আনিসুল হক

এই ক্ষত মুছবে কী করে?

মুহম্মদ জাফর ইকবাল মৃদু হাসলেন। রোববার দুপুরবেলা হাসপাতালে তাঁর বিছানার পাশে দাঁড়ালেন তাঁর স্ত্রী ইয়াসমিন হক। বললেন, ‘তোমাকে বিদেশে নিতে হবে না।’ সাদা আচ্ছাদন মাথায় পরা জাফর ইকবাল হাসছেন, বাইরে মনিটরে আমরা দেখলাম। সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে বাইরের কারও প্রবেশ নিষেধ। আমরাই ইয়াসমিন হককে অনুরোধ জানালাম তাঁকে একটিবার দেখা দেওয়ার জন্য।

লেখক, শিক্ষক আর শিশু-কিশোরদের প্রিয়তম এই মানুষটিকে গত শনিবার আঘাত করা হয়েছে তাঁরই প্রিয় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায়।

তাঁর মাথার পেছনে চারটা কোপ, পিঠে একটা, হাতে একটা। ওসমানী হাসপাতালেই তাঁকে চার ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়েছিল।

তাঁর করোটি আর মস্তিষ্ক অক্ষত আছে। সুচিকিৎসা চলছে। চিকিৎসকেরা আশা করছেন, তিনি শিগগিরই সেরে উঠে হাসপাতাল ত্যাগ করতে পারবেন। দেশবাসীর সঙ্গে আমরাও প্রার্থনা করছি, তিনি দ্রুত সেরে উঠুন।

শরীর তাঁর সেরে উঠবে। দাগও হয়তো মুছে যাবে। কিন্তু তাঁর মনে যে দাগ পড়ল, তা মুছবে কী করে? দেশবাসীর মনে আতঙ্কের যে ছায়া পড়ল, তা দূর হবে কী করে?

এই বিপদ অবশ্য নতুন নয়। শুধু বাংলাদেশই বিপদাপন্ন নয়। সেই ১৯৯৯ সালে কবি শামসুর রাহমানের ওপর আক্রমণের চেষ্টা করা হয়েছিল। তারপর হুমায়ুন আজাদ থেকে ফয়সল আরেফিন দীপনসহ আরও বহু লেখক, সংস্কৃতিসেবী, পাদ্রি ও দেশি-বিদেশী নিরীহ নাগরিক পরিকল্পিত ও বিচ্ছিন্ন আক্রমণের শিকার হলেন। উদীচীর সম্মেলন, রমনার বটমূলে বোমা হামলা হলো, এমনকি হামলা করা হলো ঈদের জামাতেও। হো‍লি আর্টিজানের হৃদয়বিদারক ঘটনার পর সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর হলো। আমরা কিছুটা স্বস্তিও ফিরে পাচ্ছিলাম, বুঝি বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বিপদকে নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে। কিন্তু পৃথিবীর নানা প্রান্তে নানা জঙ্গি আক্রমণের খবর আমাদের শঙ্কিত করেই আসছে।

এই বিপদ তো সহজে যাওয়ার নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা, সক্ষমতা, আধুনিকতা, অতন্দ্র প্রহরা ও আগাম পদক্ষেপ তো লাগবেই। কিন্তু এই সমস্যা রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক। যে তরুণ হাতে ধারালো অস্ত্র তুলে নিয়েছে, আক্রমণ করতে পেরেছে অতিসজ্জন একজন লেখককে পেছন থেকে, তাকে বোঝানো দরকার, সে কেবল মানবতার ক্ষতি করেনি, ক্ষতি করেছে আমাদের ধর্মের, আমাদের জনগোষ্ঠীর এবং আমাদের দেশের। হিংসা দিয়ে কিছুই জয় করা যায় না, মানুষের হৃদয় তো নয়ই।

১ মার্চ প্রথম আলোয় বেরিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রতিবেদনের খবর। তারা বলেছে, রাজনীতিকীকরণের ফলে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদবিরোধী কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। একদিকে রাজনৈতিক মেরুকরণ ঐতিহাসিকভাবে বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে স্থানীয় জঙ্গিদের যোগাযোগ। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতার জন্য নতুন প্রকৃতির জঙ্গিবাদ হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে তারা।

এ ধরনের প্রতিবেদন আমলে নিতে হবে। জঙ্গিবাদের বিপদ থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে উদ্যোগটা নিতে হবে চতুর্মুখী। অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক বিভেদ কমাতে হবে। বিভেদের বীজাণুর চাষ না করে সম্প্রীতির সূত্রগুলোকে জোড়া দিয়ে বন্ধন করতে হবে জোরালো। এ দেশের মানুষ বোমা পেতে রাখবে জনসমাবেশে, আঘাত করবে বিদেশি অতিথিকে, হামলা করবে লেখকদের ওপর-এসব ছিল অচিন্তনীয়। কিন্তু এখন তা ঘোরতর বাস্তবতা।

এখন দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, মধ্যমেয়াদি কর্মসূচি আর আশু পদক্ষেপ। ব্যাপারটা মিটে গেছে বলে একমুহূর্তের শৈথিল্যের সুযোগ নেই।

মুহম্মদ জাফর ইকবাল আক্রান্ত হয়েও বলেছেন, ‘আমি ঠিক আছি।’ রক্তাক্ত অবস্থায় বলেছেন, ‘আক্রমণকারী সুস্থ আছে তো।’ ছাত্রদের বলেছেন, ‘তোমরা শান্ত থেকো।’

বাংলাদেশকে প্রমাণ করতে হবে, আমরা সেই দেশ, যারা বলতে পারে, ‘ভায়ের মায়ের এত স্নেহ কোথায় গেলে পাব কেহ!’ আমরা সেই দেশ, যারা ভালোবাসা দিয়ে বিশ্ব জয় করি, ঘৃণা বা হিংসা দিয়ে নয়।

অন্ধকারে তরবারি ঘুরিয়ে জঙ্গিবাদ দূর করা যাবে না। জ্বালাতে হবে আলো। গণতন্ত্রের আলো, শিক্ষার আলো, সংস্কৃতির আলো, সম্প্রীতির আলো।

আমরা মুহম্মদ জাফর ইকবালের দ্রুত আরোগ্য কামনা করি। আমরা আক্রমণকারী আর তার পরিকল্পনাকারীদের বিচার চাই, সাজা চাই, সমূলে উৎপাটন চাই। অতীতে এ ধরনের অপরাধের বিচার না হওয়া, বহু জঙ্গির জামিনে মুক্তি এবং আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ার খবরে আমরা উদ্বিগ্ন।

ভয়ের ছায়া ইগলের পাখার ছায়ার মতো আমাদের মাথার ওপরে। বুকের ওপর পাথর চেপে বসেছে। অথচ আমাদের কবি তো স্বপ্ন দেখেছিলেন সেই স্বদেশের, ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,/জ্ঞান যেথা মুক্ত’। চেয়েছিলেন আমরা নিজেদের আঙিনাকে বিভেদের প্রাচীর দিয়ে যেন ক্ষুদ্র আর খণ্ড না করি।

স্বাধীনতা মানে স্বাধীনতার জন্য ক্রমাগত লড়াই করে যাওয়া। ২০১৮ সালের মার্চেও আমাদের বলতে হচ্ছে, লড়াই চলছেই। কবি ও কথাসাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হকের ভাষায়, ‘এসো ছিনিয়ে নিই আমাদের স্বাধীনতা, অক্ষরের পাশে অক্ষর বসিয়ে শব্দগুলো তৈরি করবার স্বাধীনতা।’

নোট: প্রথম আলো থেকে নেয়া।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।