বেকার তরুণদের ভাগ্য বদলের নায়ক আকরাম হোসেন

পরিবারের সবাই যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার নাগরিকত্ব পেয়েছেন। একদা তিনি নিজেই ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রতিবেশী। শুধু কি প্রতিবেশী? অবসরে রাগবিও খেলতেন দু’জন। ব্যবসাও জমজমাট- অত্যাধুনিক গাড়ির শোরুম রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে, রয়েছে রিয়েল এস্টেট ও রেস্তোরাঁ ব্যবসা। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন। পড়াশোনা, ব্যবসা ও চাকরি মিলিয়ে শিকাগো শহরেই কাটিয়েছেন জীবনের ২২ বছর। অনেক দূরের পথের যাত্রী তিনি, যার চোখ দুটো নিবদ্ধ সুদূর আকাশে; অথচ পা দুটো বরাবরই মাটিলঘ্ন। তাই সবকিছু ছেড়ে আপন দেশেই ফিরে এসে মাছ চাষে মন দিয়েছেন তিনি। একাধিক মাটির ও ইটের রাস্তা নির্মাণ করেছেন নিজের এলাকায়। ত্রাণ-সহায়তা দিচ্ছেন ব্যক্তি উদ্যোগে বন্যাদুর্গতদের, দেশহারা রোহিঙ্গাদের।

এমন মানুষ দুর্লভই বটে। কিন্তু সত্যিই দেশে ফিরে এসবই করছেন গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার দমদমা গ্রামের আকরাম হোসেন। স্কলারশিপ নিয়ে ১৯৯১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যান মেধাবী এই ছাত্র। তার পর স্নাতকোত্তর শেষ করে ব্যবসায় নামেন। ব্যবসার পরিধি বাড়ে, শাখা অফিস খোলা হয় কানাডায়ও। হঠাৎ করে তিনটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানই প্রবাসী ভাই ও আত্মীয়দের বুঝিয়ে দিয়ে চাকরি শুরু করেন। এভাবে কাটে ১৫ বছর। এ সময় রেড ক্রসসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের হয়ে ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, সোমালিয়ায়ও

কাজ করেন তিনি। প্রবাসেই থিতু হবেন- তাই যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার নাগরিকত্বও নেন স্ত্রী-সন্তানসহ। সুখ ছিল, বিত্তও ছিল। কিন্তু আর কত? শুধু অন্য দেশের উন্নয়নের জন্যই জীবনটা দিয়ে দেবো? কিছুতেই না। দৃঢ়প্রতিজ্ঞাবদ্ধ আকরাম হোসেন তাই চলে এসেছেন দেশপ্রেম ও মানবতার তাগিদে।

‘পাগলেও নিজের ভালো বোঝে’- আর আকরাম হোসেনের মতো বুঝদার মানুষ প্রবাসের এই সুখ-বিত্ত ছেড়ে দেশে ফিরে যাবেন? আত্মীয়স্বজন তাই প্রথমে তার এ সিদ্ধান্তকে আমলে নেননি, বিশ্বাসও করেননি। পরে তারা বিস্মিত হয়েছেন, নাখোশ হয়েছেন, হাসাহাসিও করেছেন। স্ত্রী ও সন্তান প্রথমে মানতে না চাইলেও পরে তার পাশে এসে দাঁড়ান এবং দেশে ফিরে আসেন। প্রবাসী বড় ভাই লোকমান হোসেনও তার অবস্থানকে অনুভব করে উৎসাহ দেন তাকে।

কিন্তু এই বয়সে কী করবেন আকরাম দেশে ফিরে এসে? হঠাৎ তার মনে পড়ে ইন্দোনেশিয়ার একটি ঘটনা। সেখানে সুনামি আঘাত হানার পর যুক্তরাষ্ট্র রেড ক্রসের হয়ে ত্রাণ দিতে গিয়েছিলেন তিনি। সে সময় জেলেপল্লীর জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, বাড়িঘর ধ্বংস হওয়ায় তারা যত না আঘাত পেয়েছেন, তারও বেশি আঘাত পেয়েছেন মাছের খামারের ক্ষতি হওয়ায়। কারণ, মাছের চাষই ভাগ্য খুলে দেয় তাদের। উপকূলের ওই জেলেরা বিএমডব্লিউ ও পাজেরো গাড়িতে চলাফেরা করতেন। মাত্র এক যুগ মাছ চাষ করে নিজেদের ভাগ্য বদলের পাশাপাশি এলাকার চেহারাও বদলে দিয়েছিলেন তারা।

