পরিণত হলো নেপালে গিয়ে। মুখ থুবড়ে পড়লো ৭১ আরোহী নিয়ে। বিধ্বস্ত হয়ে দাউ দাউ আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়েছেন অন্তত অর্ধশত আরোহী।

জানা গেছে, গত ক’বছরে এই বিমানটি নিয়েই আবিদ সুলতান উড়েছেন অনেকটা পথ। এমনকি দুর্ঘটনার দিনও এই বিমান নিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে আসা-যাওয়া করেছেন চারবার। এরপর দুপুরে রওনা করেন নেপালের দিকে।

ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতান— যার হাতে বাংলাদেশের আকাশে আগমন ঘটে, তার হাতেই ধ্বংস হলো এই উড়োজাহাজ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।