শামসুজ্জামান খান

গবেষণা ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান সমসাময়িক বাংলা অঞ্চলে কৃতবিদ্য পণ্ডিত ও তীক্ষধী গবেষক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছেন। তাঁর পিএইচডি গবেষণাগ্রন্থ ‘মুসলিম-মানস ও বাংলা সাহিত্য’ (১৯৬৪) সাম্প্রতিককালের গবেষণা অভিসন্দর্ভ হিসেবে তাঁকে বিপুল খ্যাতি ও বঙ্গীয় সারস্বত সমাজে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। এই গ্রন্থে প্রতিফলিত তাঁর ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি, নিরপেক্ষ বিবেচনাশক্তি এবং বিশ্লেষণের দক্ষতা পণ্ডিতমহলের সপ্রশংস দৃষ্টি লাভ করেছে। তাঁর এই গ্রন্থের বিশিষ্টতা এ জন্য যে যেখানে বেশির ভাগ গবেষণা অভিসন্দর্ভ যেমন ভাষা ও বর্ণনায় নিরস এবং অপ্রয়োজনীয় তথ্যে ভারাক্রান্ত হয়ে থাকে, ড. আনিসুজ্জামানের গ্রন্থটি সেদিক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁর ভাষার গঠন সরস ও বিশ্লেষণ বুদ্ধিদীপ্ততায় চমকপ্রদ। এতে পাঠকের ক্লান্তি বোধ হয় না, পাঠের আগ্রহ ও কৌতূহল বাড়ে।

ঋজু ভঙ্গি, পরিচ্ছন্ন চিন্তা, কখনো কখনো কিছু কৌতুকবোধ যুক্ত করে রচনাকে মনোরম করে তোলেন ড. আনিসুজ্জামান। শুধু মুসলিম বাংলা সাহিত্য নয়, মুসলিম বাংলার সাময়িকপত্র (১৯৬৯), পুরনো বাংলা গদ্য প্রভৃতি গবেষণাগ্রন্থে তাঁর শ্রম, নিষ্ঠা, গভীরতর অনুসন্ধিৎসা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পারঙ্গমতা, তথ্য উপস্থাপনের শৃঙ্খলা আমাদের মুগ্ধ ও অভিভূত করে। বাঙালি মুসলমানের জাতিসত্তা ও মাতৃভাষার প্রশ্নে যে বিভ্রান্তি, হীনম্মন্যতাবোধ ও অপপ্রচার ছিল, যুক্তিবিচার ও তথ্যপ্রমাণের সহায়তায় তা তিনি শুধু খণ্ডনই করেননি, ইতিহাসনিষ্ঠ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনায় বাঙালি মুসলমানের বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস বিচারের লক্ষ্যে মাতৃভাষাপ্রীতির ঝোঁক যে বৃদ্ধি পেয়েছে তা ব্যাখ্যা করেছেন। প্রধানত ষোড়শ-সপ্তদশ শতকে মূলধারার বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি যে তথাকথিত মুসলমানি বাংলা গড়ে ওঠে আরবি, উর্দু, ফারসি, তুর্কি ভাষায় রচিত, সে সাহিত্যকে তিনি মিশ্র ভাষার রীতির সাহিত্য হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর এই মত পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। মিশ্র ভাষায় রচিত সাহিত্যের উদাহরণ দিয়েছেন ড. আনিসুজ্জামান : ‘বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে মিশ্র ভাষারীতির কাব্যগুলোকে কয়েক ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথমে আমরা পাই রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান : যেমন—‘ইউসুফ-জোলেখা’, ‘লায়লী-মজনু’, ‘বেনজির-বদরে মনীর’, ‘হুসনাবানু-মনীর শামী’ (হাতেম তাই), ‘গোলে বকাউলী-তাজুলমূল্ক’, ‘সয়ফুলমূল্ক-বদিউজ্জামাল’ প্রভৃতি। দ্বিতীয় ধারার উপাখ্যানগুলোকে সাম্প্রদায়িক আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। এর দুই ভাগ (ছদ্ম-ঐতিহাসিক আর লৌকিক)। প্রথম পর্যায়ে পড়ে ‘আমীর হামজা’, ‘জঙ্গনামা’ প্রভৃতি কাব্য অর্থাৎ ইতিহাসের পটে মুসলিম বীরদের কাল্পনিক কাফের-দলন কাহিনি। দ্বিতীয় পর্যায়ে পাই আমাদের দেশের পটভূমিকায় হিন্দু লৌকিক দেব-দেবীর সঙ্গে যুদ্ধবিগ্রহ করে অলৌকিক ক্ষমতা দেখিয়ে মুসলমান পীর-ফকিরদের প্রতিষ্ঠালাভের কথা, যেমন—‘বনবিবির জহুরানামা’, ‘কালু গাজী-চম্পাবতী’, ‘লালমোন’, ‘সত্যপীরের পুঁথি’ প্রভৃতি। তৃতীয় ধারায় পাই ইসলামের ধর্ম, ইতিহাস, নবী-আউলিয়ার জীবনকথা ও বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কে ছন্দোবদ্ধ রচনা, যথা—‘কাসাসুল আম্বিয়া’, ‘তাজকিরাতুল আউলিয়া’, ‘হাজার মসলা’ প্রভৃতি।