ঘটনাটি মনে পড়তেই এ সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে থাকেন তিনি। কয়েকজন আত্মীয় তাকে জানান, মাছ চাষের ফলে পাশের ভালুকা, ত্রিশালসহ ময়মনসিংহের কয়েকটি উপজেলার অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আকরাম হোসেন তার গ্রামের বাড়ির পুকুরের মাটি ও পানি পরীক্ষা করে মৎস্য কর্মকর্তাদের পরামর্শ নিয়ে মাছ চাষ শুরু করলেন। নিজের গ্রাম শ্রীপুরের প্রহদ্মাদপুর ইউনিয়নের দমদমায় শুরু হলো তার ‘লা এগ্রো ফার্মা অ্যান্ড ফিশারিজে’র কার্যক্রম। এখন এ খামার বিস্তৃত হয়েছে প্রায় ১২০ বিঘা জমিতে। অথচ ২০০৯ সালে খামারের কাজ শুরু হয়েছিল মাত্র তিন বিঘার পুকুর দিয়ে।

শুধু মৎস্য খামারেই আটকে থাকেননি আকরাম, গড়ে তুলেছেন একটি সমন্বিত খামার। মাছ চাষের পাশাপাশি হাঁস-মুরগি, গরুও লালন-পালন করা হয় এখানে। হাঁস-মুরগির খামার থেকে আসে দৈনিক দুই-আড়াই হাজার ডিম। গরু থেকে দুধ আসে প্রায় ১০০ লিটার। দেশি পদ্ধতিতে তার খামারে গরু মোটাতাজা করে বিক্রি করা হয়। পুকুরের পাড়ে গড়ে তোলা হয়েছে সবজির বাগান। লাগানো হয়েছে ফুল ও ফলের গাছ। এসব খুচরা খাত থেকেও মাসে আয় হয় কয়েক লাখ টাকা। খামারে মাছের রেণু ও পোনা মাছ বিক্রি করা হয়। ময়মনসিংহ, ভালুকা ও গাজীপুরের মাছচাষিরা পোনা মাছ সংগ্রহ করেন এখান থেকে। একটি ভাসমান বিলেও ভাসমান পদ্ধতিতে মাছ চাষ করেন তিনি। সেখান থেকে কৈ আর শিং মাছ বেচে বছরে তার আয় হয় প্রায় ৫০ লাখ টাকা।

ভালো ও স্বাস্থ্যসম্মত মাছের খাবার নিশ্চিত করতে খামারের মধ্যেই একটি ফিডমিল গড়ে তুলেছেন আকরাম। এর যন্ত্রপাতি ও সুষম খাবার মিশ্রণের ফর্মুলাও তার নিজেরই তৈরি করা। এখান থেকে প্রতি ঘণ্টায় দুই টন মাছের খাদ্য উৎপাদন হয়। খামারে পানির স্তর বেঁধে একাধিক জাতের মাছ চাষ করা হয় একই পুকুরে। চাষ হয় তেলাপিয়া, সরপুঁটি, বিগ্রেড, পাঙ্গাশ, কালবাউশ, রুই, সিলভার কার্প, শিং ও পাবদা মাছের। খামার থেকে প্রতি সপ্তাহে বিক্রি হয় দেড় থেকে দুই টন মাছ। পাইকাররা অগ্রিম টাকা দিয়ে খামার থেকে ট্রাক ভরে মাছ নিয়ে যান। তার খামারের মাছের গাজীপুরে এত সুখ্যাতি রয়েছে যে হাটে মাছ বিক্রেতারা হাঁক দেন ‘দমদমার মাছ’ বলে। অনেকেই জানেন, আকরাম হোসেনের খামারের মাছে কোনো দুর্গন্ধ নেই, খেতে সুস্বাদু। গাজীপুর ছাড়াও রাজধানীর বেশ কয়েকটি আড়তে আসে তার মাছ।

এরই মধ্যে আকরাম হোসেন একাধিকবার পেয়েছেন জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের সেরা মাছচাষির পদক। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার একটি ব্যবসায়িক প্রতিনিধি দল তার খামার পরিদর্শন করে। প্রতিনিধি দলটি খামারের মাছ ও অন্যান্য উপকরণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) মান অনুসরণ করে এ খামারে মাছ চাষ হচ্ছে। এ খামার থেকে মাছ রফতানির বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন তারা। আগামী ডিসেম্বর থেকে এ খামার থেকে মাছ রফতানি শুরু হতে পারে।

জনহিতৈষী উদ্যোক্তা হিসেবেও নিজেকে পরিচিত করে তুলেছেন আকরাম হোসেন। এলাকায় অসচ্ছল তরুণদের লেখাপড়া, বেকারদের কর্মসংস্থান, অসুস্থদের বিনামূল্যে চিকিৎসা ইত্যাদি বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত তিনি। তার খামারের শ্রমিকরা সপরিবারে খামারেই বসবাস করেন, বিনামূল্যে খামার থেকে খাবার সংগ্রহ করে থাকেন। তাদের সন্তানদের পড়াশোনার জন্য রয়েছে প্রাইভেট টিউটর। তাদের পড়াশোনার ব্যয়ও মেটানো হয় খামারের আয় থেকেই।

