অন্যরকম বিপ্লব সরকার

অপরাধ করলে সে আর নৈতিকভাবে পুলিশ থাকে না

জয়নাল আবেদীন »

পুলিশের নাম শুনলেই লোকে ভ্রু কুঁচকায়। মুখ ফিরিয়ে নেয়। বেশিরভাগ মানুষের কাছেই পুলিশ যেন এক আতংকের নাম। কিন্তু কেন?

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে মিশে থাকা পুলিশ বাহিনীর আজকের সদস্যদের নিয়ে কেন এত নেতিবাচক ধারণা জনমনে? তবে কি একজন অফিসারও নেই যিনি স্রোতের বিপরীতে হেঁটে উজ্জ্বল করে চলেছেন বাহিনীর নাম?

একজন নয়, খোঁজ নিলে অগণিত নাম বেরিয়ে আসতে পারে। সেই তালিকায় অগ্রগামী নাম বিপ্লব সরকার। যেমন মেধাবী, তেমন পরিশ্রমী। মনের ভেতরে পুষে রেখেছেন হাজার স্বপ্ন। সততার সর্বোচ্চ শিখরে দাঁড়িয়ে আলো ছড়াতে চান। রঙিন প্রজাপতির মতো ডানা মেলে উড়তে চান। তাঁর প্রতি সরকারের যে দায়িত্ব, তার পুরোটা উজাড় করে দিতে চান।

কর্মের স্বীকৃতিও পেয়েছেন অনেক। দক্ষতা আর প্রতিভার ছাপ রেখেছেন সবসময়। পেয়েছেন বিপিএম, পিপিএম পদকও। বর্তমানে তিনি রাজধানীর তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার।

একাত্তরের পঁচিশ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম বুলেটটি ছোঁড়া হয়েছিলো রাজারবাগ পুলিশ লাইনস থেকে। সেই রাতে পুলিশ বাহিনীর গড়া ওই প্রতিরোধই ছিলো পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ। ওই সময় অনেক পুলিশ সদস্য প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছেন।

মুক্তিযুদ্ধকে বাঙালি জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন মনে করেন বিপ্লব সরকার। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে একাত্তরে পুলিশ বাহিনীর সক্রিয় অংশগ্রহণও নিঃসন্দেহে বড় অবদান বলে তাঁর মত।

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে পুলিশ বাহিনী অনেক বড় সম্মান অর্জন করেছে। তাতে এই বাহিনীর প্রতি যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে, সেটিই ধরে রাখতে চান বিপ্লব সরকার। সেই অর্জন বা সম্মানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে সবসময় দেশের জন্য অবদান রাখাই তাঁর বড় লক্ষ্য।

কিন্তু বিপ্লব সরকারের ইমেজের উল্টো চরিত্রও আছে পুলিশ বাহিনীতে। এসব নিয়ে মাঝে মধ্যে আলোচনা-সমালোচনাও কম হয় না। পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা নানাবিধ অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেন না বিপ্লব। তবে তিনি মনে করেন, প্রত্যেক দেশেই ভিন্ন ভিন্ন কারণে পুলিশকে মানুষ এক ধরনের সন্দেহের চোখে দেখে।

বিপ্লব সরকার বলেন, ‘সন্দেহের চোখে দেখাটা সবসময় পুরোপুরি ঠিক না। এমন কি যারা পুলিশের সংস্পর্শে কোনদিন আসেনি, তারাও পুলিশকে নেতিবাচক জানে।’

নীরিহ ব্যক্তিকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো, অর্থের বিনিময়ে আাসমি ছেড়ে দেওয়া, চেকপোস্টে হয়রানি কিংবা পকেটে ইয়াবা ঢুকিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়ার অভিযোগগুলো সম্প্রতি সময়ে বেশি ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে।

এ প্রসঙ্গে বিপ্লব সরকার বলেন, “আমি সেগুলো অস্বীকার করছি না। এই ধরনের অভিযোগ আমাদের কাছে প্রায়ই আসে। যখনই অভিযোগ পাই তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কোন সামগ্রিক চিত্র নয়। কোন পুুলিশ যখন অপরাধ করে বা মানুষকে ভোগান্তির শিকার করে, নৈতিকভাবে সে তখন আর ‘পুলিশ’ থাকে না।”

বিগত ১০ বছর যাবত পুলিশ বাহিনীকে অফিসার বেইজড করার জন্য প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা সরকার ও পুলিশ বাহিনীর মধ্যে চলমান রয়েছে। যার ধারাবাহিকতায় এখন ক্যাডার সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ১০ বছর আগে ক্যাডার ছিল ১২শ থেকে ১৩শ, এখন ২৯শ পেরিয়েছে। পুলিশ বাহিনীতে আরও বেশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা আনার জন্য একটি অফিসার বেইজড বাহিনীতে পরিণত করার ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চলছে। যার কারণে পুলিশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা আগের চেয়ে কিছুটা হলেও আমরা উন্নত করতে পেরেছি।

যে কোনো পেশাকেই মানুষ একান্ত নিজের করে নিতে পারলে সাফল্য নিশ্চিত। শুধু চাকরি না মনে করে সেবার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসলে সব দিক থেকে ইতিবাচক বদল সম্ভব। বিপ্লব সরকার সেভাবেই এগিয়ে আসা পুলিশ কর্মকর্তা।

