বালু লুটে ভয়াবহ ভাঙন

শীতলক্ষ্যাপারের সম্ভাবনায় যুবলীগ-ছাত্রলীগ নেতার ড্রেজারের কোপ

জয়নাল আবেদীন »

নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় শীতলক্ষ্যা নদীর পাশ ঘেঁষে ভিরিন্দা থেকে কাজৈর গ্রাম পর্যন্ত প্রায় আড়াইশ বিঘা জমি কিনেছিলো কমলিংক ইনফো টেক লিমিটেড। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য এখানে পূর্ণাঙ্গ একটি আইটি পার্ক নির্মাণ। এই উদ্যোগে জাতীয়ভাবে তথ্যপ্রযুক্তিতে অবদানের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবেও একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে শীতলক্ষ্যার অবাধ বালু লুটে সব সম্ভাবনায় গুড়েবালি। কারণ, গত দুই দিনেই নদীতে বিলীন হয়ে গেছে প্রতিষ্ঠানটির কমপক্ষে ১০ বিঘা জমি।

শুধু তাদের ১০ বিঘা জমি নয়, গত বুধবার রাতে নদীতে বিলীন হয়েছে পাশ্ববর্তী একটি ইটভাটার ১০ লাখ ইট, ৮০ লাখ টাকার কয়লাসহ কমপক্ষে দুই কোটি টাকার সম্পদ। ওই ভাটার ৩০ বিঘা জমির মধ্যে ১২ বিঘা নেই। দুই বছর আগে এখানকার এইচআরবি ইটভাটারও ৩০ লাখ ইট নদীতে বিলীন হওয়ার ঘটনা ঘটেছিলো।

সম্প্রতি সময়ে শীতলক্ষ্যার ভাঙন ভয়াল রূপ নিয়েছে। এতে যেমন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে সম্ভাবনাময় বহু উদ্যোগ, পাশাপাশি স্থানীয় এলাকাবাসীর মনেও ঘোর সংশয়। সবার মাথায় ভর করে আছে দুশ্চিন্তার মেঘ। অনেক অসহায় পরিবার ভিটেমাটি হারাচ্ছে। কেউ কেউ হারিয়ে ফেলছেন চলার পথের শেষ সম্বলটুকু।

শীতলক্ষ্যার এই রাক্ষসী রূপ ধারণের কারণ অনুসন্ধানে নামে নিউজ১৯৭১ডটকম। সরেজমিনে ঘুরে, স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এবং বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করে দেখা যায়, শীতলক্ষ্যা তার নিজস্ব স্বাভাবিক কারণেই ভয়াল রূপ ধারণ করেনি। এই নদীকে রাক্ষসী বানিয়েছে ক্ষমতাসীন দলের দুই নেতার পাঁচটি ড্রেজার। দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা ড্রেজার দিয়ে নদীর বালু আর মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। তাতেই খ- খ- হয়ে ভেঙে পড়ছে নতুন নতুন এলাকা। বিশেষ করে নরসিংদীর পলাশের ডাঙ্গা ইউনিয়নের ভিরিন্দা থেকে কাজৈর গ্রাম পর্যন্ত শীতলক্ষ্যার পারের সব সম্ভাবনা এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে।

আইটি পার্কের জমি নদীতে

নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় শীতলক্ষ্যা নদীর পাশ ঘেঁষে ভিরিন্দা থেকে কাজৈর গ্রাম পর্যন্ত প্রায় আড়াইশ বিঘা জমি কিনেছিলো কমলিংক ইনফো টেক লিমিটেড। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য এখানে একটি পরিপূর্ণ আইটি পার্ক নির্মাণ। এই উদ্যোগে জাতীয়ভাবে তথ্যপ্রযুক্তিতে অবদানের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবেও একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে শীতলক্ষ্যার বালু লুটে সব সম্ভাবনায় গুড়েবালি। কারণ, গত দুই দিনেই নদীতে বিলীন হয়ে গেছে প্রতিষ্ঠানটির কমপক্ষে ১০ বিঘা জমি।

কমলিংক ইনফো টেক লিমিটেডের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রতিষ্ঠানটির আইটি পার্ক করার কথা এখানে। এ জন্য পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা ইউনিয়নে প্রায় আড়াইশ বিঘা বেশি জমি কিনে প্রাথমিক কাজও শুরু হয়েছে। পুরো জমিটি শীতলক্ষ্যা নদীর পাশ ঘেঁষে প্রায় এক কিলোমিটার লম্বালম্বি। নদীর বালু লুটের কারণে তাদের পুরো জমিটাই হুমকিতে। ইতোমধ্যে ১০ বিঘার মতো নদীতে হারিয়ে গেছে। বালু লুটের ঘটনা বন্ধ না হলে বাকি জমিটুকুও শেষ হয়ে যাবে। তাতে করে এখানে আইটি পার্ক নির্মাণের সবরকম সম্ভাবনা ভেস্তে যাবে।

অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে রাক্ষসী রূপ ধারণ করেছে শীতলক্ষ্যা নদী। ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে অনেককিছু

ইটভাটাও বিলীনের পথে

গত বুধবার রাতে মেসার্স মুগ্ধ ট্রেডার্স (এমএমবি) নামক একটি ইটভাটার ১০ লাখ ইট, ৮০ লাখ টাকার কয়লাসহ ভাটার কিছু অংশ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ইটভাটার কর্মকর্তা-কর্মচারিরা জানান, শুধুমাত্র বুধবার রাতেই তাদের প্রায় দুই কোটি টাকার সম্পত্তি নষ্ট হয়েছে। ভাঙনের আশংকায় ভাটা কর্তৃপক্ষ আগেই ড্রেজারের মালিকদের কাছে অনুরোধ করে বালু কাটা থেকে বিরত থাকতে বলেছিলেন। তাতেও তাদের মন গলেনি। পাড়ঘেঁষে বালু কেটে নেওয়ার ফরে একপর্যায়ে গভীর রাতে ভাটার ইট-কয়লাসহ বিপুল সম্পত্তি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।

পরদিন বৃহস্পতিবার স্থানীয় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর সহায়তায় ড্রেজারের দুই কর্মীকে আটক করে পুলিশে দিয়েছে ইটভাটার কর্মকর্তা-কর্মচারিরা। আটক দুজন হলো— নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁর শম্ভুপাড়ার কবির মিয়ার ছেলে মিঠু মিয়া এবং একই গ্রামের স্বপন তালুকদারের ছেলে সালাউদ্দীন তালুকদার। পলাশ থানার উপ-পরিদর্শক মীর তহরুল ইসলাম আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

জানা গেছে, প্রায় ৩০ বিঘা জমির ওপর মেসার্স মুগ্ধ ট্রেডার্সের ইটভাটা। কিন্তু অবৈধ ও অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে তাদের ১২ বিঘা জমিও নদীতে হারিয়ে গেছে। এর আগে ২০১৫ সালে এইচআরবি ইটভাটারও ৩০ লাখ ইট নদীতে বিলীন হওয়ার ঘটনা ঘটেছিলো। প্রশাসন অভিযান চালিয়ে বালুখেকোদের নিবৃত্ত করতে সক্ষম হলেও পরবর্তীতে ফের ঘাঁটি বালু লুট শুরু করে তারা। এর ফলে নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।

ক্ষমতার দাপটে চলছে বালু লুট

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সবগুলো ঘটনার জন্যেই দায়ী শীতলক্ষ্যা নদীর বালু লুটের ঘটনা। অথচ বালু উত্তোলনের প্রশাসনিক কোনো অনুমতিই নেই। একাধিকবার অভিযান চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। এই মুহূর্তে পাঁচটি ড্রেজার নিয়মিত বালু কাটায় যুক্ত আছে। এগুলো চলছে গাজীপুরের কালীগঞ্জ থানা যুবলীগ নেতা সোহাগ খন্দকার এবং কালীগঞ্জ পৌরসভা ছাত্রলীগ সভাপতি শাহ আলমের সরাসরি নেতৃত্বে।

সরেজমিনে ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নদীর তলদেশ থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালি ও মাটি উত্তোলনের ফলে দেখা দিয়েছে ভাঙনের শংকা। স্থানীয় চেয়ারম্যান, গণ্যমান্য ব্যক্তি, এমনকি প্রশাসনের নিষেধও উপেক্ষা করে চলছে অবৈধ মাটি টাকার মহোৎসব। বৃথা গেছে স্থানীয় চেয়ারম্যানের মৌখিক নিষেধাজ্ঞাও।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রশাসন বহুবার এখানে অভিযান চালিয়েছে। মাটি কাটতে নিষেধও করে গেছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা জারির পরদিনই ফের শুরু হয় মাটি কাটা। যেখানে তারা প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞাই মানছে না, সেখানে স্থানীয় বাসিন্দােেদর কিছুই বলার থাকে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকে নিউজ১৯৭১ডটকমকে জানান, সোহাগ ও শাহ আলম প্রায় প্রতিদিনই এই এলাকায় আসেন। দলবল নিয়ে এসে দীর্ঘক্ষণ পুরো এলাকায় মহড়া দিয়ে যায়। অসহায় এলাকাবাসী ভয়ে তটস্থ। মুখ খুললেই জীবননাশের হুমকিতে পড়তে হতে পারে— এই শংকায় সবাই চুপ। অনেকবার প্রশাসনের লোকজন এখানে এসে ড্রেজার জব্দ করেছে। অবৈধভাবে বালু কাটতে নিষেধও করে গেছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। ক্ষমতার দাপটে ওরা অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

