মাইশা আলম

রোহিঙ্গা সংকটে যেভাবে আক্রান্ত হচ্ছে বাংলাদেশ

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জাতিসংঘের হিসাবে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমারের জাতিগত নিধনযজ্ঞ থেকে প্রাণে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। এর প্রায় সবাই আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশের কক্সবাজারে। এটি বাংলাদেশকে তীব্র চাপের মধ্যে ফেলেছে। তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে ক্যাম্পগুলোর ওপরও।

বাংলাদেশ একটি ছোট নিচু ভূমি। দেশটির সম্পদের পরিমাণ সীমিত এবং অত্যন্ত জনবহুল। মিয়ানমার থেকে যেভাবে রোহিঙ্গারা বের হয়ে আসছে, তাতে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন নেতা ও নাগরিকদের মধ্যেও অসহনশীলতা বাড়ছে। এই বিপুলসংখ্যক অনুপ্রবেশকারীর ভার বাংলাদেশকে পাঁচ ধরনের সংকটে ফেলছে।

মিয়ানমার ২০১৭ সালের আগস্টের শেষ দিকে তাদের সহিংস অভিযান শুরু করে। গোড়ার দিকে বাংলাদেশ পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

চীন ও ভারত শুরু থেকেই মিয়ানমারের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এ বছরের শেষ দিকে। তার আগেই হাসিনা সরকার অনুপ্রবেশকারীদের ফেরাতে নেপিডোর (মিয়ানমারের রাজধানী) সঙ্গে একটি বিতর্কিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। শুরুর দিকে দুই বছরের মধ্যে সব অনুপ্রবেশকারীর ফিরে যাওয়ার ওপর জোর দেওয়া হলেও চুক্তির শর্তগুলো অস্পষ্ট ও অবাস্তব। এই চুক্তি প্রণয়নে কোনো আন্তর্জাতিক সংগঠন বা রোহিঙ্গাদের মত নেওয়া হয়নি। বহু রোহিঙ্গার আশঙ্কা, তাদের জোর করে মিয়ানমারে ফিরতে বাধ্য করা হবে। ফলে আশ্রয়শিবিরের ভেতরে ও বাইরে এই চুক্তির বিরোধিতা প্রবল হচ্ছে।

আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (এআরএসএ) তাদের ভাষায় ‘বার্মার রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তাদের সহিংস আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার’ হুমকি দিয়েছে। এই গ্রুপটিই গত আগস্টে মিয়ানমারের নিরাপত্তা ফাঁড়িগুলোর ওপর হামলা চালায়। বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান উদ্বেগ হচ্ছে, এআরএসএ আশ্রয়শিবির থেকেও সদস্য সংগ্রহ করতে পারে। আবার সীমান্তবর্তী লড়াইয়ের জন্য ক্যাম্পগুলোকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে, এমন আশঙ্কাও তাদের আছে।

এআরএসএ কি অন্য কোনো আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত? এখন পর্যন্ত এ বিষয়টিও স্পষ্ট নয়। নতুন বছর শুরুর কিছু আগে উপমহাদেশের আল-কায়েদা বাংলাদেশি মুসলমানদের উদ্দেশে রোহিঙ্গাদের সংগ্রামে সশস্ত্র সহযোগিতার আহ্বান জানায়। এই আহ্বানের সঙ্গে এআরএসএর কোনো সংযোগ আছে কি না তা নিশ্চিত নয়। তবে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে কট্টরপন্থী নেটওয়ার্কগুলোর প্রভাব বাড়ছে।

বাংলাদেশের উখিয়া ও টেকনাফের জনমিতিই পাল্টে দিয়েছে রোহিঙ্গারা। এসব এলাকায় স্থানীয়দের তুলনায় রোহিঙ্গার সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে গেছে। তাদের ৭৩ শতাংশ বাস করে নতুন আশ্রয়শিবিরে, ১৩ শতাংশ অস্থায়ী ক্যাম্পে, ৯ শতাংশ বাংলাদেশিদের সঙ্গে এবং ৫ শতাংশ বৈধ আশ্রয়শিবিরে।

কর্তৃপক্ষ চায় না রোহিঙ্গারা স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে যাক। ক্যাম্পগুলোতে ইংরেজি ও বার্মিজ ভাষা শেখানো হয়, বাংলা না। নতুন অনুপ্রবেশকারীদের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয় না। সেটা জন্মসূত্রেই হোক বা বিয়ে।

পরিবেশের ওপর ১০ লাখ অনুপ্রবেশকারীর প্রতিক্রিয়া বলাই বাহুল্য। জাতিসংঘের উন্নয়ন প্রকল্প সম্প্রতি একটি পরিবেশগত পর্যালোচনা প্রকাশ করে। এতে জীববৈচিত্র্য ও মানুষের নিরাপত্তার ওপর ২৮টি ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়। যেসব এলাকায় তাদের রাখা হয়েছে, সেসব এলাকায় হাজার হাজার একর বনভূমি উজাড় করে  দেওয়া হয়েছে। এসব বনে আগে বন্য হাতি থাকত, এখন বিরানভূমি। সবুজ, সজীব, পাহাড়ি দৃশ্যপট নেই। দৃষ্টিসীমাজুড়ে শুধুই তাঁবু।

বিশ্বজুড়ে সংঘাত বা পরিবেশগত কারণে বহু মানুষ সীমান্ত পার হচ্ছে। এর সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও পরিবেশগত দিকগুলো নিয়ে আলাদা করে গবেষণা হওয়া প্রয়োজন; যাতে মানবিক ও টেকসই উপায়ে এই সংকটগুলো নিয়ে কাজ করা সম্ভব হয়।

লেখক : ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে ‘উইমেন অ্যান্ড ট্রানজিশনাল জাস্টিস’ বিষয়ে পিএইচডি করছেন

সূত্র : ওয়াশিংটন পোস্ট

অনুবাদ : তামান্না মিনহাজ।

নোট: কালের কন্ঠ থেকে নেয়া।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।