আলী ইমাম মজুমদার

প্রশাসন ও দুর্নীতি : কয়েকটি পিলে চমকানো খবর

প্রথম আলোর একটি সংবাদ শিরোনাম ‘বস্তাভর্তি টাকা নিয়ে উধাও ভূমি কর্মকর্তা’। ১৪ কোটি টাকা নিয়ে কিশোরগঞ্জের ভূমি হুকুমদখল কর্মকর্তা (এলএও) উধাও হয়েছেন। এর মধ্যে পরপর দুই দিনে ৫ কোটি টাকা করে তুলে বস্তায় ভরে নিয়ে গেছেন। তিনি আরও ১০ কোটি টাকা উত্তোলনের জন্য ব্যাংক চেক তৈরি করেছিলেন, কিন্তু বিষয়টি জানাজানি হলে পালিয়ে যান। তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশত্যাগ ঠেকাতে সতর্ক করা হয়েছে ইমিগ্রেশন অধিদপ্তরকে। আর ঘুষ লেনদেন সাধারণত হয় কোনো ব্যক্তিকে অন্যায্য সুবিধা দিতে। এমনকি ন্যায্য প্রতিকার পেতেও ঘুষ দিতে হয় বেশ কিছু ক্ষেত্রে।

জেলা প্রশাসক (ডিসি) যে বিষয়গুলো নিয়ে সাধারণত কাজ করেন, তার মধ্যে ভূমি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো নিয়ে জনমনে ক্ষোভ বিরাজমান থাকে প্রায় ক্ষেত্রে। খুব দক্ষ ও সৎ জেলা প্রশাসকও তাঁর আওতায় থাকা ভূমি ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত সব ইউনিটকে সহজ পথে রাখতে পারেন না, এমনটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি। তবে আলোচিত ঘটনাটি প্রচলিত ঘুষ গ্রহণের ধারণার আওতায় আসে না। প্রত্যাশী সংস্থা ভূমি হুকুমদখলের ক্ষতিপূরণ বাবদ ডিসির বরাবর টাকা ন্যস্ত করেন। এই টাকা থাকে জেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের আওতায় ডিসির একটি হিসাবে। হিসাবটি এলএও পদধারীরাই পরিচালনা করেন। এই হিসাব থেকে নিজের হাতে চেক নিজ নামে লিখে হিসাবরক্ষণ অফিস থেকে পাস করিয়ে সোনালী ব্যাংক থেকে তুলে নেওয়াকে ঘুষ গ্রহণ না বলে চুরি বা ডাকাতি বলে আখ্যায়িত করাই উত্তম। আইনের ভাষায় হয়তো এটা হবে সরকারি টাকা আত্মসাৎ। আত্মসাতের অনেক রকম ফের আছে। তবে বর্ণিত ঘটনাটি অনেকটা অভিনব, এমন বলা যায়।

যে জেলার আটজন নারী ইউএনও নিজেদের কীর্তির মাধ্যমে প্রশাসনের গৌরব বৃদ্ধি করে চলেছেন, সেখানে এই এলএও পদধারীর আচরণ যেন কমল বনে মত্তহস্তির মতো। এ ধরনের কাজে সাহসী হওয়ার পেছনে তাঁর খুঁটির জোর কোথায়, সেটা তলিয়ে দেখা দরকার। জানা যায়, এই কর্মকর্তা ২৪ ব্যাচে ২০০৫ সালে বিসিএসে যোগ দিয়েছেন। তাঁর অনেক কনিষ্ঠরাও এখন ইউএনও। এলএও পদটি ডিসির সহায়ক কর্মকর্তা হিসেবেই বিবেচিত। আর ইউএনও একটি প্রশাসনিক ইউনিটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। অধিকতর ক্ষমতা ও মর্যাদা ভোগ করেন। জানা যায়, কিছুদিন আগে তাঁকে শেরপুরের এডিসি হিসেবে বদলি করা হলেও তদবির করে তা বাতিল করান। পরে পিরোজপুর বা ভোলায় বদলি করলে টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যান।