তিনি নিজেই বললেন, ‘এক সময় আমরা বলতাম পুলিশ বাহিনী। শুধু চাকরি মনে করতাম। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে এখন চাকরি বলি না, সার্ভিস বলে থাকি। বাংলাদেশ পুলিশ একটি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান। মুখে বললেই সেবাধর্মী হয়ে যাবে না, কর্মকাণ্ডে প্রতিফলন থাকতে হবে। এই প্রতিফলনের জন্য আমরা বেছে নিয়েছি সমাজে যারা সবচেয়ে বেশি অবহেলিত ও নির্যাতিত, নারী ও শিশুরা। এখন প্রত্যেক থানায় একটি নারী ও শিশু সেল রয়েছে। আমি বলছি না এই সেলের মধ্য দিয়ে বিপ্লবিক পরিবর্তন চলে আসবে। কিন্তু কোথাও না কোথাও থেকে তো বিপ্লবের সূচনা করতে হবে।’

পুলিশের নৈতিকতার প্রশ্নেও নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন বিপ্লব সরকার। তাঁর মতে, ‘শুধু পুলিশ কেন, যে কোন চাকরিতে ঢুকেই একজন মনে করে কালই সে একটি ফ্ল্যাটের মালিক হয়ে যাবে। তার দুটি গাড়ি থাকতে হবে। তাকে অনেক বেশি বিলাশবহুল জীবনযাপন করতে হবে। সে তখন ভোগ ও লোভের মোহে পড়ে যায়। ন্যায় অন্যায় শব্দ দুটোর মধ্যে আর পার্থক্য করতে পারে না। এভাবে লোভের চোরাবালিতে গোটা সমাজই নিমজ্জিত হয়ে পড়ে।’

তিনি বলেন, ‘চাকরির বেতন ভাতা, সুযোগ সুবিধা জেনেই লোকে চাকরিতে আসে। প্রত্যেকেই তার নিজের যোগ্যতা সম্পর্কে জানে। সরকারি চাকরিতে আগের চেয়ে বেতন কাঠামো অনেক উন্নত হয়েছে। অসততার সঙ্গে নৈতিকতার-অনৈতিকতার সম্পর্ক। বেতন কম তাই দুর্নীতি করব, এটা কোন যুক্তি নয়। অনেক উচ্চবিত্ত লোকের মধ্যেও অসততার চর্চা দেখা যায়। এটি তার চারিত্রিক দুর্বলতা।’

চারিদিকে যখন পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে নানা রকমের অভিযোগ-অনুযোগ, তখনও এই বাহিনীর নাম উজ্জ্বল করে রেখেছেন একজন বিপ্লব সরকার। নিজের সততার জায়গায় অটল থেকে অবিচল রেখেছেন দায়িত্ববোধকে। নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব আস্থার সঙ্গে পালন করে তৈরি করেছেন ইতিবাচক ইমেজ। ‍

বিপ্লব সরকার বলেন, ‘আমি খুব সাধারণ মানুষ। ব্যক্তিগতভাবে যে বিশেষ কিছু করেছি তা নয়। দেশ, সমাজ, জনগণের সেবার প্রতি যে শপথ নিয়ে এই বাহিনীতে আমি যোগদান করেছি, তা বরাবরই রক্ষা করার শতভাগ চেষ্টা করেছি।’

‘অসংখ্য লোক আসে, যাদের আমি কোন ধরনের সমস্যার সমাধান দিতে পারি না। কিন্তু যেটা করতে পারি, তার সমস্যাটা অন্তত আন্তরিকতা নিয়ে শুনতে পারি। মানুষ যখন পুলিশের কাছে আসে, তখন আমাকে ধরে নিতে হবে তার আসলে যাওয়ার মত আর কোন জায়গা নেই। তার সেই বেদনার জায়গা, দুঃখের জায়গা, ক্ষতের জায়গাতে আমি কিছু না পারি, অন্তত সহমর্মিতাটুকুতো প্রকাশ করতে পারি।’

এই পুলিশ কর্মকর্তা মনে করেন, ভাল পুলিশ হওয়ার জন্য অবশ্যই ভাল কাজ করতে হবে। নৈতিকভাবে সৎ মানুষ হতে হবে। বঙ্গবন্ধু একটা কথা বলেছিলেন, সোনার বাংলা গড়তে হলে, সোনার মানুষ চাই।

বিপ্লব বলেন, ‘ভাল পুলিশ ও ভাল মানুষ হওয়ার মধ্যে কোন বিরোধ নেই। জীবনে ভাল মানুষ হওয়াটা বেশি জরুরি। ভাল পুলিশ ও ভাল মানুষ জীবনে দুটোই হতে চেয়েছি। একজন ভাল মানুষ সে পুলিশেই থাকুক অথবা অন্য যে কোন পেশায় থাকুক, সে সব জায়গাই ভাল।’

তিনি বলেন, ‘এই গবীর দেশে আমার মত লক্ষ লক্ষ বিপ্লব সরকার রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দিয়েছে। সরকার আমাকে গাড়ি, ড্রাইভার, বডিগার্ড দিয়েছে। আমার মত সামান্য বিপ্লব সরকারের পেছনে এ রাষ্ট্রের অনেক ইনভেস্টমেন্ট। এই রাষ্ট্রের সেবায় আমার তো সবটুকুই দেওয়া উচিত।’

আমি মনে করি প্রত্যেকে যদি এই জায়গা থেকে বিবেচনা করে, সে মানুষ হিসেবে স্বার্থক হতে পারবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।