প্রতি সপ্তাহে এলাকার কর্মসংস্থানহীন তরুণদের নিয়ে তাদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলার প্রত্যয়ে বৈঠক করেন আকরাম হোসেন। এলাকার শিক্ষিত তরুণ বেকারদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে তাদের হাতে-কলমে গরু মোটাতাজাকরণ পদ্ধতি শেখান নিজে। কাউকে কাউকে দেন মৎস্য চাষের জ্ঞান ও পদ্ধতি। এরই মধ্যে এলাকার হাজার হাজার বেকার তরুণ তার সহযোগিতায় কর্মসংস্থান খুঁজে নিয়েছেন। এমন একজন তরুণ দমদমা পশ্চিমপাড়ার আলী আকবর। তিনি জানান, কয়েক বছর বেকার থাকার পর আকরাম হোসেনের আর্থিক সহযোগিতা ও পরামর্শে তিনি গরু মোটাতাজা করার কাজ শুরু করেছেন। তিনি বলেন, ‘এখন আমার খামারেও বছরে ৪০ থেকে ৭০টি গরু মোটাতাজা হয়। অথচ শুরুতে আকরাম ভাই আমাকে তিনটি ছোট গরু ৪৫ হাজার টাকা দরে মোটাতাজার জন্য দিয়েছিলেন।’

আকরাম হোসেনের খামারসংলঘ্ন প্রতিবেশী বৃদ্ধ ইদ্রিস আলী ফকির বলেন, ‘আকরাম খামার করার পর তার সঙ্গে আলাপ করে গ্রামের ছেলেপেলেরা কেউ মাছ, কেউ সবজি, কেউ মুরগি, কেউ আবার গরু পালছে।’

কাজের স্বার্থে তিনি নিজের অর্থে ইটের রাস্তা ছাড়াও একাধিক মাটির রাস্তাও করেছেন। তার খামারের দীর্ঘদিনের শ্রমিক অনিল কুমার বলেন, ‘আকরাম কাকার এখানে চাকরি করি, এটা মনে হয় না; মনে হয়, এ খামার আমার।’

রেড ক্রসে কাজ করার সময় আকরাম যে শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা পেয়েছেন, তা নিয়ে তিনি সাম্প্রতিক বন্যার সময় জামালপুরের ইসলামপুর, কুড়িগ্রামসহ কয়েকটি বন্যাদুর্গত এলাকায় ব্যক্তি উদ্যোগে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেছেন। এ কাজে তাকে সহযোগিতা করেছে বিজিবি। সেনাবাহিনীর সহায়তায় গত ১৫ দিনে তিনি দু’দফায় প্রায় ২০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে দু’দিনের খাবার ও বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে রেইনকোর্ট, পলিথিন বিতরণ করেছেন। খাবারের সঙ্গে হাঁড়ি-পাতিল, গ্লাস-প্লেটও বিতরণ করেন তিনি। এ মানবিক কাজে দেশের ও প্রবাসী বন্ধুরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তাকে। ত্রাণ বিতরণেও তার প্রবাসী ভাই লোকমান হোসেন বড় সহায়তা করছেন।

আকরাম হোসেন বলেন, ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’- এ প্রবাদ আবার ফিরিয়ে আনতে চাই। গ্রামের শিক্ষিত তরুণরা ভিটেমাটি বেচে বিদেশে গিয়ে প্রতারিত ও নিঃস্ব হয়ে ফিরে আসে। দেশেই যাতে ঘরে ঘরে কর্মসংস্থান হয়, এ লক্ষ্যে ছোট পরিসরে কাজ করছি। চাকরি করব- এটা না ভেবে তরুণরা যাতে অন্যকে চাকরি দেবো, এ রকম ভাবতে শেখে- সে লক্ষ্যেই এ প্রচেষ্টা। নিজের মেধা ও অভিজ্ঞতাকে এলাকার মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে কাজে লাগাতে চাই।

পারিবারিকভাবে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাও রয়েছে আকরাম হোসেনের। তার ছোট ভাই ইকবাল হোসেন সবুজ গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। ছোট ভাই পোশাক রফতানির সঙ্গে জড়িত। খামার পরিচালনায় আকরাম হোসেনের স্ত্রী মনিরা সুলতানা মুনমুন পাশে আছেন সব সময়। মুনমুন নিজেও ব্যবসা করছেন দেশি-বিদেশি ফুলের। চীন ও নেদারল্যান্ডস থেকে ফুলের চারা আমদানি করা হয়। বিমানবন্দর থেকেই এসব ফুলের চারা ক্রেতারা নিয়ে যান। অনলাইনেই বিক্রি হয় এসব দামি ফুলের গাছ। একমাত্র মেয়ে মিফতা হোসেনকে নিয়ে সুখের সংসার আকরাম হোসেন ও মনিরা সুলতানার।

আলতাব হোসেন, দৈনিক সমকাল

One thought on “বেকার তরুণদের ভাগ্য বদলের নায়ক আকরাম হোসেন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।