হাসানুল হক ইনু

গণমাধ্যম হোক গণতন্ত্র ও উন্নয়নের সহযোগী

দেশের উন্নয়নকে টেকসই, গতিশীল ও অংশগ্রহণমূলক করতে অবাধ তথ্যপ্রবাহের কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান সরকার অনুসৃত এ অন্যতম মূলমন্ত্র বাস্তবায়নে কাজ করছে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল। সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থার স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করার দৃঢ়প্রত্যয় সে কাজেরই অংশ। বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল দিবস প্রবর্তন সেই প্রত্যয়েরই একটি প্রোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের কার্যকর ভূমিকায় দেশের সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থা কর্তৃক বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের ফলে জনগণ একদিকে উন্নয়নমূলক কাজের বিষয়ে আরও সচেতন হচ্ছে, অন্যদিকে জনগণের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি সম্পর্কে সরকারও অবহিত হচ্ছে। এ দুয়ের কার্যকর সমন্বয়ে এগিয়ে চলেছে দৃপ্ত বাংলাদেশ। এ ছাড়া হলুদ সাংবাদিকতা পরিহার করে সংবাদপত্র, সংবাদ সংস্থা ও সাংবাদিকরা বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে আরও সচেতন হচ্ছেন।

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষা ও মানোন্নয়নে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল এখন আগের তুলনায় অনেক গতিশীল হয়েছে। হলুদ সাংবাদিকতা রোধে প্রেস কাউন্সিলে দায়েরকৃত মামলাগুলো অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে নিষ্পত্তি করে বিচারপ্রার্থীর আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। এ ছাড়া আমাদের প্রেস কাউন্সিল আন্তর্জাতিকভাবেও যোগাযোগ ও সমন্বয় রক্ষা করে চলেছে। ভারত ও নেপালের সঙ্গে দুটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও প্রশিক্ষণ সহায়তার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ওয়ার্ল্ড অ্যাসোসিয়েশন অব প্রেস কাউন্সিলসের নির্বাহী সদস্য নির্বাচিত হয়েছে। আপনারা সকলেই এ সম্মানের ভাগীদার।

আমি গণতন্ত্র, গণমাধ্যম এবং সাংবাদিকতা প্রসঙ্গে দু’একটি কথা বলব।

গণতান্ত্রিক সমাজ বহুবাচনিক আর গণমাধ্যম বহুস্বর, বহুস্মৃতি, বহুস্বপ্ন পরিবহন করে। গণমাধ্যম জাতির বিবেক তৈরি করে। আবার বিবেককে পাহারাও দেয়। গণমাধ্যম উন্নয়ন যাত্রায় প্রধান অনুঘটক এবং সাংবাদিকতা একটি বিশেষ পেশা ও সম্মানজনক পেশা। আমাদের গণমাধ্যম সবসময়ই দেশের পক্ষে, গণতন্ত্রের পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা রেখে আসছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণআন্দোলন এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিএনপি নেত্রী পরিচালিত আগুনযুদ্ধ ও বিচ্ছিন্ন জঙ্গি হামলা মোকাবেলায় গণমাধ্যম যে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা নিয়েছে- এ জন্য আমি সব গণমাধ্যমকর্মীকে আবারও আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি।

সময়ের প্রতিটি বাঁকে মাইলফলক রচনা করার মধ্য দিয়ে আপনারা আজকের পর্যায়ে এসেছেন। সুতরাং বাংলাদেশের গণমাধ্যমের একটি গৌরবোজ্জ্বল অতীত রয়েছে, ঐতিহ্য রয়েছে, যা গর্ব করার মতো। তাই সেই অতীত, গৌরব এবং ঐতিহ্য ধারণ করে সামনে আরও গৌরবময় বিষয় রচনা করার জন্য আপনাদের ভূমিকা রাখতে হবে।

গর্বের সঙ্গে বলতে হয়, আমাদের সংবিধান জাতীয় জীবনের অনেক বিষয়ের মধ্যে তিনটি বিষয়ের স্বাধীনতা শর্তসাপেক্ষে নিশ্চিত করেছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।

সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে- প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধা বোধ নিশ্চিত হইবে এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্রের অর্থ আইনের শাসন। আমি এটাকে এভাবে ব্যাখ্যা করি যে, গণতন্ত্র হচ্ছে আইনের মশারি ঢাকা একটি তুলতুলে বিছানা। আইনের এই মশারির ভেতর গণতন্ত্রের চর্চা হয়। এই স্বচ্ছ মশারির ভেতর থেকে বাইরে দেখা যায়, বাইরে থেকে ভেতরেও দেখা যায়। কিন্তু বাইরের পোকামাকড় ভেতরে ঢুকতে পারে না, অর্থাৎ অনভিপ্রেত উৎপাত থেকে গণতন্ত্র নিরাপদ থাকে।

তথ্য ও যোগাযোগ-প্রযুক্তির বিপ্লব এই মশারিকে আরও স্বচ্ছ একটি কাচের ঘরে পরিণত করছে। একই সঙ্গে তথ্য ও যোগাযোগ-প্রযুক্তি প্রতিটি মানুষকে ক্ষমতায়িত করছে। সরকারের অন্দর মহলে আলো ফেলছে, প্রশাসনকে আরও জবাবদিহিমূলক করছে। আগে বন্দুকের নল থেকে ক্ষমতা উৎসারিত হতো, এখন ক্ষমতা উৎসারিত হয় ব্যালট ও মাউসের টোকা থেকে।

মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র এমন একটি ঘর, যার চারপাশে কাচের দেয়াল রয়েছে, আইনের সুরক্ষা দেয়াল। আর সেই কাচের ঘরে রয়েছে শিশুর মর্যাদা, নারীর সল্ফ্ভ্রম, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও মানুষের ব্যক্তিগত জীবন। তথ্য ও যোগাযোগ-প্রযুক্তির বিপ্লব আমাদের এই কাচের ঘরকে ক্রমেই প্রসারিত করছে, সেই সঙ্গে একটি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখেও দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। চ্যালেঞ্জটি হচ্ছে- এই স্বচ্ছ ঘরে, যেখানে সব দেখা যায়, সেখানে শিশু-নারী-রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত জীবনের নিরাপত্তা ও পবিত্রতা রক্ষার চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জের দুটি দিক- একটি প্রযুক্তিগত; অপরটি আইনগত।

কোন প্রযুক্তিগত ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে অনভিপ্রেত বিষয়গুলো শিশুর কাছ থেকে দূরে রাখতে হবে, নারী-শিশু-মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে- তা প্রযুক্তিবিদরা ঠিক করবেন। সেই সঙ্গে কোন আইনগত কাঠামোর মধ্য দিয়ে তা করা হবে, তাও ঠিক করতে হবে। ডিজিটাল অপরাধীরা যাতে ডিজিটাল স্পেসের অপব্যবহার করে ব্যক্তি, রাষ্ট্র, গণতন্ত্র ও গণমাধ্যমকে হুমকির মুখে ফেলতে না পারে, আইনের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করতে হবে।

