যেখানেই মানবিক আর্তনাদ, সেখানেই ছোটেন আকরাম

জয়নাল আবেদীন »

আজ উত্তরাঞ্চল তো কাল দক্ষিনাঞ্চলে তিনি। ছুটে চলেন দেশের এ মাথা থেকে ও মাথা। মানবিক আর্তনাদ আর আহাজারির আওয়াজ কানে আসলেই যেন আর হাত গুটিয়ে ঘরে বসে থাকতে পারেন না। এমন এক মানবতার বন্ধু আকরাম হোসেন। যেখানে মানবিক আর্তনাদ-আহাজারি, সেখানেই ছুটে চলা যেন তাঁর নেশায় পরিণত হয়েছে।

বরাবরের মতো এই শীতেও তিনি যুক্ত হলেন মানবিকতায়। এবার গেলেন কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে; যেখানে আশ্রিত মিয়ানমারের রাখাইন থেকে অনেককিছু হারিয়ে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। এই সম্প্রদায়ের প্রায় ছয় হাজার মানুষ পেলেন আকরামের বিতরণকৃত শীতবস্ত্র। সম্প্রতি তিনি নিজে গিয়েই বিতরণ করেন এসব শীতবস্ত্র। উখিয়া, টেকনাফ এবং নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকার বিভিন্ন পাহাড়ে তীব্র শীতের কাঁপুনিতে জবুথবু হয়ে থাকা কিছু মানুষের সহায় হয়ে ওঠেন গাজীপুরের এই মানবহিতৈষী।

গত বছরের আগষ্ট মাসের শেষ দিকে এবং সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে যখন নাফ নদী পাড়ি দিয়ে ঢল নামে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের, তখনও সুদূর গাজীপুর থেকে ‍ছুটে যান আকরাম। অসহায় নিঃস্ব হয়ে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে আগত রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ান তিনি। তখন দুই দফায় প্রায় ২০ হাজার রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশুর জন্য দুদিনের খাবার বন্দোবস্তি করেন তিনি। সে সময় প্রচুর বৃষ্টিপাত ছিলো। বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে রোহিঙ্গাদের মাঝে বিতরণ করেন রেইনকোর্ট, পলিথিনসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী। খাবারের সঙ্গে দেন হাড়ি-পাতিল, গ্লাস-প্লেটও। রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে তিনি পাশে পেয়েছেন বিজিবির স্থানীয় উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের।

শুধু রোহিঙ্গা শরণার্থী নয়, ওই সময় দেশের উত্তরাঞ্চলে বন্যাদুর্গত মানুষের মাঝেও ছিলেন আকরাম হোসেন। একান্ত ব্যক্তিগত উদ্যোগে তিনি জামালপুর, কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন দুর্গত এলাকার প্রায় ৩০ হাজার বন্যার্ত মানুষের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেছিলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায় গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার প্রহদ্মাদপুর ইউনিয়নের দমদমা গ্রামের এই মহাপুরুষের পেছনের গা শিওরে ওঠার মতো গল্প। এই চরাচরে পড়ে থাকা চাইলে আয়েশী জীবন কাটিয়ে দিতে পারেন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা কানাডায়। এই পাড়া-গাঁ থেকে সেই সুদূরে যেতে কে না চায়! অথচ তিনি উল্টো স্রোতে। দুটো উন্নত দেশের নাগরিকত্ব পাওয়া সত্ত্বেও দেশের মাটি আঁকড়ে ধরলেন একান্তই দেশ মাতৃকার মায়ার টানে।

নিজের এলাকা এবং গ্রামীণ জনপদের ভাগ্য বদলের নায়ক হয়ে উঠলেন এ মাটি আঁকড়ে রাখতে গিয়ে। মাত্র তিন বিঘা আয়তনের পুকুরে পরীক্ষামূলক কিছু মাছ চাষ শুরু করলেও এখন তাঁর ১২০ বিঘা জমির প্রকল্প। নানা জাতের মাছের পাশাপাশি হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলের খামারও গড়ে তোলেন তিনি।

এর মধ্য দিয়ে এলাকার বেকার মানুষেরা যেমন ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেলেন, পাশাপাশি অনেক তরুণ-যুবকই নতুন উদ্যমে হয়ে উঠছেন একেকজন উদ্যোক্তা। ফলে আকরামই যেন এই জনপদের ভাগ্য বদলের হাতিয়ার হয়ে ওঠেন।

এ ছাড়া এলাকায় অসচ্ছল তরুণদের লেখাপড়া, বেকারদের কর্মসংস্থান, অসুস্থদের বিনামূল্যে চিকিৎসার ক্ষেত্রে জুড়ি নেই আকরাম হোসেনর। এসব কারণে এলাকার মানুষের কাছে খুবই আপনজন তিনি। নিজের খামারে যারা চাকরি করেন, তারা পরিবারের সদস্যদের নিয়ে থাকেন এই খামারের ভেতরেই। এসব পরিবারের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার ব্যবস্থাও করেছেন তিনি। স্কুলের পাশাপাশি প্রাইভেট টিউটরের ব্যবস্থাও বাদ যাবে কেন! সেটিও করেছেন সানন্দে।

আকরাম হোসেন নিউজ১৯৭১ডটকমকে বলেন, এসব কাজের মধ্যেই সত্যিকারের আনন্দ। আমি তৃপ্তি পাই। আমি চাই, নতুন নতুন তরুণ উদ্যোক্তা সৃষ্টি হোক। বদলে যাক একেকটি জনপদ।

বেকার তরুণদের ভাগ্য বদলের নায়ক আকরাম হোসেন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।