টাকাগুলো তুলতে জেলা হিসাবরক্ষণ অফিস ও ডিসি অফিস ক্যাম্পাসেই অবস্থিত সোনালী ব্যাংকের সহযোগিতা আবশ্যক হয়েছে। নিজ নামে এই কর্মকর্তা এত টাকা তুলে নিচ্ছেন, এতে তাদের সন্দেহ ও আপত্তি থাকা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু সবই ঠিকঠাক চলল। শেষাবধি ১০ কোটি টাকার চেকটি আটকে যায়। আর তিনিও সটকে পড়েন। অনেক বড় বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি দেশে হচ্ছে। রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক উজাড় করে টাকা দেওয়া হচ্ছে ঋণের নামে। বেসরকারি মালিকানার কোনো কোনো ব্যাংকও যোগ দিয়েছে সেই কাতারে। তবে জেলা প্রশাসনে এ ধরনের আত্মসাতের ঘটনা বিরল। এটা এসব বিষয়ে ‘উচ্চাকাঙ্ক্ষীদের’ জন্য চোখ খুলে দিতে পারে। তবে অধিক সতর্ক থাকা দরকার তদারককারী কর্মকর্তাদের। আর এই কর্মকর্তাকে সম্ভাব্য স্বল্পতম সময়ে আইনের আওতায় আনা আবশ্যক। আইনের মাধ্যমে বাজেয়াপ্ত করা প্রয়োজন তাঁর অনুপার্জিত আয়।

প্রথম আলোয় উপর্যুক্ত সংবাদটি যেদিন প্রকাশিত হয়, সেদিনই ঢাকার একটি ইংরেজি দৈনিকের প্রথম পাতায় খবর আসে পুলিশ কনস্টেবলদের কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়োগ দেওয়ার একটি প্রস্তাব প্রসঙ্গে। পুলিশ সপ্তাহে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা ঢাকায় সমবেত হয়ে তাঁদের বিভিন্ন সমস্যা ও চাহিদা সম্পর্কে সরকারপ্রধানসহ মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) সঙ্গে বিভিন্ন জেলায় কর্মরত পুলিশ সুপার (এসপি) ও অন্যান্য ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার উপস্থিতিতে এ বিষয়টিও উপস্থাপন করা হয়। বলা হয়, জেলায় রাজনৈতিক চাপে কনস্টেবল নিয়োগ দিতে হয়। আর কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতা এসব সুপারিশ করেন টাকার বিনিময়ে। কিছু অসাধু পুলিশ কর্মকর্তাও থাকেন এসবের যোগসাজশে। এতে নবনিয়োগকৃত কনস্টেবলদের মান কমে যাচ্ছে। কেন্দ্রীয়ভাবে এই নিয়োগ হলে স্বচ্ছতা আসবে বলেও কেউ কেউ দাবি করেন। তবে আইনি সীমাবদ্ধতার জন্য আইজিপি বর্তমান পর্যায়ে প্রস্তাবটি বিবেচনা করতে অপারগতা জানান।

এই সংবাদে উল্লেখ করা হয়, একজন পুলিশ কনস্টেবল পদে নিয়োগ পেতে ছয় থেকে সাত লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়। আর সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) পদে ঘুষের পরিমাণ ১৫ লাখ টাকা। এ প্রসঙ্গে জনৈক সাবেক আইজিপির একটি বক্তব্য খবরটিতে রয়েছে। তিনি বলেছেন, পুলিশের নিচের দিকে টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে জনশ্রুতি তাঁর কানেও আছে। তিনি আরও বলেন, এভাবে নিয়োগ পেলে তাঁরা কারও পকেটে ইয়াবা বা অস্ত্র ঢুকিয়ে টাকা নিতে চাইবে, এটাই স্বাভাবিক। খবরটির বহুমাত্রিকতা আছে। ক্ষমতার প্রতি আছে মানুষের সহজাত একটি আকর্ষণ। এসপিরা চান তাঁদের ক্ষমতার বলয় আরও বৃদ্ধি পাক। তাই ক্ষেত্রবিশেষে ফৌজদারি কার্যবিধি ও পুলিশ রেগুলেশনে দেওয়া জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতার পরিসরকেও তাঁরা হাল আমলে কিছু ক্ষেত্রে উপেক্ষা করেন বলে জানা যায়। সে ক্ষেত্রে নিজ বাহিনীর সর্বনিম্ন স্তরে নিয়োগের দায়িত্বটি ছাড়তে চাইছেন কেন, এটা গভীর কৌতূহলের বিষয়।