আনিসুজ্জামান তাঁর গবেষণায় বাংলা গদ্যের ইতিহাস যে এ দেশে ইংরেজ আগমনের পরেই গড়ে উঠেছে, এই প্রচলিত ধারণা নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে সুলতানি আমলে শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের শাসনকালেই বাংলা গদ্যের সূত্রপাত। রিচার্ড ইটনের বইয়েও এর সমর্থন মেলে। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতরাই ইংরেজের পৃষ্ঠপোষকতা এবং দেশীয় পণ্ডিতদের সহায়তায় বাংলা গদ্যের সূত্রপাত করেন—এ তথ্য ঠিক নয়। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে গবেষণাকালে বাংলায় রচিত অনেক চিঠিপত্র ও দলিলাদি উদ্ধার করতে সক্ষম হন। আনিসুজ্জামানের ‘পুরনো বাংলা গদ্য’ ও বাংলা গদ্যের এই নতুন উপকরণ উদ্ধারের ফলে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যেমন নতুন মাত্রা যোগ হয়, তেমনি বাংলার সামাজিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক ও নানা বিশ্বাস সংস্কারের রূপান্তর বা নবায়নের বিষয়ও সামগ্রিক ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

পাকিস্তান আমলের স্বৈরশাসকরা সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলা ভাষাকে বিকৃত করার যে চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র করে, এর বিরুদ্ধে আনিসুজ্জামান নিরলসভাবে লেখালেখির মাধ্যমে একজন ইতিহাসনিষ্ঠ বিবেকবান বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা পালন করেছেন।

আনিসুজ্জামান তরুণ বয়স থেকেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের একজন প্রগতিশীল কর্মী হিসেবে নিজেকে যুক্ত করেন। যত দূর মনে হয় জগন্নাথ কলেজে ছাত্র থাকাকালীনই তাঁর এই কর্মকাণ্ডের সূচনা। পাকিস্তান আমলের প্রথম দিক থেকেই যে দুঃশাসনের সূত্রপাত হয়, তার বিরুদ্ধে পোস্টার লেখা, লিফলেট বিতরণ, বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাঁদের উপদেশ-নির্দেশ-পরামর্শমতো কাজ করার ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ ক্ষেত্রে ভাষা আন্দোলনে তাঁর নানাভাবে অংশগ্রহণ যেমন ছিল, তেমনি রবীন্দ্রনাথকেও নতুন স্বীকৃত ও সংস্কৃতিমান পরিবারে পরিচিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সরকার রবীন্দ্রনাথের সংগীতের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলে বুদ্ধিজীবীরা পরবর্তী সময়ে শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর নেতৃত্বে যে বিবৃতি রচনা করেন; রবীন্দ্রনাথ আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ…তাঁর সঙ্গেও অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের যোগ ছিল গভীর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগদানের পর চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও তাঁর ভূমিকা ছিল খুবই উজ্জ্বল। তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন এবং মুজিবনগর সরকারের কর্মকাণ্ডে নানা ভূমিকায় অংশ নেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশের সংবিধান রচনায় অংশগ্রহণসহ নানা ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৫ সালে স্বাধীনতাবিরোধী কিছু সেনা সদস্যের হাতে বঙ্গবন্ধু নিষ্ঠুরভাবে নিহত হলে যেভাবে সাম্প্রদায়িকতা এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কর্মকাণ্ড শুরু হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র বর্জিত হয়ে ধর্মপ্রবণ রাজনীতির প্রত্যাবর্তন ঘটে, তার বিরুদ্ধেও এখনো তিনি তাঁর মতো করে একজন প্রকৃত বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। এই মহান বুদ্ধিজীবীর অশীতিতম বর্ষপূর্তি উৎসবে তাঁর প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন।

লেখক : মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমি।

নোট: কালের কন্ঠ থেকে নেয়া।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।