খালেদা জিয়ার প্রতি খোলা চিঠি

এ.এস.এম. এরশাদ :

বেগম খালেদা জিয়া,

আপনার প্রতি আমার এখন মায়া হচ্ছে। বাংলাদেশের কত মানুষ আপনাকে পছন্দ করে। কেন করে? সে উত্তর আমার কাছে নেই। সোয়াজিল্যান্ডের রাজা এমস্বোয়াতিকে তার দেশের মানুষ যেমন কোন কারণ ছাড়াই ভালোবাসেন ঠিকে তেমন করেই হয়তো ভালোবাসেন। ঐ রাজা একের পর এক বিয়ে করেন বউদের জন্য জেট বিমান কেনেন কিন্তু জনগণ খাদ্যাভাবে ভোগে।

আপনাকে জনগণ কতটা ভালোবাসেন সেটার একটা উদাহরণ দিই – আমাকে চা দিতে আসে যে খালা, তার মন খারাপ ছিলো আপনার রায়ের দিন। আমার সাথে সে তেমন একটা কথা বলে না, কিন্তু সেদিন বললো, ‘স্যার একি হলো?’ ভাবছিলাম সাধারণ মানুষ কতটা সরল? আপনারা তাদের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য তেমন কিছু না করলেও তারা আপনাদেরকে কতোটা ভালোবাসেন।

আপনার প্রতি আমার মায়ার কারণ – আপনার এই সময়ের দুর্গতি। সারাজীবন ঝামেলা ছাড়া আরাম আয়েশে দিন কাটাতে অভ্যস্ত। সব সময় পরিপাটি থাকা আপনার স্বভাব। অথচ আজ আপনাকেই জেলে থাকতে হচ্ছে। যতই ডিভিশন হোক, যতই আরাম আয়েশ থাকুক তবুও এটা জেল। আপনি কতটা কষ্ট পেয়েছেন, সেটা আমি বুঝতে পারি। তিনজন বিচারক বদলানোর পর আপনি বিচারক ডঃ আক্তারুজ্জামের (লেখা পড়া এবং ট্রেক রেকর্ড দেখে) আস্থাবান ছিলেন। আপনি টাকা তসরুফ করেছেন সেটা বলছি না , কিন্তু আপনার নিদারুণ অবহেলা আছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে তথ্য প্রমাণ থেকে যাওয়ায় আমার মনে হয়েছে বিচারক এখানে অসহায়। যখন তিনি রায় পড়ছিলেন আপনি একবারের জন্যও চোখ খোলেননি। আপনার রাগ অভিমান আমি জানি। রাগী মানুষ যে খারাপ তা বলছি না। রাগটা যদি আপনি আগে এই সব অব্যস্থাপনার বিরুদ্ধে দেখাতেন তাহলে আপনারও মঙ্গল হতো। আমাদেরও কষ্ট পেতে হতো না এখন।

যা হোক আপনার এহেন কষ্টের দিনে আপনাকে খোঁটা দিতে চাই না। তারপরও স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এসব নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই। আপনাকে ম্যাডাম বলতে ইচ্ছা করছে না। তারপরও লেখার খাতিরে ম্যাডাম বলেই বলছি। ম্যাডাম, মনে আছে আপনার ২১শে আগষ্টের কথা? আইভি রহমানের নির্বাক মুখের কথা? আমি জানি সেটা আপনি করেননি। কিন্তু যখন জানলেন তখনও কিছু করেননি এই অনাচারের বিরুদ্ধে। একজন বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক নেত্রীকে রাজনৈতিক ভাবে মোকাবিলা করতে হয় কিন্তু আপনার ছেলে আব্দুস সালাম পিন্টুর মাধ্যমে এ কী করলেন? আপনার দলের এমপিরা তাচ্ছিল্য করে বলেছিলো- শেখ হাসিনা ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে গেছিলো। মনে পড়ছেনা আপনি সেদিন টেবিল চাপড়েছিলেন নাকি এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন।