নদীপারের মানুষের ঘুম হারাম 

টানা ছয়-সাত বছর ধরে চলমান বালু লুটের ফলে হুমকির মুখে পড়েছে জনজীবন। বহু ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। অনেকের ভিটেমাটিও গেছে। সরেজমিনে ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নদীর তলদেশ থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালি ও মাটি উত্তোলনের ফলে দেখা দিয়েছে আরও ভাঙনের শংকা। স্থানীয় চেয়ারম্যান, গণ্যমান্য ব্যক্তি, এমনকি প্রশাসনের নিষেধও উপেক্ষা করে চলছে অবৈধ মাটি টাকার মহোৎসব। বৃথা গেছে স্থানীয় চেয়ারম্যানের মৌখিক নিষেধাজ্ঞাও। স্থানীয় এলাকাবাসীর চোখেমুখে তাই রাজ্যের হতাশা। ফলে নদীর দুই পারের মানুষের ভাগ্যাকাশে এখন দুশ্চিন্তার মেঘ।

বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এভাবে অবৈধ এবং অপরিকল্পিতভাবে নদীর তলদেশ থেকে বালি এবং মাটি কেটে নিলে ভূ-প্রাকৃতিক পরিবেশও হয়ে উঠবে বিপন্ন। নদীর মাছ, জলজ উদ্ভিদ এবং পরিবেশগত ক্ষতি হবে ভয়াবহ পরিমাণে। পাশাপাশি নদীর পাশ্ববর্র্তী জনজীবনও হুমকিগ্রস্থ হয়ে ওঠে।

সরেজমিনে দেখা যায়, নরসিংদীর পলাশ উপজেলার ডাঙ্গা ইউনিয়নের সান্তানপাড়ার পাশে একযোগে পাঁচটি ড্রেজার চালিয়ে নদীর তলদেশ থেকে মাটি কেটে আনা হচ্ছে। এসব মাটি চলে যাচ্ছে পূর্বনির্ধারিত গন্তব্যে। সকাল থেকে রাত অবধি, একটি মিনিটের জন্যেও ড্রেজারগুলো বন্ধ থাকছে না। সোহাগ খন্দকার এবং শাহ আলম প্রতিদিনই ঘটনাস্থল ঘুরে যান।

খবর নিয়ে জানা গেছে, ডাঙ্গা ইউনিয়নে গড়ে ওঠার কথা এ কে খান গ্রুপের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। সরকার ইতোমধ্যে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের অনুমোদনও দিয়েছে। প্রাণ গ্রুপের একটি শিল্প কারখানাও স্থাপন হওয়ার কথা এখানে। কিন্তু অবৈধ ও অপরিকল্পিতভাবে নদীর তলদেশ থেকে মাটি কেটে নেওয়ার প্রেক্ষিতে পরিবেশ ও প্রতিবেশগত যে ধরনের শংকা তৈরি হয়েছে, তাতে এসব প্রতিষ্ঠান নিজেদের সিদ্ধান্ত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইছে। এতে করে মূলত নরসিংদীর এলাকাটি বিপুল সম্ভাবনার হাতছানি সত্ত্বেও ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পড়বে।

ডাঙ্গা ইউনিয়নের মহিউদ্দিন, মাসুম বিল্লাহ, জাফর আহম্মেদ, করিমুল হকসহ স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শীতলক্ষ্যার পারে বসবাস করে আসছি বহু বছর ধরে। অনেক ঝড় তুফান আসলেও কোনো রকম বিপদ হয়নি। কোনো আশংকাও করি না। কিন্তু এখন যে ঝড় আসতে শুরু করেছে, তাতে শংকিত না হয়ে পারি না। তলদেশ থেকে মাটি কেটে নেওয়ায় নদীর পার ভাঙতে শুরু করবে। একবার ভাঙন দেখা দিলে গোটা এলাকা ধ্বংস হয়ে যাবে। তখন আর কেউই এখানে থাকতে পারবে না। পরিবার পরিজন নিয়ে পথে বসে যেতে হবে সবাইকে।

স্থানীয় ডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাবেরুল হক হাই এ প্রসঙ্গে জানান, ‘আমরা অনেকবার স্থানীয়ভাবে ব্যবস্থা নিয়েছি। ড্রেজারগুলো প্রশাসন জব্ধও করেছে। কিন্তু ওরা অভিযানের পর আবারও ড্রেজার নামিয়ে মাটি কাটে। আমরা কতদিন পাহারা দিতে পারবো। ওদের কোনোভাবেই এখান থেকে সরানো যাচ্ছে না।’
চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘এভাবে মাটি কাটার ঘটনা অব্যাহত থাকলে আমার ইউনিয়নের বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে পথে বসবে। এ ছাড়া পরিবেশেরও ভীষণ ক্ষতি হচ্ছে। তাই এদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’

পলাশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ভাস্কর দেবনাথ বাপ্পি জানান, নদী থেকে বালু উত্তোলন করার অনুমতি কাউকে দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য থানার ওসিকে জানানো হয়েছে। এছাড়া বিষয়টি নিয়ে নরসিংদী জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে গাজীপুরের জেলা প্রশাসকে অবগত করা হবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।