মহামান্য রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে আপনারা যারা গুণীজন রয়েছেন, তাদের সামনে আজকে একটি বিষয়, একটি উপলব্ধি আমি পরিস্কার করে বলতে চাই, ‘যে সরকার ডিজিটাল পদ্ধতি প্রবর্তন করে, সেই সরকার অবশ্যই গণতান্ত্রিক। দি গভর্নমেন্ট হুইচ অ্যাডপ্টস ডিজিটাইজেশন, ইজ অফকোর্স আ ডেমোক্রেটিক ওয়ান।’ কারণ ডিজিটাল বা তথ্য ও যোগাযোগ-প্রযুক্তি হচ্ছে জনগণকে ক্ষমতায়িত করার প্রযুক্তি, গণতন্ত্রকে আরও অংশগ্রহণমূলক করার প্রযুক্তি, প্রশাসনকে আরও জবাবদিহিমূলক ও স্বচ্ছ করার প্রযুক্তি, রাষ্ট্র ও জনগণকে আরও কাছে আনার প্রযুক্তি। এই যুগান্তকারী প্রযুক্তি ও প্রক্রিয়ার সুফল আমাদের ভোগ করতে হবে। আর সে জন্য ডিজিটাল স্পেসকে নিরাপদ ও অপরাধমুক্ত রাখার বিকল্প নেই। সেখানেই প্রয়োজন মুনশিয়ানা। কীভাবে তা করা যাবে, সে নির্দেশও দিয়েছে আমাদের সংবিধান। সংবিধান মেনেই আমাদের বিচার বিভাগ, গণমাধ্যম ও মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে, আইনের মশারি ঢাকা, তথ্য ও যোগাযোগ-প্রযুক্তির কাচের দেয়ালে ঢাকা গণতন্ত্রের তুলতুলে বিছানাকে নিরাপদ রাখতে হবে।

অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত হচ্ছে গণতন্ত্রকে স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও প্রসারিত করার সিদ্ধান্ত। সেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে, সেই সরকারকে, সেই বাংলাদেশকে অগণতান্ত্রিক বলার কোনো অবকাশ নেই। গণতান্ত্রিক না হলে এই সরকার জিডিটাল পদ্ধতিতেই যেত না। যে সরকার ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়, সেই সরকার অবশ্যই গণতান্ত্রিক। স্বৈরাচারী-সাম্প্রদায়িক কোনো সরকার ডিজিটাল পদ্ধতি নিত না এবং নেয়নি। কারণ ডিজিটাল প্রযুক্তি সবকিছুকে স্বচ্ছ করে দেয়। যে সংবিধান, বিচার বিভাগ, গণমাধ্যম ও মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে, সেই সংবিধান হাতে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিজিটাল বাংলাদেশের পদক্ষেপটি নিয়েছেন। গণতন্ত্রকে আরও অংশগ্রহণমূলক, আরও জবাবদিহিমূলক, আরও বিকশিত করাই তার লক্ষ্য।

আর এই গণতন্ত্রের বাংলাদেশে গণমাধ্যম কেমন হবে? আমি বলি-প্রথমত, গণমাধ্যম বস্তুনিষ্ঠ হবে। নিরপেক্ষতার নামে অগণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে স্থান দেবে না, তথাকথিত ভারসাম্য রক্ষার কাজ করবে না। রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধাকে এক পাল্লায় মাপবে না, অপরাধী ও ভালো মানুষকে এক পাল্লায় মাপবে না, গণতান্ত্রিক শক্তি ও অগণতান্ত্রিক অপশক্তিকে এক পাল্লায় মাপবে না; দ্বিতীয়ত, মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করবে; তৃতীয়ত, চার হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি-ঐতিহ্য ও মীমাংসিত বিষয়গুলোকে ধারণ করবে, বিতর্কিত করবে না; চতুর্থত, অন্তর্ভুক্তি ও অংশগ্রহণের নামে অগণতান্ত্রিক অপশক্তিদের হালাল করার অপচেষ্টা করবে না এবং পঞ্চমত, কোনো সাজাপ্রাপ্ত অপরাধীকে মহিমান্বিত করা বা বীর বানানো বা সেই অপরাধীর প্রতি সহানুভূতি তৈরি করা গণমাধ্যমের কাজ নয়। আপনাকে সবসময়ই অতন্দ্র প্রহরীর মতো সজাগ থাকতে হবে। অতীত বলছে, বাংলাদেশে গণমাধ্যম কখনোই খলনায়ক হয় না, গণমাধ্যম সবসময়ই গণতন্ত্রের ও উন্নয়নের সহযোগী।

আমি আশা করি, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমকে বিপদমুক্ত রাখতে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল ভবিষ্যতে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।

(ঈষৎ সংক্ষেপিত)

তথ্যমন্ত্রী, বাংলাদেশ সরকার।

নোট: সমকাল থেকে নেয়া।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।