পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশের উত্তরাংশ পর্যটনের একই সার্কিটে আসছে

পশ্চিবঙ্গের উত্তরাঞ্চল আর বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গ – দুটো এলাকাতেই যেসব পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে – সেগুলিকে একই সার্কিটে মেলাতে শুরু হয়েছে উদ্যোগ।

এর মধ্যে বাংলাদেশের পাহাড়পুর, মহাস্থানগড় আর কান্তজীর মন্দিরের মতো ঐতিহ্যমন্ডিত পর্যটন স্থল যেমন রয়েছে, তেমনই থাকছে পশ্চিমবঙ্গের হিমালয় এবং ডুয়ার্সের জঙ্গল আর চা বাগান ভ্রমণ।

ঢাকা থেকে ওই অঞ্চলে যাতায়াতের সুবিধা যেমন বেড়েছে, তেমনই সেখানকার সীমান্ত দিয়ে পর্যটকদের পারাপারও বাড়ছে।

তার ফলেই এই অঞ্চলে পর্যটকদের একলপ্তে ভ্রমণের সুযোগ তৈরী হয়েছে বলে মনে করছেন পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা।

তারা বলছেন, একদিকে সুউচ্চ হিমালয়, তার নীচেই গভীর জঙ্গল-নদী-চা বাগান, আর অন্য দিকে আছে নানা ঐতিহাসিক আর ধর্মীয় পর্যটন কেন্দ্র।

পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা এই গোটা এলাকাটাই যাতে মানুষ একবারেই ঘুরে ফেলতে পারেন, শুরু হয়েছে সেই প্রচেষ্টা।

দুই উত্তরবঙ্গেই ছড়িয়ে আছে যেসব দর্শনীয় জায়গা, সেখানে এখনও মানুষ যান, তবে বিচ্ছিন্নভাবে।

এসোসিয়েশন ফর কনজার্ভেশন এন্ড টুরিজম নামের পশ্চিমবঙ্গের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বলছে এই সার্কিটের চাহিদা বাড়ছে গত বছর দুয়েক ধরে।

সংগঠনটির প্রধান রাজ বসু জানাচ্ছিলেন, “বগুড়া, জয়পুরহাট, লালমনিরহাট, রংপুর, দিনাজপুর প্রভৃতি জায়গায় যেমন ছড়িয়ে রয়েছে বহু ঐতিহাসিক স্থান, তেমনই আমাদের এদিকে আছে দার্জিলিং, কালিম্পং, ডুয়ার্স-তরাই।”

“এই দুটো অঞ্চলকে পর্যটন মানচিত্রে একই সূত্রে মেলানোর একটা প্রাথমিক উদ্যোগ নিয়েছিলাম কয়েক বছর আগে। এর ফলে প্রাকৃতিক-সাংস্কৃতিক আর ঐতিহাসিক – সব ধরণের জায়গাতেই পর্যটকরা একসঙ্গে ঘুরতে পারবেন।”

প্রাকৃতিক, সাংস্কৃতিক আর ঐতিহাসিক – পর্যটনের সবকটি উপকরণই এই অঞ্চলে মজুত। তার সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মীয় পর্যটন – যেটা ভারতের বেশ কিছু এলাকায় বড় শিল্প হয়ে উঠেছে – এই উত্তরাঞ্চলেও সেরকম ঐতিহাসিক স্থল যেমন আছে, তেমনই আছে সিকিমের প্রখ্যাত বৌদ্ধ বিহারগুলিও।

পশ্চিমবঙ্গের হিমালয় অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই পর্যটন ব্যবসা চালান সম্রাট সান্যাল। দুই দেশের উত্তরাঞ্চলীয় সার্কিট যে পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হবেই, সে ব্যাপারে তিনি একশোভাগ নিশ্চিত।

মি. সান্যাল বলছিলেন, “ঐতিহাসিক আর সাংস্কৃতিকভাবে এই গোটা অঞ্চলটা তো একই। আর এর অন্যতম যোগসূত্র হচ্ছে তিস্তা নদী। সিকিম হয়ে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলীয় এলাকা ছুঁয়ে সেটা বাংলাদেশে পৌঁছিয়েছে।

তাই এই সার্কিটকে তিস্তা সার্কিট হিসাবেও তুলে ধরার চেষ্টা হচ্ছে। দুই বাংলার উত্তরাঞ্চলকে মিলিয়ে যদি একটা কমপ্যাক্ট টুরিজম প্রোডাক্ট তৈরী করা যায়, সেটা আন্ত:সীমান্ত পর্যটনের ক্ষেত্রে একটা দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে।”

পশ্চিমবঙ্গের দিকে পর্যটন পরিকাঠামো বেশ উন্নত আগে থেকেই, আর এই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটির উদ্যোগে বাংলাদেশের দিকেও পর্যটন পরিকাঠামো – অর্থাৎ পরিষ্কার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা – ভ্রমণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে।

লালমনিরহাট, জয়পুরহাট প্রভৃতি জায়গায় সাধারণ পর্যটকদের থাকার জন্য হোমস্টে প্রভৃতি তৈরী করা, ব্যবস্থাপনা – এসব ব্যাপারেও প্রশিক্ষণ দিয়েছে ওই এসোসিয়েশন।

বাংলাদেশের জয়পুরহাট এলাকার পর্যটন ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে জানাচ্ছিলেন, “উভয় বাংলার পর্যটকরা যখন একে অপরের দেশে যাবেন, তাতে বন্ধুত্ব বাড়বে – সাংস্কৃতিক বিনিময় বাড়বে। শুধু পর্যটন ক্ষেত্র নয়, এর মাধ্যমে গোটা অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নও হবে।”

“আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই পর্যটন সার্কিট অতি জনপ্রিয় হয়ে উঠবে বলেই বিশ্বাস করি।”

কিন্তু সব থেকে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে ভিসা পাওয়া।

উত্তরবঙ্গে কোনও দেশেরই ভিসা দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। তাই এক দেশের উত্তরাঞ্চলে ঘুরতে গিয়ে কেউ যে চটজলদি স্থানীয়ভাবেই ভিসা যোগাড় করে নিতে পারবেন, সেটা সম্ভব নয়।

পর্যটন ব্যবসায়ীদের তাই দাবী ওই এলাকায় ভিসা দেওয়ার ব্যবস্থা হোক, বা ই-ভিসা দেওয়া হোক।

“সবথেকে ভাল হয় যদি পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশের পর্যটকদের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্রগুলি ব্যবহার করা হয়। ওই পরিচয়পত্র দেখে ইমিগ্রেশনের সময়েই ভিসা দিয়ে দেওয়া যেতে পারে,” বলছিলেন মি. চৌধুরী।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।