সত্যই আজ স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা হুমকির মুখে। অস্বীকার করছি না। কিন্তু আজ আপনি যে জেলে আছেন সেখানে একদিন কী হয়েছিলো ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর? একটু সময় হলে দেখে নেবেন ঐ জেলহত্যার কক্ষগুলা। যেখানে “পানি-পানি” বলে মরহুম তাজউদ্দিন, সৈয়দ নজরুল ইসলমা , ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, কামরুজ্জামান সাহেবের মতো নির্মোহ সুর্য সন্তানেরা মারা গিয়েছিলো। বলছি না যে, আপনি তাদের মেরেছেন বা আপনার স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাদেরকে মেরেছিলো। কিন্তু তাদের হত্যার বিচার যেন না হয় তার জন্য জারি হওয়া ইনডেমনিটি আপনি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়েও বাতিল করেননি। আজকে যখন আপনি ন্যায় বিচারের আশা করেন আমারও ইচ্ছা করে আপনাকে সেটা পাইয়ে দিতে। ন্যায় বিচার পাওয়া প্রত্যেরকের নাগরিক অধিকার । অথচ ভেবে দেখুনতো ইনডেমনিটি বাতিল চেয়ে করা বিলগুলো আপনি কি অবহেলায় না বাতিল করতেন? অথচ মৌলিক অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক কোন আইন সংবিধানে থাকতে পারে না। “কেউ বিচারও চাইতে পারবে না”- সেটা নিশ্চয় মৌলিক অধিকার পরিপন্থী ছিলো। আপনি সেটা করেননি। কারাগারের নিঃসঙ্গ দিনে আপনি ভাবতে পারেন ম্যাডাম।

মনে আছে আপনি একদিন সেনানিবাসের ভেতর দিয়ে শেখ হাসিনাকে গাড়ি নিয়ে সিএমএইচে যেতে দেননি? এসব আপনি ভালো করেননি। বলছিনা আপনার সাথে শেখ হাসিনা যা করছে তা ভালো করছে। যে কোন সরকারী দলেরই ভাবা উচিত একটা শক্ত বিরোধীদল না থাকলে দেশ ঠিক ভাবে চলে না। এত দমনপীড়ন কখনো কারো কাছে কাম্য নয়।

অথচ আপনার রায় হবার পর আপনার দলের লোকজন যে প্রতিক্রিয়াগুলো দিচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে আপনি আবার ক্ষমতায় গেলে এর চেয়ে ভয়ংকর প্রতিশোধই নিবে তারা। তাহলে আমরা যারা সাধারণ মানুষ তারাতো শান্তি চাই। প্রতিহিংসা আর চাই না। ভাইয়ে ভাইয়ে মারামারি আর চাই না। বিএনপির লোকজন যেমন এদেশের নাগরিক ঠিক তেমনি আওয়ামীলীগও এদেশের নাগরিক । সবার নিরাপত্তার কথাই ভাবতে হয় একটা সরকারকে। অথচ এখন যে হুমকিগুলো শুনছি তাতে বর্তমানের চেয়েও ভয়ংকর দিনের স্বপ্ন দেখছি। আওয়ামীলীগের চেয়ে ভালো আচরণ এমন কথা কেউ বলছে না । বর্তমানে যা হচ্ছে তারই পুনরাবৃত্তির কথা বলছে । অর্থ্যাৎ প্রতিহিংসা চলমান থাকবে?

আপনি যত অপরাধই করুন, আপনাকে জেলে দেখতে ইচ্ছা করছে না। আশাকরি সরকারের শুভ বুদ্ধির উদয় হয়ে আপনার জেলজীবন সংক্ষিপ্ত করবেন। আপনি ন্যায়ানুগ জামিন পাবার জন্য দোয়া করছি। আর পারলে দলের দায়িত্বটা পরিবারের মধ্যে না রেখে প্রাতিষ্ঠানিক করুন- দলকে গণতান্ত্রিক করুন। বিএনপির বিকল্প আওয়ামীলীগ আর আওয়ামীলীগের বিকল্প বিএনপি হোক। দুটি দলই মুক্তিযুদ্ধ এবং তার আদর্শকে ধারণ করে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে সচেষ্ট থাকুক সে প্রত্যাশা করে শেষ করছি। চ্যানেল আই থেকে লেখাটি সংগৃহীত

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।