কারণটি তাঁরাই ব্যাখ্যা করেছেন সভায়। পেরে উঠছেন না তাঁরা। আর এই অবস্থা তো মাঠপর্যায়ের সবারই। দু-একজন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে নাজেহাল হয়েছেন। সব ক্ষেত্রে না হলেও এখন সুবোধ বালকের মতো সেসব ধরিয়ে দেওয়া তালিকা দিয়েই চলছে নিয়োগ কার্যক্রম।

আর এই তালিকা প্রণয়নে অর্থ বড় নির্ণায়কের ভূমিকায় আছে, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কথা থাকে, কীভাবে ধরে নেওয়া হয় কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়োগ হলে স্বচ্ছতা থাকবে। তা-ই যদি থাকে, তাহলে এসআই নিয়োগ পেতে ১৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়, এ কথা আসে কীভাবে? এসআইগণ তো পুলিশ সদর দপ্তর কর্তৃক নিয়োজিত। এখানেও ব্যাপক পরিমাণ ‘রাজনৈতিক তদবির’ হয়। আর একই প্রক্রিয়ায়। উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক, একসময় এসআই পদেও নিয়োগ দিতেন এসপিরা, ডিসির নেতৃত্বে গঠিত একটি কমিটির সুপারিশে। তখন কিন্তু এ ধরনের অভিযোগ ছিল বলে শোনা যায় না। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এ ধরনের টাকার খেলার কারণেই পুলিশ এখন অপরাধ নিয়ন্ত্রণের কাজে ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়ছে। শুধু তা-ই নয়, তাদের একটি অংশ জড়িত হচ্ছে অপরাধজনক কাজে। এটা কতটা বিপর্যয়কর তা আলোচনার অপেক্ষা রাখে না।

সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) ছাড়া সব সংস্থার নিয়োগ প্রক্রিয়া মোটামুটি একই পথ ধরে চলছে। এতে স্লিপ আর টেলিফোনের ভূমিকাই মুখ্য। কিছু ব্যাংক বা এ-জাতীয় প্রতিষ্ঠান নিয়োগের লিখিত পরীক্ষার অংশটি আউটসোর্স করছে আর মৌখিক পরীক্ষা হয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আওতায়। সেখানেও একই ধরনের স্লিপ আর টেলিফোন। পিএসসিকে কাবু করার জন্য সক্রিয় রয়েছে একটি মহল। বিশেষ একটি ছাত্রসংগঠনের সভায় দায়িত্বশীল একজন ব্যক্তি কিছুদিন আগে বলেছিলেন, লিখিত পরীক্ষায় পাস করলে মৌখিকের দায়িত্ব নেওয়া হবে। সুযোগ পেলে তা হবে এই ধারণা অমূলক নয়। প্রকৃতপক্ষে সংকটটা গোটা শাসনব্যবস্থায়। এর সব স্তরে রাজনৈতিক দৌরাত্ম্য সবারই জানা। এটা মেনে নিয়েই কাজ করছেন অনেকে। আর যাঁরা পারছেন না, তাঁরা হন কক্ষচ্যুত।

জাতি হিসেবে আমরা একটি যুগসন্ধিক্ষণে আছি। দেশ যখন অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে অগ্রসরমাণ, তখন দুর্নীতিবাজেরা মনে হয় আরও তৎপর হয়ে উঠছে। দুর্নীতি দমনের বিভিন্ন প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও তাদের ঠেকানো যাচ্ছে না। যে এলএও ১৪ কোটি টাকা সরকারি কোষাগার থেকে নিজ নামে উঠিয়ে নিলেন, তিনি হয়তো ধরা পড়বেন। তবে বিচার কত দিনে হবে, এটা অনিশ্চিত। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক সংস্থা। আর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার রয়েছে টাকার জোর। ঠিক তেমনি যে এসপিগণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য দায়ী, তাঁরা তাঁদের বাহিনীতে লোক নিয়োগের বিষয়ে একটি দুষ্টচক্রের কাছে অসহায়। এখন যদি ধরে নেওয়া হয় যে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনেও তাঁরা কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারছেন না, তাহলে কি খুব ভুল হবে? অসহায় মানুষ শুধু ভাবে আর জনান্তিকে জিজ্ঞাসা করে, অবস্থা কি বিপরীতমুখী হবে না?

আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

নোট: প্রথম আলো থেকে নেয়া।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।